রাজ্যের খবর

জামালপুরে যেন আর এক সন্দেশখালি! ক্ষমতা বদলাতেই তৃণমূল নেতা তাবারকের বালি লুটের সাম্রাজ্য ফাঁস করলেন গ্রামবাসীরা

জামালপুর ব্লকের জ্যোৎশ্রীরাম অঞ্চলের এক অখ্যাত গ্রাম শাহহোসেনপুরের বাসিন্দা তাবারক আলি মণ্ডল ছিলেন তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের ব্লক সভাপতি।

Truth of Bengal: সন্দেশখালির শেখ শাহজাহানের আতঙ্ক ও সন্ত্রাসের স্মৃতি এখনও রাজ্যবাসীর মনে টাটকা। জমি কেড়ে নেওয়া, তোলাবাজি ও নারীদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগে সন্দেশখালির মানুষ যেভাবে গর্জে উঠেছিল, তার জেরে শাহজাহান এখন শ্রীঘরে। তবে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই এবার পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর বিধানসভা এলাকায় আরও এক ‘শাহজাহান’-এর লুণ্ঠন ও সন্ত্রাসের সাম্রাজ্যের পর্দা ফাঁস করলেন উত্তেজিত গ্রামবাসীরা। জামালপুরের এই দাপুটে তৃণমূল নেতার নাম তাবারক আলি মণ্ডল, যিনি শাহজাহানের মতোই বর্তমানে পুলিশের খাঁচায় বন্দি হয়ে শ্রীঘরে দিন কাটাচ্ছেন।

জামালপুর ব্লকের জ্যোৎশ্রীরাম অঞ্চলের এক অখ্যাত গ্রাম শাহহোসেনপুরের বাসিন্দা তাবারক আলি মণ্ডল ছিলেন তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের ব্লক সভাপতি। তাঁর স্ত্রী আরিফা মণ্ডল আবার ওই অঞ্চলেরই তৃণমূল পরিচালিত গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান। স্থানীয় জামালপুর ব্লক তৃণমূল সভাপতি মেহেমুদ খাঁনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তাবারক ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এলাকায় নিজের একচ্ছত্র ‘বেতাজ বাদশা’ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, মাত্র ৫ বছর আগে এক সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে তাবারক দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, বালি লুট ও ১০০ দিনের কাজের টাকা আত্মসাৎ করে আজ কোটি কোটি টাকার বিপুল সম্পত্তির মালিক বনে গিয়েছেন। প্রতিবাদ করলেই জুটত হাত-পা বেঁধে বকুলতলার ডেরায় নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর।

২০২৬-এর নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপি সরকার আসতেই এলাকা ছেড়ে চম্পট দিয়েছিলেন তাবারক। তবে শেষরক্ষা হয়নি; এক বিজেপি নেতার দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে গত ১৩ মে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। তাবারক জেলবন্দি হতেই ফতেপুর, কৃষ্ণরামপুর ও শাহহোসেনপুরের শয়ে শয়ে সাধারণ মানুষ তাঁর তৈরি করা টর্চার চেম্বার ও অপকর্মের ডেরাগুলির ওপর ক্ষোভে ফেটে পড়েন। গ্রামবাসীরা শাহহোসেনপুর গ্রামের একটি সরকারি ফ্লাড সেন্টারে তল্লাশি চালিয়ে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার মতো দৃশ্য দেখতে পান। সরকারি ওই ফ্লাড সেন্টারটিকে তাবারক নিজের ব্যক্তিগত ডেরা বানিয়ে রেখেছিলেন। সেখান থেকে উদ্ধার হয়েছে সরকারি চালের বস্তা, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, তৃণমূলের ঝান্ডা-লাঠি, খালি মদের বোতল এবং কয়েকশো গরিব মানুষের ১০০ দিনের কাজের জব কার্ড ও জমির দলিলের জেরক্স। গরিবদের দেওয়ার জন্য বরাদ্দ সরকারি সামগ্রী এখানে মজুত করে কালোবাজারে বিক্রি করা হতো বলে অভিযোগ। এমনকি দামোদর নদ থেকে অবৈধভাবে লুট করা বিপুল বালি বর্ষার মরশুমে চড়া দামে বিক্রির জন্য এই চত্বরে মজুত করা ছিল, যার হিসাবের খাতাটিও উদ্ধার হয়েছে।

তাবারকের এই লুটের সাম্রাজ্য ফতেপুর ও মাধবডিহি থানা এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কৃষ্ণরামপুর গ্রামের শেষ প্রান্তে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সরকারি কমিউনিটি হলকে তাবারক ও তাঁর লেঠেল বাহিনী আমোদ-প্রমোদের ডেরায় পরিণত করেছিল। বালি লুটের রাস্তা সুগম করতে ফতেপুর গ্রামের শ্মশান ভূমি এবং শ্মশান লাগোয়া গঙ্গা দেবীর পূজার বেদি গুঁড়িয়ে দিয়ে লরি ও ডাম্পার চলাচলের রাস্তা বানিয়েছিলেন এই তৃণমূল নেতা। চাষিদের জমি জোরপূর্বক দখল করে মাটি ও বালি তুলে দু-মানুষ সমান গভীর গর্ত করে দেওয়া হয়েছিল। অথচ পাশেই তৈরি হওয়া একটি প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকের অভাবে বছরের পর বছর তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ এখন তাবারক আলি মণ্ডলের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থা ইডি (ED) ও সিবিআই (CBI) তদন্তের দাবি তুলেছেন।

সরকারি সম্পত্তি এভাবে দুষ্কৃতীদের ডেরায় পরিণত হওয়া নিয়ে জামালপুরের বিডিও পার্থসারথি দে প্রথমে দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও পরে স্বীকার করেন যে, ফ্লাড সেন্টার ও কমিউনিটি হলের চাবি পঞ্চায়েতের কাছেই ছিল। তবে সেখানে কী চলত, তা তিনি জানতেন না। এই বিষয়ে জামালপুর ব্লকের তৃণমূল সভাপতি মেহেমুদ খাঁনকে ফোন করা হলেও তিনি এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে জামালপুরের বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার একে অত্যন্ত ভয়াবহ ও নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই লুণ্ঠন সাম্রাজ্যের নেপথ্যে থাকা সমস্ত রাঘববোয়ালদের শাস্তি নিশ্চিত করতে রাজ্য প্রশাসনের কাছে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।