সম্পাদকীয়

(Organic farming) পৃথিবী জুড়ে যখন তেজষ্ক্রিয়তার হুমকি, তখন ‘জৈব চাষ’কে স্মরণ

মূলত পূর্ণেন্দু বসুর উদ্যোগেই নিউটাউনের সরকারি ভবনে জৈব হাট গত এক বছর ধরে সরকারি উদ্যোগে চলছে।

সুমন ভট্টাচার্য: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হুমকি দিয়ে ইরানের তিনটি পরমাণু ঘাঁটির ওপরে বোমা ফেলেছেন, তখন তো শুধু আমাদের যুদ্ধ নিয়ে চিন্তা হয়নি। আমাদের চিন্তা হয়েছে তেজষ্ক্রিয়তার ‘বিষবাষ্প’ আবার কোন কোন দেশকে গ্রাস করে নেবে। হিরোশিমা-নাগাসাকির বিভীষিকা থেকে আমরা ভেবেছি, যে আবার তেজষ্ক্রিয়তা আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে কতটা আক্রান্ত করবে! ঠিক সেই সময় যখন প্রকৃতি এবং প্রকৃতির ভারসাম্য নিয়ে আবার গোটা পৃথিবীতে জোরদার আলোচনা চলছে, তখন ড. পরিতোষ ভট্টাচার্যের একটি বই, আসলে সুস্থায়ী কৃষি এবং জৈব চাষের উপর আলোকপাত করে, সেই বইয়ের প্রকাশ অবশ্যই আশা জাগায়।(Organic farming)

সুখের কথা, রাজ্য সরকারের উদ্যোগে তৈরি জৈব হাটে এই শনিবার এই বইটি নিয়ে এবং জৈব চাষের উপকারিতা নিয়ে একটি আলোচনা চক্রও হয়ে গেল। পরিতোষ ভট্টাচার্যের এই বইটির ভূমিকা লিখেছেন রাজ্যের প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু, যাঁকে পশ্চিমবঙ্গে জৈব চাষের (Organic farming) অন্যতম প্রাণপুরুষও বলা যায়। মূলত পূর্ণেন্দু বসুর উদ্যোগেই নিউটাউনের সরকারি ভবনে জৈব হাট গত এক বছর ধরে সরকারি উদ্যোগে চলছে। সেখানে শুধু বিভিন্ন জৈব চাষের ফসল পাওয়া যায় তাই নয়, পাওয়া যায় মাছ, মধু, চাল, ডাল ইত্যাদি দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত দ্রব্যই। তার চাইতেও বড় কথা পূর্ণেন্দু বসুর উদ্যোগেই প্রতি মাসের চতুর্থ শনিবার জৈব চাষ এবং জৈব চাষের উপযোগিতা নিয়ে একটি করে আলোচনা চক্রও হয়।

ন্যাশনাল সেন্টার ফর অর্গানিক ফার্মিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং ডিরেক্টর পরিতোষ ভট্টাচার্যের এই বইটিকে নিয়ে কেন লিখছি? লেখার অন্যতম কারণ, যে বিজ্ঞানী হিসাবে পরিতোষ ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক চাষ এবং জৈব চাষের উপযোগিতা নিয়ে কাজ করে চলেছেন। পূর্ণেন্দু বসু যখন তাঁর বইয়ের ভূমিকায় লিখছেন, যে বিজ্ঞানকে ভালোবেসে এবং বিজ্ঞানের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের আবেগকে জড়িয়ে নিয়ে পরিতোষবাবুর কাজকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে হবে, তখন সত্যিই তা আমাদের ভাবায়। বিশেষ করে সমকালীন বিশ্বের পরিস্থিতিতে, যখন বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনা, রাসায়নিক বিষক্রিয়া ইত্যাদি দিয়ে আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতিকে প্রতি মুহূর্তে আঘাত করে চলেছে, তখন পরিতোষবাবুর এই বই এবং সেই বইয়ের জন্য পূর্ণেন্দু বসুর লিখে দেওয়া ভূমিকা আলাদা তাৎপর্য বহন করে।

কেন তাৎপর্য বহন করে? কারণ, পূর্ণেন্দু বসু বইতে যে ভূমিকাটি লিখেছেন, তাতে তিনি স্পষ্ট বলেছেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে ১০-১২ হাজার বছর ধরে প্রাকৃতিক চাষই চলছিল। কিন্তু রাসায়নিক প্রয়োগ করে চাষের বয়স হয়তো মাত্র কয়েক শতক। সেই রাসায়নিক চাষ আমাদের শরীর বা আমাদের জীবনযাপনের কতটা ক্ষতি করতে পারে, সেই নিয়ে ইতিমধ্যেই গোটা বিশ্ব জুড়ে চর্চা শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক চাষ আমাদের বাঁচাতে পারে। কারণ, তা আবার প্রকৃতির কাছে ফিরে যাবে। পরিতোষ ভট্টাচার্যের বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে পূর্ণেন্দু বসু তাই মনে করিয়ে দিয়েছেন, এ আসলে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া, এ আসলে নিজের আত্মা এবং অতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা। কেন প্রাকৃতিক চাষ জরুরি সেই বিষয়ে পূর্ণেন্দু বসু ব্যাখ্যাও করেছেন জৈব হাটের মাসিক আলোচনা চক্রে।

[আরও পড়ুনঃ Bankura: প্রায় ৭০ বছরের ঐতিহ্য! বিড়ি শ্রমিকদের আজও খবর পড়ে শোনান ‘খবরওয়ালা’ পশুপতি নাগ]

পরিতোষ ভট্টাচার্য, যিনি দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি দফতরে কাজ করেছেন, আবার বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন, তিনি তাঁর এই বই, যে বইয়ের নাম ‘প্রাকৃতিক চাষ ও জৈব চাষ এবং সুস্থায়ী কৃষি’, সেখানে খুব চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন পরিচ্ছদের পর পরিচ্ছদে সুস্থায়ী কৃষি বলতে কী বোঝায় এবং তা কেন জরুরি। তাঁর এই বইয়ের অনেক অধ্যায়ের মধ্যে একটি অধ্যায়ের কথা অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘রাসায়নিক চাষ: জেনে শুনে বিষ করেছি পান’, অর্থাৎ কেন আমাদের দেশে রাসায়নিক চাষের সূচনা হল এবং তার থেকে কী কী বিপদ আমাদের জীবনে চলে এল। আমরা সবাই জানি, যে সমস্ত জায়গায় রাসায়নিক চাষ বেশি হয়েছে, সেখানে পরবর্তীকালে ক্যানসারের প্রকোপ কতটা মারাত্মক চেহারা নিয়েছে।(Organic farming)

এই বিষয়ে পাঞ্জাবের কথা না বললেই নয়। কিন্তু পরিতোষবাবু আজকের পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, কেন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে প্রাকৃতিক কৃষির অঙ্গাঙ্গীভাবে যোগ রয়েছে। আজ গোটা পৃথিবীতে যখন ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বা পরিবেশ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে শুরু করে বিশ্বের উন্নত দেশগুলি এই নিয়ে কথা বলছে, তখন পরিতোষ বাবুর গবেষণা এবং কৃষির সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় যোগাযোগের কথা মনে করিয়ে দেওয়া এবং কেন মানুষের প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া জরুরি, সে কথা বারবার উল্লেখ করা, বোধহয় আমাদের নতুন করে ভাবাবে। আমরা যখন, একদিকে রুদ্রপ্রয়াগের ধ্বস থেকে অন্যদিকে কেরালায় প্রতি বছরের বন্যা নিয়ে আলোচনা করছি এবং ভাবছি, যে প্রকৃতি কীভাবে নিদারুণ প্রতিশোধ নিচ্ছে, তখন এই বইটির গুরুত্ব আরও বেশি।

[লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/truthofbengal]

এটা সুখের কথা, যে নিউটাউনে জৈব হাট নামে যে কেন্দ্রটি তৈরি হয়েছে, সেখানে শুধু পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের জৈব চাষের সংগঠকরা দোকান দেননি, তাঁরা নিয়মিত সেইসমস্ত ‘প্রোডাক্ট’ বা ‘পণ্য’ নিয়ে আসেন, যা জৈব চাষের মাধ্যমে উৎপাদিত হচ্ছে। এবং এমনকি সেখানে ইলিশ থেকে মাগুর মাছ পর্যন্ত পাওয়া যায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে পূর্ণেন্দু বসু যখন কৃষিমন্ত্রী ছিলেন, তখন থেকে তিনি জৈব চাষের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এবং তাঁর উদ্যোগেই রাজ্য কৃষি দফতরের সহযোগিতায় এই জৈব হাট প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি চলছে। সেই জৈব হাটে এখন নিয়মিত চাষিদের জন্য আলোচনা চক্র, মাসিক সিম্পোজিয়াম ইত্যাদিও হয়। অর্থাৎ, যাঁরা নতুন করে জৈব চাষে নামবেন বলে ভাবছেন বা যাঁরা এখনই জৈব চাষ করছেন, তাঁদেরও টেকনোলজিকাল বা বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন বিষয়ে যে ধরনের সাপোর্ট সিস্টেম বা সাহায্য দরকার, তা দেওয়া যাতে সম্ভব হয়, সেই বিষয়ে পূর্ণেন্দু বাবুরা বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়েছেন।(Organic farming)

সুখের কথা, যে পরিতোষ বাবুর মতো বিজ্ঞানী, লব্ধপ্রতিষ্ঠ কৃষিবিদরাও এই উদ্যোগে সামিল হয়েছেন। শনিবার পরিতোষ বাবুই বললেন জৈব চাষের বিভিন্ন বিষয়ে। এবং আজকের পৃথিবীতে আবারও বলছি, জলবায়ু বা প্রকৃতির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে মুখোমুখি হওয়ার জন্য কেন জৈব চাষ জরুরি, তা বোঝা দরকার| আমরা যখন ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল কিংবা আমাজনের বিভিন্ন সংকট নিয়ে আলোচনা করি, তা যে আসলে এই ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এরই একটা অংশ, সেটা ভুলে যাই। এই ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বা প্রকৃতির যে পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের নিজেদের জীবনকেও বদলাতে হবে, নিজেদের খাদ্যাভ্যাসকে বদলাতে হবে, নিজেদের চাষাবাদের ধারাগুলিকে বদলাতে হবে, তা চমৎকারভাবে পরিতোষ বাবু তাঁর এই বইতে মনে করিয়ে দিয়েছেন।