সম্পাদকীয়

মেসি ম্যাসাকারের কিছুটা যদি মুছতে পারে এই বইমেলা!

আর্জেন্টিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।

জয়ন্ত চক্রবর্তী: হইহই করে শুরু হয়ে গেল কলকাতা বইমেলা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় এই বইমেলার সূচনা করলেন। এবারের এই বইমেলায় তাঁর লেখা ৯টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এই ২০২৬-এ তিনি এসআইআর নিয়ে ছাব্বিশটি কবিতা লিখেছেন, তারও উদ্বোধন হল বইমেলা প্রাঙ্গনে। এবার বইমেলার থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা। সে  দেশ থেকে বেশ কিছু কবি-সাহিত্যিক এসেছেন এই বইমেলা উপলক্ষে। আর্জেন্টিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ভারতের মানুষ ভাত যেমন পছন্দ করে, আর্জেনটাইনরাও তাই। ওরা তালতাল মাংস পছন্দ করেন, বাঙালি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে তারা গরম গরম মাংসের ঝোল আর ভাত খেতে অপছন্দ করে? আর্জেন্টিনার সঙ্গে ভারতের সব থেকে বড় মিল তাদের ফুটবল প্রীতিতে। আর্জেনটাইনদের ফুটবল অন্ত প্রাণ, বাঙলিদেরও তাই। বিশ্বকাপ ফুটবলে বাঙালি দুভাগ হয়ে যায়। একভাগ ব্রাজিলের সাপোর্টার তো অন্যভাগ আর্জেন্টিনার। ব্রাজিলের ম্যাচ থাকলে সেদিন কলকাতা সাজে হলুদ রঙে, আর্জেন্টিনার ম্যাচ থাকলে কলকাতা হয় সেদিন নীল-সাদা। কলকাতার যেমন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ওদেশেও তেমন বোকা জুনিয়র্স বনাম রিভারপ্লেট। কাতারে কাতারে মানুষ আর্জেন্টিনায় ফুটবল দেখতে যায়, কলকাতাতেও যায়।

ক’দিন আগেই আর্জেন্টিনার এক মহাতারকার সফরকে কেন্দ্র করে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যে ম্যাসাকার ঘটে যায়, কলকাতার সম্মান যতটুকু ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, তার কিছুটা অন্তত উদ্ধার করতে পারে কলকাতা এই বইমেলার মাধ্যমে। মেসির কলকাতা সফরকে কেন্দ্র করে সেই অপ্রীতিকর ঘটনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রথম সারির কাগজে হেডলাইন হয়েছিল। ফূটবলের মক্কায় এই ঘটনা ঘটে যাওয়ায় চর্চা শুরু হয় আর্জেন্টিনাতেও। কারণ, দেশের তো বটেই এই মুহূর্তে বিশ্বের এক নম্বর ফুটবল তারকা লিয়োনেল মেসি। সেই মহাতারকা ঘিরে কলকাতায় যা হয়েছিল, তাতে আর্জেন্টিনার চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। সেই ঘটনার মাত্র কয়েকদিন পর যুবভারতীর একেবারেই কাছে শুরু হল কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। নিয়ম করে প্রতিবার একটি করে দেশ কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় থিম কান্ট্রি হিসেবে অংশ নেয়। যে দেশের সাহিত্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পায় কলকাতার সাহিত্যপ্রেমী মানুষজন।

মেসির দেশের ফুটবল সম্পর্কে বাঙালির জানার আর কিছু বাকি নেই। সে দেশের মানুষ নিজের দেশের জয়ে যতটা উদ্বেলিত হয়, বলা যায় অর্ধেক বাঙালি সেই একই ভাবে আর্জেন্টিনায় জয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। হতে পারে বিচ্ছিন ঘটনা। তবুও মেসিকে ঘিরে কলকাতায় যা ঘটেছিল তাতে এই শহরের ফুটবলপ্রেম সম্পর্কে একটা প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল। কলকাতার ফুটবলপ্রেমীরা দ্রুত ভুলে যেতে চাইবে সেই ঘটনা। হয়তো ভূলেও গিয়েছে। আবার এটা বলা যায়, আবেগ থেকে যা ঘটে গিয়েছিল, তাতে কলকাতার মানুষের ফুটবলপ্রেম বিশেষ করে আর্জেন্টিনাপ্রীতি একটু কমেনি। এবারের বইমেলায় মেসির দেশ আর্জেন্টিনা থিম কান্ট্রি। আর এই বইমেলায় সেই আর্জেন্টিনা সঙ্গে সাহিত্যের সেতু রচনা হয়েছে। যা দুই দেশের মানুষের কাছে একটা বিরাট পাওনা। কলকাতা তথা বাংলার মানুষের সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্কে প্রেম নিয়ে সে দেশের বড় অংশের মানুষ ওয়াকিবহাল। এবার এই বইমেলাকে কেন্দ্র করে সাহিত্যের যে সম্পর্কে গড়ে উঠেছে তাতে দুই দেশের হৃদ্যতা আরও যে গাঢ হবে তা বলাই বাহুল্য। আর এই সুযোগে মেসি-কাণ্ডের সেই ক্ষত কিছুটা সারিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে কলকাতার সামনে। বইমেলা সেই সুযোগ করে দিল। ফুটবলা আর সাহিত্যে আরও কাছাকাছি আসুক দুই দেশ।

শুনলাম, ইন্ডিয়ান ফুটবল আসোসিয়েশন বা আইএফএ নাকি একটি স্টল দিয়েছে এই বইমেলায়। আর্জেন্টিনার কোনও বইমেলায় কোনও ফুটবল আসোসিয়েশন স্টল দেবে? এতদ্বারা কি কলকাতার মানুষ কতটা ফুটবলে মজে আছে, তা কি বোঝা যাচ্ছে না? মেসি-কাণ্ড একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তাই দিয়ে কলকাতার ফুটবল আবেগকে মাপা যায় না। একটি বইমেলায় ফুটবলের স্টল, ভাবা যায়! পনেরো বছর পরে বইমেলায় চিনের আবির্ভাব তৎপর্যপূর্ণ। ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান; বলার যুগ আর সময় আর নেই। তবু, চিনের সমকালীন সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় হবে, সেটাই বা কম কিসের!এখন থেকে আগামী কয়েকদিন জমজমাট থাকবে কলকাতা। প্রতিদিন বইপার্বণে মেতে উঠবে লক্ষ লক্ষ মানুষ। এটা মেসিকে কেন্দ্র করে হতে পারে আবে বই— এটাই কলকাতা। এটাই কলকাতার আবেগ।

Related Articles