কলকাতা

গণতান্ত্রিক মানবিক সমাজ নির্মাণে ভাষার সমালোচনামূলক বোধ অপরিহার্য : পবিত্র সরকার

অধ্যাপক সরকার তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ভাষা শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়,এটি এক সক্রিয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শক্তি, যা মানবচেতনা ও সামাজিক কাঠামোকে নির্মাণ করে।

Truth Of Bengal: বিশিষ্ট ভাষাবিদ প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড.পবিত্র সরকার বলেছেন, ভাষার গভীর ও সমালোচনামূলক অনুধাবনই গণতান্ত্রিক এবং মানবিক সমাজ নির্মাণের ভিত্তি। তিনি কলকাতার রবীন্দ্র সদন সংলগ্ন অবনীন্দ্র সভাঘরে অনুষ্ঠিত প্রথম ড. রামসেবক চৌধরী স্মারক বক্তৃতায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বক্তৃতার বিষয় ছিল—’আমরা ভাষা বলতে কী বুঝি আর আমাদের কী বোঝা উচিত।’

অধ্যাপক সরকার তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ভাষা শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়,এটি এক সক্রিয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শক্তি, যা মানবচেতনা ও সামাজিক কাঠামোকে নির্মাণ করে। বিশ্বায়ন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে ভাষার রূপ ও ব্যবহার অভূতপূর্বভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ইংরেজি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ভাষাগত একরূপতার সংকটও সৃষ্টি করছে। বহু সংখ্যালঘু ভাষা বিলুপ্তির মুখে। তিনি আরও বলেন, আধিপত্যবাদী শক্তি নিজেদের স্বার্থে ভাষাকে ব্যবহার করে।অতএব ভাষা সম্পর্কে সমালোচনামূলক সচেতনতা অপরিহার্য। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট কবি ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রজত বন্দ্যোপাধ্যায়। সভাপতির ভাষণে তিনি ভাষার নৈতিক ও নান্দনিক তাৎপর্যের ওপর আলোকপাত করে ভাষাগত বহুত্ব রক্ষার আহ্বান জানান।

ড. রাম সেবক চৌধরীর স্মৃতিতে কে আর এস ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন এই বক্তৃতামালার আয়োজন করেছিল। এর লক্ষ্য মানবিক মূল্যবোধ ও গম্ভীর বৌদ্ধিক সংলাপের পরম্পরা সুদৃঢ় করা।
স্বাগত ভাষণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক রাম প্রহ্লাদ চৌধরী বলেন, দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক সমরূপতার চাপ এবং সামাজিক বিভাজনের এই সময়ে ভাষা সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা কেবল একাডেমিক প্রয়াস নয়, বরং এক গভীর নৈতিক প্রয়োজন। ভাষা প্রজন্মকে সংযুক্ত করে, সমাজে সেতুবন্ধন রচনা করে এবং সংগ্রাম ও সাফল্যের স্মৃতি সংরক্ষণ করে।
প্রারম্ভিক বক্তব্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি বিভাগের অধ্যাপক রাম আহ্লাদ চৌধরী বলেন, এই স্মারক বক্তৃতা কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়,এটি এক বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতার শক্তিশালী প্রয়াস। তিনি স্মরণ করেন যে ,ড. রাম সেবক চৌধরীর মতে মানব অস্তিত্ব, সামাজিক গতিশীলতা ও ঐতিহাসিক চেতনা ভাষার মাধ্যমেই অর্থবহ রূপ লাভ করে।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন অমল কর। ওই অনুষ্ঠানে চারটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। পবিত্র সরকার উদ্বোধন করেন অধ্যাপক রাম আহ্লাদ চৌধরী রচিত বাংলা গ্রন্থ ‘পাঁচ স্রষ্টা: এক মানবিক স্বপ্ন’। অর্চনা পাণ্ডে ও রাম আহ্লাদ চৌধরী সম্পাদিত ‘প্রেমচন্দের সৃজন মানদণ্ডের সৌন্দর্য’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন অধ্যাপক রজত বন্দ্যোপাধ্যায়। রাম আহ্লাদ চৌধরীর ‘সৌন্দর্য ও ভাষা: সময়, সমাজ ও সৃজন’ গ্রন্থ প্রকাশ করেন উপাসনা সরকার। শ্যামল সেনগুপ্ত রচিত এবং রাম আহ্লাদ চৌধরী অনূদিত ‘গান্ধী হত্যার নেপথ্য’ গ্রন্থও পবিত্র সরকার প্রকাশ করেন।

পরবর্তীতে একটি বহুভাষিক কবি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যেখানে বাংলা, হিন্দি, উর্দু, মৈথিলি, ভোজপুরি, আরবি ও ফারসি ভাষার কবিরা অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলন সঞ্চালনা করেন অমল কর ও সঞ্জীব কুমার সিংহ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ড. অর্চনা পাণ্ডে। সমগ্র অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন ড. পার্থ প্রতিম পাঁজা।
প্রথম ‘ড. আর. এস. চৌধরী স্মারক বক্তৃতা’ ভাষার কেন্দ্রীয় গুরুত্বকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে গণতান্ত্রিক চেতনা ও মানবিক সমাজ নির্মাণের এক তাৎপর্যপূর্ণ বৌদ্ধিক পর্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইলো।