ভোটের মধ্যেই জীবনযুদ্ধ! মধুর খোঁজে গভীর জঙ্গলে পাড়ি সুন্দরবনের মৌলেদের
ভোটের আবহে কুলতলির গহীন অরণ্যে শুরু এক অন্য বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
গোপাল শীল, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: বাংলার রাজনৈতিক মহলে এখন সাজ সাজ রব, দিকে দিকে ভোটের প্রচার। কিন্তু সুন্দরবনের কুলতলিতে ছবিটা একেবারেই অন্যরকম। ভোটের ডামাডোলের মাঝেই পেটের টানে জীবন বাজি রেখে গভীর জঙ্গলে পাড়ি দিলেন একদল ‘মৌলে’। ভোট আসে, ভোট যায়, সরকার বদলায়, কিন্তু সুন্দরবনের এই মধু সংগ্রাহকদের ভাগ্য যেন সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে। এবারও ভোটের আবহে কোনও পরিবর্তনের আশা না করেই, সন্তানদের মুখে অন্ন জোগাতে জঙ্গলকেই বেছে নিলেন তাঁরা।
তবে এবার মধু সংগ্রহের ক্ষেত্রে বনদফতরের পক্ষ থেকে জারি করা হয়েছে একগুচ্ছ কঠোর নিয়মাবলী। দফতর জানিয়েছে, শুধুমাত্র অভিজ্ঞ মৌলেদেরই জঙ্গলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। যাঁদের বৈধ পরিচয়পত্র, জেনারেল ইন্সুরেন্স এবং ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে বয়স, তাঁরাই পাবেন এই বিশেষ ‘পাস’। সোমবার কুলতলি থেকে একদল মৌলে বনদপ্তরের সমস্ত শর্ত মেনে এবং সুরক্ষা-সরঞ্জাম নিয়ে গভীর সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। দফতরের তরফে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসার কিট, মধু রাখার পাত্র, মাস্ক এবং বিশেষ মুখোশ।
মৌলেদের সঙ্গে বনদপ্তরের এবারের চুক্তিতেও থাকছে বিশেষ শর্ত। সংগৃহীত সমস্ত মধু সরকারের হাতে তুলে দিতে হবে। তার বিনিময়ে মৌলেদের মিলবে নায্য মূল্য। বনদফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার মধুর দাম কেজি প্রতি ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। মৌলেরা ‘এ’ গ্রেডের মধুর জন্য পাবেন কেজি প্রতি ২৭৫ টাকা এবং ‘বি’ গ্রেডের মধুর জন্য পাবেন ২৩৫ টাকা। চলতি মরশুমে সুন্দরবন থেকে ১ মেট্রিক টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে বনদফতর।
জঙ্গলে যাওয়ার প্রাক্কালে এক প্রবীণ মৌলে আক্ষেপের সুরে বলেন, “ভোটের প্রচার কানে আসছে, কিন্তু আমাদের জীবন তো একই রয়ে গেল। আমাদের সুরক্ষা আর ভাতার কথা কেউই ভাবল না। তাই বাঘের ভয় মাথায় নিয়েই মধু সংগ্রহের পথে নামতে হচ্ছে।” রাজনৈতিক দলগুলো যখন বড় বড় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তখন দক্ষিণরায়ের ডেরায় কুলতলির এই মানুষদের লড়াই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আজও জঙ্গলমহলের জীবন কতটা কঠিন।


