সম্পাদকীয়

Bidhan Chandra Roy: কিংবদন্তি চিকিৎসক ও বর্ণময় ব্যক্তিত্ব ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়

দেশের প্রতি সুগভীর ভালবাসা এবং অন্তহীন দেশসেবার স্বীকৃতিতে ১৯৬১ সালে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় 'ভারতরত্ন' পুরস্কার।

রাজু পারাল: জীবদ্দশাতেই নিজের বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য পরিণত হয়েছিলেন কিংবদন্তিতে। চিকিৎসক হিসেবে অর্জন করেছিলেন জগৎজোড়া খ্যাতি। তিনি দূরদর্শী ও বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি বাংলার রূপকার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় (Bidhan Chandra Roy)। প্রতি বছরই ১ জুলাই ‘জাতীয় চিকিৎসক’ দিবস পালিত হয় ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে তাঁকে স্মরণ করেই। দেশের প্রতি সুগভীর ভালবাসা এবং অন্তহীন দেশসেবার স্বীকৃতিতে ১৯৬১ সালে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘ভারতরত্ন’ পুরস্কার। পুরস্কার পেয়েও তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘ভারতটা আমারই থাক, রত্ন তোমরা নিয়ে যাও।’ আজও আমরা দুর্গাপুর কিংবা কল্যাণী শহরে গেলে মনে পড়ে যায় নিঃস্বার্থ, লোভহীন সেই মানুষটির কথা। ‘ক্যালকাটা স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন’ গঠনের অন্তরালেও আছে মানুষটির দূরদর্শিতা। পূর্ব কলকাতার জলাজমির লবণ হ্রদের বুকে গড়ে তুলেছিলেন আন্তর্জাতিক মানের এক শহর যার পরিচিতি আজকের ‘সল্টলেক’। এছাড়াও দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ, হরিণঘাটা দুগ্ধ প্রকল্প, চিত্তরঞ্জন সেবাসদন, যাদবপুর যক্ষা হাসপাতাল, দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা, কল্যাণী, অশোকনগর, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি গড়ে তুলেছিলেন। এছাড়া ময়ূরাক্ষী, দামোদর, জলঢাকা, কংসাবতী, ফরাক্কা প্রকল্পও কর্মযোগী এই মানুষটির হাতে গড়া। তাঁরই প্রাণপণ প্রচেষ্টায় মেদিনীপুর জেলার হিজলিতে গড়ে ওঠে দেশের প্রথম আইআইটি।

বিধানচন্দ্র জন্ম নেন বিহারের পাটনা শহরের বাঁকিপুরে। তাঁর পৈতৃক বাসভূমি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের খুলনা জেলায়। এঁদের বংশধর বাংলার গৌরব মহারাজ প্রতাপাদিত্যের বংশধর। প্রকাশ চন্দ্রের পাঁচ ছেলে মেয়ের মধ্যে বিধান চন্দ্র ছিলেন কনিষ্ঠ। বিধানচন্দ্রের বাবা প্রকাশচন্দ্র, মা অঘোরকামিনী দেবী। বাবা প্রকাশচন্দ্র ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর। মা অঘোরকামিনী সমাজসেবী। পরবর্তীকালে তিনি নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণের পথিকৃৎ হয়ে উঠলেও প্রথমদিকে তিনি লেখাপড়া জানতেন না। বিবাহের পর স্বামী প্রকাশ চন্দ্রের কাছেই তাঁর শিক্ষালাভ হয়। পরে নিজের চেষ্টায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং পাটনা শহরের বাঁকিপুর অঞ্চলে একটি বোর্ডিং স্কুল স্থাপন করেন। এমন বাবা-মায়ের সন্তান হয়ে বিধানচন্দ্র উত্তরকালে উদার মনোভাব ও চারিত্রিক দৃঢ়তার অধিকারী হয়ে ওঠেন। বাবা-মায়ের পরোপকার প্রবৃত্তি বিধানচন্দ্রের মনে খুব গভীর প্রভাব ফেলে।(Bidhan Chandra Roy)

[আরও পড়ুনঃ হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলার আর্জি, সিবিআই তদন্ত ও নজরদারির দাবি আইনজীবীদের]

ছাত্র জীবনে উল্লেখযোগ্য কোনও ঘটনা না ঘটলেও বিধানচন্দ্র সে সময়টায় খুব কষ্টের মধ্যে দিয়ে কাটান। কথিত আছে, মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় ডাক্তারি বই কেনার ক্ষমতা ছিল না তাঁর। সহপাঠীদের কাছ থেকে বই ধার করে এবং কলেজের লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়াশোনা চালাতেন। মেডিক্যাল কলেজের পাঁচ বছরে মাত্র একটা বই কিনেছিলেন পাঁচ টাকা দিয়ে। তবুও এতটুকু হীনমন্যতা আসেনি তাঁর মধ্যে।

মেডিক্যাল কলেজ পড়ার সময় বিধানচন্দ্র অধ্যক্ষ কর্নেল লিউকিসের সংস্পর্শে আসেন। বলা যায় তিনি ছিলেন বিধানচন্দ্রের জীবনের একজন চালক ও প্রেরণাদাতা। বিধানচন্দ্রের মধ্যে তিনি মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে, বিধানচন্দ্র নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে তাঁর শিক্ষা আমাকে সুশিক্ষিত করে তুলেছিল। মা-বাবার পর তাঁর স্নেহ ও ভালবাসা আমাকে চিকিৎসক বিধানচন্দ্র গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।’(Bidhan Chandra Roy)

[লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/truthofbengal]

মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় বিধানচন্দ্রের জীবনে একটি ঘটনা ঘটে। যা থেকে তাঁর সত্যবাদিতার প্রমাণ মেলে। মেডিক্যাল কলেজে ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক আগেই ঘটে সেই ঘটনা। তখন ঘোড়ায় টানা ট্রাম উঠে গিয়ে সবে ইলেকট্রিক ট্রাম চালু হয়েছে কলেজ স্ট্রিট দিয়ে। একদিন সকালে বিধানচন্দ্র দাঁড়িয়ে আছেন মেডিক্যাল কলেজের গেটের সামনে। কলেজের অধ্যাপক কর্নেল পেক তাঁর নিজের ঘোড়ার গাড়ি চেপে কলেজ থেকে বের হচ্ছিলেন। সামনে দিয়ে তখন একটি ট্রাম যাচ্ছিল। ট্রামের সঙ্গে অধ্যাপক পেকের গাড়ির ধাক্কা লেগে গাড়িটি ভেঙে যায়। সাহেব অধ্যাপক বিধানকে ডেকে বললেন, ‘তুমি তো পুরো ঘটনাটা দেখলে! ট্রামটা কি অস্বাভাবিক গতিতে আসছিল না?’ উত্তরে বিধানচন্দ্র বললেন, ‘না স্যর, ট্রামটি স্বাভাবিক গতিতেই আসছিল। দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছে আপনার ঘোড়ার গাড়ির কোচয়ানই। এতে ট্রামের চালকের কোনও দোষ নেই।’ এ কথা শোনার পর কর্নেল পেক বেজায় চটে গেলেন। এর এক সপ্তাহ পরে কর্নেল পেক বিধান চন্দ্রকে ডেকে বললেন তিনি আদালতে ট্রাম কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেছেন। বিধান চন্দ্র যেন আদালতে তাঁর হয়ে সাক্ষী দেন। বিধানচন্দ্র তৎক্ষণাৎ বলে বসলেন নিশ্চই দেব। কিন্তু, আমি নিজের চোখে যা দেখেছি, সে কথাই বলব। অবাধ্য বিধান চন্দ্রের সাক্ষীর ওপরে আর ভরসা রাখতে পারলেন না পেক সাহেব। এর এক সপ্তাহ পরে ফাইনাল অর্থাৎ এমবিএ পরীক্ষার জন্য বিধানচন্দ্রকে মৌখিক পরীক্ষা দিতে মুখোমুখি হতে হল অধ্যাপক কর্নেল পেকের কাছে। ঘরে ঢোকা মাত্রই অধ্যাপক চিৎকার করে, অপমান করে বিধানচন্দ্রকে ঘর থেকে বের করে দিলেন। বিধানচন্দ্র বুঝলেন তাঁকে ফেল করানো হয়েছে। বিধানচন্দ্র তাঁর শিক্ষাগুরু ডঃ কর্নেল লিউকিসকে গিয়ে সব কথা বললেন, তিনি মিথ্যা সাক্ষী দিতে রাজি হননি বলেই এসব ঘটেছে। কর্নেল লিউকিস প্রিয় ছাত্রটিকে আশ্বাস দিলেন চিন্তার কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। কর্নেল লিউকিস, কর্নেল পেক-কে ডেকে বেশ করে ধমকে দিলেন।(Bidhan Chandra Roy)

এর ঠিক দু’সপ্তাহ পরে কর্নেল পেক-কে দিয়ে বিধানচন্দ্রের আর একটি পরীক্ষা নেওয়ালেন। কর্নেল পেক তখন একেবারে অন্য মানুষ। বিধানচন্দ্রকে সস্নেহে বসতে বললেন এবং পরীক্ষাও নিলেন। সাফল্যের সঙ্গে বিধানচদ্র সেই পরীক্ষায় পাস করেছিলেন। এর পরেও কি বলতে হবে কতটা দুঃসাহসিক ছিলেন বাংলার এই রত্ন।

চিকিৎসা কার্যে কিংবদন্তি হয়ে উঠলেও একসময় উচ্চ আয়ের ডাক্তারি প্র্যাকটিস ছেড়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। তাতে তাঁর প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে তাঁর মাসিক আয় ছিল বিয়াল্লিশ হাজার টাকা। সেই অবস্থা থেকে ১৪০০ টাকা মাসিক আয়ের মুখ্যমন্ত্রীর চাকরি নেওয়ায় তাঁকে অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছিল। কারণ তিনি নিজেই বেতন দিতেন তাঁর ব্যাক্তিগত সহকারীদের। আজকালকার মতো মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে দিতেন না।

জীবনে বহু টাকা রোজগার করলেও সঞ্চয় বলে কিছু ছিল না তাঁর। কোনও রকম বিলাসী জীবনযাপন করতেন না তিনি। মিতব্যয়ী ছিলেন এবং নিজের রোজগার থেকে প্রচুর টাকা-পয়সা বহু প্রতিষ্ঠান ও গরিব দুঃখী মানুষকে দান করতেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি দৈনিক কয়েকজন রোগীকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করতেন। এঁদের অনেক সময় ওষুধও কিনে দিতেন বিধানচন্দ্র। আবার অনেক ছাত্রকে তিনি বেতন বা বই কেনায় সাহায্য করতেন। এইসব খরচ চালাতে গিয়ে তিনি বাধ্য হয়ে তাঁর কলকাতার জায়গা জমি ও কোম্পানির শেয়ার বেচে দেন, এমনকী শিলংয়ে নিজের পছন্দের বাসস্থান ‘রায়ভিলা’ বিক্রি করে দিতেও বাধ্য হন। এই ভাবে সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে মানুষের সেবায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বিধানচন্দ্র।(Bidhan Chandra Roy)

১৯২৫ সাল থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ওই বছরে দেশবন্ধু প্রতিষ্ঠিত স্বরাজ দলের প্রার্থী হিসেবে বিধানচন্দ্র, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩০ সালে লবণ আইন অমান্য করায় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ছয় মাসের কারা বরণ করেন বিধানচন্দ্র। পরের বছরই তিনি কলকাতা পুরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত মেয়র থাকাকালীন তিনি নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা সহায়তা, উন্নত রাস্তাঘাট, আলো, জল সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। মেয়র থাকাকালীন কলকাতা শহরের উন্নতির জন্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। কর্পোরেশনের কাজে তিনি যত সময় ব্যয় করতেন, তাঁর আগে আর কোনও মেয়র তত সময় ব্যয় করেননি। তাই দ্বিতীয়বার মেয়র পদ থেকে যখন তিনি বিদায় গ্রহণ করেন তখন কাউন্সিলর শচীন্দ্রনাথ মুখার্জী এই বলে তাঁকে অভিনন্দন জানান যে, তিনিই প্রথম মেয়র, যিনি সকাল থেকে বেলা তিনটে পর্যন্ত মেয়রের অফিসে বসে কাজ করেছেন। বিধানচন্দ্র মেয়র থাকাকালীন স্যার চার্লস টেগার্ট (কলকাতার ভূতপূর্ব পুলিশ কমিশনার) বিলেতে এক বিবৃতিতে জানান যে, কলকাতা কর্পোরেশনে সন্ত্রাসবাদী যুবকদের নির্ভরযোগ্য একটা আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। কর্পোরেশনের কর্তৃপক্ষ জ্ঞাতসারে ওই সব সন্ত্রাসবাদী যুবকদের চাকরি দিয়ে সহায়তা করছেন। এই খবর বিধানচন্দ্রের কানে পৌঁছলে তিনি এই অভিযোগ দূরসন্ধিমুলক, ভিত্তিহীন এবং মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন।(Bidhan Chandra Roy)

১৯৪২ সালে বিধানচন্দ্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিযুক্ত হন। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে আসীন ছিলেন। ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আমৃত্যু তিনি ওই পদে ছিলেন। তিনি শূন্য কোষাগার হাতে নিয়ে সামলেছেন তেভাগা আন্দোলন, উদ্বাস্তুদের ঢেউ, বঙ্গ বিহার সংযুক্তি বিরোধী আন্দোলন, শরণার্থীদের করুন দুর্দশাগ্রস্ত ভয়াবহ সমস্যা। ১৯৬২ সালের ১ জুলাই নির্মলচন্দ্র স্ট্রিটে নিজ বাসভবনে ভারতের এই কৃতী সন্তান লোকান্তরিত হন। ডাঃ বিধানচন্দ্র যে বিশাল কর্মযজ্ঞে নিয়োজিত ছিলেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

Related Articles