রাজ্যের খবর

পুজোয় একের পর এক পার্টি অফিস-বুকস্টলে হামলা! তবুও রেকর্ড বই বিক্রি করে চমকে দিল সিপিএম

১৯৫২ থেকে শুরু ঐতিহ্য! হাজার হাজার বাধা সত্ত্বেও কীভাবে বাংলায় ১৭০০ স্টল গড়ল কমরেডরা?

Truth of Bengal: শারদোৎসবের আনন্দ ও পুজোর দিনগুলিতেও ভাঙাগড়ায় ব্যস্ত থাকতে হল কমরেডকুলকে। পুজোর পাঁচটা দিন প্রতি মুহূর্তে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএমের রাজ্য সদর দফতরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বুকস্টল ভাঙচুরের একের পর এক খবর এসে পৌঁছয়। কিন্তু এত চাপ ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও মাথানত করতে নারাজ ছিলেন কর্মীরা। বরং সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ভেঙে যাওয়া স্টলগুলোই ফের নতুন করে গড়ে তোলার বার্তা দেওয়া হয়। হাল না ছেড়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ফলে দু-একটি বিচ্ছিন্ন জায়গা বাদ দিয়ে রাজ্যের প্রায় সর্বত্রই নতুন রূপে মাথা তোলে বামেদের বইয়ের স্টল। আর তাতেই এবছর রেকর্ড পরিমাণ বই বিক্রি হয়েছে বলে দাবি করেছেন দলের নেতা-কর্মীরা। যদিও সঠিক ও চূড়ান্ত হিসেব পেতে আরও দু-একদিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

বুধবারও সন্তোষপুর এলাকায় বুকস্টলে গিয়ে স্বয়ং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বই বিক্রি করেন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। অন্যদিকে, কসবার বিবি চ্যাটার্জি রোডের গত ৪০ বছর ধরে চলে আসা পরিচিত বুকস্টলটি এবার করতে বাধা দেয় পুলিশ ও বিজেপি। কিন্তু তাতেও দমে যায়নি কর্মীরা। এলাকার এক বাসিন্দা মিলন বন্দ্যোপাধ্যায় শাসকের রক্তচক্ষুকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের বাড়ির গ্যারেজটিই স্টলের জন্য খুলে দেন। তাঁর স্পষ্ট কথা, যাঁরা বইয়ের প্রকৃত মর্ম বোঝেন না, তারাই কেবল এ ধরনের হামলা চালাতে পারে। একইভাবে হালতুর শক্তি সংঘের সামনেও বুকস্টল বসাতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করেই স্টল চালান সিপিএম কর্মীরা, আর তার ফলেই অতীতের সমস্ত বিক্রির রেকর্ড ভেঙে একদিনেই সেখানে ১০ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়। যাদবপুর, হালতু বা কসবা ছাড়াও দমদম, বারাকপুর, পুরুলিয়া, বারাসত রাজ্যের সর্বত্রই এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি আসানসোলের কয়লা খনিতে মাটির ওপরেই শ্রমিকরা হিন্দিতে অনূদিত সাহিত্য ও মার্কসীয় বই বিক্রি করেছেন। তবে হামলা শুধু স্টলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বৃহস্পতিবার রাজারহাটেও সিপিএম কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। বিজেপির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠলেও রাজারহাটের বিজেপি বিধায়ক পীযূষ কানোরিয়ার দাবি, অনেক মার্কস ও লেনিন হয়েছে, সাধারণ মানুষ এখন আর বিদেশিদের আদর্শ মানতে চাইছে না।

উল্লেখ্য, শারদোৎসবের সময় বামেদের এই বুকস্টলের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৫২ সালে প্রথম পার্ক সার্কাস ও বাগবাজার সর্বজনীনে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি এই বইবিপণি চালুর প্রথা শুরু করেছিল, যার মূল পুরোধা ছিলেন মুজফ্ফর আহমেদ, যিনি বাম মহলে ‘কাকাবাবু’ নামে অত্যন্ত জনপ্রিয়। পরবর্তীতে পুজো কমিটির পরিকল্পনা বদলের কারণে পার্ক সার্কাসে স্টল দেওয়া বন্ধ হলেও বাগবাজারের স্টল এখনও চালু রয়েছে। এবছর সারা রাজ্য জুড়ে কমবেশি ১৭০০টি স্টল করেছিল সিপিএম।

বাম নেতৃত্বের মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আক্রমণ অতীতেও হয়েছে। কংগ্রেস আমলেও সূর্য সেন স্ট্রিটে ন্যাশনাল বুক এজেন্সির মূল অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যদিও পুজোর স্টলে কংগ্রেসের হামলার নজির খুব বেশি নেই। অন্যদিকে, তৃণমূল জমানার শুরুর দিকেও বহু এলাকায় স্টল করতে না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন নেতারা। তবে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অতীতের গুণগত তফাত রয়েছে বলে দাবি করেছেন বাম নেতারা। ন্যাশনাল বুক এজেন্সির অধিকর্তা ও প্রকাশক তথা সিপিএম নেতা অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী জানান, পার্টি স্টলগুলিতে দলীয় পত্রপত্রিকা ছাড়াও বিভিন্ন প্রগতিশীল লেখকদের মূল্যবান বই বিক্রি করা হয়, যার মধ্যে বিক্রি হওয়া মোট বইয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই থাকে পার্টির নিজস্ব মুখপত্র ও পত্রপত্রিকা।