পুজোর আগে রাস্তা, আলো ও পরিচ্ছন্নতায় জোর, ১৪ অক্টোবরের মধ্যে বেতন মেটানোর নির্দেশ
১৩ অক্টোবরের মধ্যে বদলাতে হবে বিকল পথবাতি
জ্যোতির্ময় দত্ত, কলকাতা: দুর্গাপুজোর আগে শহর থেকে জেলা—সর্বত্র নাগরিক পরিষেবা উন্নত করতে তৎপর রাজ্য সরকার। রাস্তা মেরামত, পথবাতি সচল রাখা, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ডেঙ্গি প্রতিরোধ এবং গঙ্গার ঘাটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরসভা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মীদের বেতন মেটানোর উপরেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার নগরোন্নয়ন ও পুর দফতরের পর্যালোচনা বৈঠকে একাধিক বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
বৈঠকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, দুর্গাপুজোর আগে নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। পুজোমণ্ডপে যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করতে রাস্তা মেরামতের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক পর্যালোচনায় জানানো হয়, অধিকাংশ রাস্তার সংস্কারের কাজ শেষ হলেও কিছু জায়গায় এখনও কাজ বাকি রয়েছে। সেই কাজ আগামী তিন দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ১৩ অক্টোবরের মধ্যে সমস্ত বিকল রাস্তার আলো বদলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে রাতের বেলায় পুজো দেখতে বেরিয়ে সাধারণ মানুষকে সমস্যায় পড়তে না হয়।
পরিচ্ছন্নতায় বিশেষ অভিযান, নজরে ডেঙ্গি
পুজোর মরসুমে শহর ও পুর এলাকাগুলিকে পরিচ্ছন্ন রাখতে বিশেষ অভিযানের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পুরসভা এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আবর্জনা পরিষ্কার, নোংরা এলাকা চিহ্নিত করা এবং দ্রুত সাফাইয়ের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। জনবহুল এলাকা ও পুজোমণ্ডপ সংলগ্ন রাস্তাগুলিতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নাগরিক পরিষেবা সচল রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গি প্রতিরোধেও নজরদারি জারি রাখার কথা বলা হয়েছে। পুরসভাগুলিকে মশার বংশবিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, জমা জল পরিষ্কার এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিয়মিত নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উৎসবের সময় জনসমাগম বাড়লেও যাতে সংক্রমণ মোকাবিলায় কোনও ঢিলেমি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে পুর কর্তৃপক্ষকে।
গঙ্গার ঘাটে নিরাপত্তা, বিসর্জনে বিশেষ নির্দেশ
মহালয়ার তর্পণ এবং দুর্গাপুজোর প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে গঙ্গার ঘাটগুলিতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, নদী পুলিশ এবং উপকূল পুলিশকে সমন্বয় রেখে কাজ করতে বলা হয়েছে। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনা এড়ানো এবং বিসর্জনের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাবিধি মেনে চলার উপরেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমা বিসর্জনের ক্ষেত্রে ক্রেন ব্যবহার না করে ধর্মীয় রীতি মেনে বিসর্জন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গিয়েছে। ঘাটগুলিতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং বিসর্জনের পর দ্রুত আবর্জনা সরানোর বিষয়টিও পুর সংস্থাগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
১৪ অক্টোবরের মধ্যে বেতন, বকেয়া বিলেও নজর
পুজোর আগে পুরসভা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মীদের আর্থিক স্বস্তি দিতে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে সমস্ত কর্মীর বেতন মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বেতনও যাতে বকেয়া না থাকে, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। তাঁদের জন্য বিশেষ বোনাস দেওয়ার বিষয়টিও প্রয়োজনে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্লিচিং পাউডার-সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের ক্ষেত্রে যে বিলগুলি বকেয়া রয়েছে, তার অন্তত ৩০ শতাংশ মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পুজোর আগে পুর পরিষেবা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সে দিকেও নজর রাখছে প্রশাসন।
রাস্তা ও নিকাশি প্রকল্পে বরাদ্দের হিসাব
বৈঠকে সরকারি পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানানো হয়েছে, ১২৪টি পুরসভা ও পুরনিগমের অধীনে ৩,৩৪৯টি রাস্তার জন্য ৮৫১.৭৯ কোটি টাকার প্রশাসনিক ও আর্থিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১১টি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে ১০৬টি রাস্তার জন্য অনুমোদিত অর্থের পরিমাণ ৭২.২৯ কোটি টাকা।
জলনিকাশি ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কেএমডিএ-র ৩৩টি প্রকল্পে ২৪.৬৮ কোটি টাকার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। বর্ষার পর রাস্তার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত এবং জল জমার সমস্যা কমানোর ক্ষেত্রে এই প্রকল্পগুলির গুরুত্ব রয়েছে।
পর্যটনস্থল ও আবাসনেও আলোকসজ্জার উদ্যোগ
শুধু পুরসভা এলাকার রাস্তা ও ঘাট নয়, গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনস্থলগুলিকেও উৎসবের আগে আলোকিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনকেডিএ, কেএমডিএ এবং হিডকো-সহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে নিজেদের তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি শপিং মল, আবাসন ও সমবায়গুলিকেও পরিচ্ছন্নতা ও আলোকসজ্জার কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোর আগে নাগরিক পরিষেবা সচল রাখা, কর্মীদের বেতন নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে উৎসব সম্পন্ন করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নির্দেশগুলি কার্যকর করা গেলে পুজোর দিনগুলিতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও নাগরিক পরিষেবা আরও স্বচ্ছন্দ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।






