রান্নাঘর

রেজালার ঘিয়ে মাংসের টুকরো,সত্তর বছর পেরিয়েও ‘সাবির’-এর জাদু

Sabir's Hotel

The Truth of Bengal: রেজালা আর নান- সত্তর বছর পেরিয়েও ‘সাবির’-এর জাদু টিন রেজাল মউন শাহি টুকরা বা অটুট। মটন রেজালা। নান রুটি। শেষ পাতে ফিরনি। আর পর্দার আড়ালে থাকা কেবিনে নিভৃত আলাপচারিতা। এটাই ছিল আমাদের কৈশোর, যৌবনে সাবির’স হোটেলের অমোঘ আকর্ষণ। চাঁদনির সাবির’স হোটেল অবশ্য গত সাত দশক ধরেই  কলকাতার অন্যতম ‘আইকনিক রেস্টুরেন্ট’। সাবির’স-এর বর্তমান প্রজন্মের কর্ণধাররা যেমনটা দাবি করেন, একবার যিনি এই মোগলাই রেস্তোরাঁয় খেয়ে গেছেন, তিনি কলকাতা ছেড়ে চলে গেলেও এ শহরে এলেই ফিরে আসবেন ওই মটন রেজালা আর নান রুটির যুগলবন্দিকে চাখতে। ধর্মতলা কিংবা চাঁদনিতে কোনও সময় চাকরি করেছেন, এমন মানুষদের জন্য সত্যি সাবির’স-এর এই দুটি বিখ্যাত ‘ডিশ’ ভুলে যাওয়া কঠিন। এই যেমন সেদিনই কলকাতায় এসে বিজেপির সাংসদ এবং প্রাক্তন বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর আমায় জিজ্ঞাসা করছিলেন, সাবির’স-এর মটন রেজালার স্বাদ কি একইরকম আছে? আকবর নিজে যেহেতু চাঁদনি এলাকায় দুটি ইংরাজি দৈনিক প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং দীর্ঘদিন সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাই রাত বিরেতে সাবির’স-এর মটন রেজালা চাখেননি, এমনটা হতে পারে না। তাই এই সেলিব্রিটি সাংবাদিক এখন যতই আফ্রিকা কিংবা ইউরোপ ঘুরে বেড়ান, কলকাতায় পা রাখলে তাঁর সাবির’স-এর কথা মনে পড়বেই।

অন্য অনেক মোগলাই রেস্তোরাঁর মতো, সাবির’স রেস্তেরাঁয়ও বিরিয়ানি থেকে চিকেন চাপ, রেশমি কাবাব থেকে তন্দুরি চিকেন সবই পাওয়া যায়। কিন্তু এক একটি রেস্টুরেন্টের একটি করে ডিশ যেমন বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তেমনই সাবির’স-এর মটন রেজালা আর নান রুটি অনেকেই অবশ্য তার সঙ্গে যোগ করেন সাবির’স-এর স্পেশাল ‘চা’কে। একেবারে লখনৌয়ের মেজাজ যেন ধরা আছে মোগলাই রেস্তোরাঁর এই ‘চা’-তে। সকালে কিংবা দুপুরে শুধু রেশমি কাবাব আর চায়েরও মারকাটারি বিক্রি সাবির’স রেস্তোরাঁয়। হাজী সাবির আলি ১৯৪১ সালে অর্থাৎ স্বাধীনতার আগে কলকাতায় চলে এসে রেস্তোরাঁর ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু একেবারে শহরের প্রাণকেন্দ্রে, অর্থাৎ চাঁদনিতে সাবির’স হোটেলের উদ্বোধন হয় ১৯৪৮ সালে, অর্থাৎ দেশভাগের ঠিক পর পর। সেই সময়ের কলকাতায় অনেক বাড়িতেই মহিলাদের নিয়ে রেস্তোরাঁয়। গেলেও একটু অবগুণ্ঠন বা আড়ালের প্রয়োজন হত। বেশি করে দরকার পড়ত হয়তো রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারদের জন্য। সেই কারণেই বুদ্ধিমান সাবির আলি তাঁর চাঁদনি চকের রেস্তোরাঁয় দোতলায় শুরু করেন পর্দা দেওয়া কেবিন। দীর্ঘদিন ধরে সাবির’স-এর এই পর্দাঘেরা কেবিন ছিল অনেকের কাছে অমোঘ আকর্ষণ। সদ্য প্রেমে পড়েছেন, কিন্তু বাড়ির লোকের সামনে তা প্রকাশ করতে চান না, এমনতর যুগলদের জন্য মধ্য কলকাতায় সাবির’স-এর পর্দাঢাকা কেবিন ছিল প্রিয় ডেস্টিনেশন।

সাবির’স-এর রেজালার আসল ম্যাজিকটা কোথায়? সাবির আলির তৃতীয় প্রজন্ম, যাঁরা বর্তমানে এই রেস্তোরাঁ চালাচ্ছেন, তাঁদের দাবি অনুযায়ী গত ৭০ বছর ধরে যে রন্ধনশৈলী তাঁরা অনুসরণ করে আসছেন, আসলে সেটাই যাবতীয় তফাৎ গড়ে দেয়। সাবির’স-এর কর্ণধারদের দাবি অনুযায়ী, মাংস, দই, ঘি দিয়ে রেজালা তৈরি করতে তাঁরা অন্তত চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় নেন। যে যত্ন এবং যে অধ্যবসায় দিয়ে উনুনের আঁচে রেজালাকে তৈরি করা হয়, সেটাই আসলে গত সাত দশক ধরে ভোজন রসিকদের মুগ্ধ করে রেখেছে। সাবির’স রেস্তোরার একটা মজা হচ্ছে শহরে যতই তোলপাড় হোক, এই মোগলাই রেস্তোরার দরজা চট করে বন্ধ হয় না। প্রবল বনধের দিনেও আমরা সাবির’স-এ চলে গিয়েছি মাটন রেজালা আর নান দিয়ে উদরপূর্তি করতে। এই জন্যেই হয়তো এই করোনা কালের পরেও সাবির’স আবার খাবারের আয়োজন নিয়ে যথা নিয়মে ফিরে এসেছে তার ভোজনরসিকদের জন্য। চাঁদনির এই রোজোমায যেহেতু জায়গার অভাব নেই, তাই সামাজিক দূরত্ববিধি মেনেও দিব্যি কাবাব কিংবা তন্দুরি খেয়ে ফেলা যায়। নির্বাচনের মরসুম হোক কিংবা সামাজিক দূরত্ববিধি বজায় রাখার কাল, রবিবারের দুপুরের জন্য কিন্তু সাবির’স-এর মটন রেজালা আর নানের কোনও বিকল্প হতে পারে না।

Related Articles