ঘাসফুলের পতন-উত্থান নব্য তৃণমূলের, সর্বহারা মমতা: মেঘের আড়ালে ইন্দ্রজিৎ শুভেন্দু অধিকারী
ইন্দ্রজিতের মত মেঘের আড়াল থেকে তির ছুড়লেন রাজ্যের কিংবদন্তি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

জয় চক্রবর্তী: ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে বীজ বপন হয়েছিল। আর ১৯৯৮ সালের জানুয়ারি মাসের এক তারিখ পশ্চিমবঙ্গে এক নতুন দলের সূচনা হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেস। এরপর ক্ষমতায় আসা ২০১১ সালে। দল ক্ষমতায় থাকল ১৫ বছর। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এসে দলের ভরাডুবি হল। বিরোধী দল হিসাবে বিধানসভায় মোকাবিলা করবে ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস।
এটাই মেনে নিয়ে কর্মপদ্ধতি এগোতে শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই কয়েকজন ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠলেন। ২০২৬ সালের ৩ জুন। ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কের স্বাক্ষর সম্বলিত চিঠি দেওয়া হয় বিদ্রোহী তৃণমূলের পক্ষ থেকে। চিঠি মঞ্জুর হয়। নয়া তৃণমূলের জন্ম হয়। পুরনো তৃণমূল ভেঙে খান খান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি শুধুমাত্র বিরোধী দলনেত্রী তারপর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন সেটা নয়। ভারতবর্ষের অন্যতম সেরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার হাত ধরেই ঘাসফুলের যাত্রা শুরু। আজ তিনি দাঁড়ালেন শুধুমাত্র একজন নেত্রী। একদা তৃণমূল কংগ্রেসের ‘ফাউন্ডার’ এখন শুধুই খেলা দেখছেন। ‘খেলা হবে’ স্লোগান তুলেছিলেন গোটা পশ্চিমবঙ্গে। আজ তিনি খেলা দেখছেন। এর জন্য শুধুই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দায়ী? “আমি একদম মনে করি না। আজকের যা অবস্থা তার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও দায়ী। অভিষেককে অভিষেক তৈরি করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাহলে ওকে একা দায়ী করার যৌক্তিকতা কোথায়?” প্রশ্ন তুললেন এক সময় কার রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। এরপর একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রাক্তন মন্ত্রী জানালেন, “একটা কর্পোরেট সংস্থাকে দিয়ে এইভাবে দল চালানো উচিত নয়। আমি অনেকবার প্রতিবাদ করেছি। আমার সাথে ঝগড়াও হয়েছে। আইপ্যাক তো সংগঠন নয়। উনি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) কথা শুনেননি।” ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম। আবার ২০২৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের সম্পূর্ণ পতন আবার নয়া জন্ম। একজন কিন্তু পর্দার আড়ালে হাসছেন। তিনি হলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা ভারতীয় জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গের মুখ শুভেন্দু অধিকারী। কার্যত তার চালেই মমতার মাথায় হাত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন সত্যিই সর্বহারা। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি তৃণমূল কংগ্রেসের বিপক্ষে বলেনি। প্রতিবাদ এবং স্বাক্ষর কাণ্ডে অভিযোগ এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। আইনগতভাবে এগিয়েছেন বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বোস। পার্থ চট্টোপাধ্যায় বর্তমান রাজনৈতিক আবহে সেই বিষয়টাই তুললেন যা এখন বিভিন্ন তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের মনের কথা।”সেদিন যদি শুভেন্দু অধিকারীকে দল থেকে না সরানোর পরিকল্পনা হতো তাহলে এই দিন দেখতে হত না” সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের নেতা-নেত্রীরা আর যে চাইছেন না তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পরেই। তার প্রতিফলন ঘটল যখন বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়করা বিরোধী দলনেতা হিসাবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে মান্যতা না দিয়ে আইনের পথে হেটে স্বাক্ষর কাণ্ডে অভিযোগ জানালেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা বিদ্রোহের প্রদীপের শিখায় আগুন জ্বালালেন। আর সেখানেই যোগ দিবেন আপাতত ৫৮ জন। একদিকে বিরোধী দলের তকমা এবং বিরোধী দলনেতা হিসাবে নতুন করে কাউকে বেছে নেওয়া যাবে। আবার নির্বাচন কমিশনে আবেদন করলে দলের প্রতীক সহ সমস্ত বিষয়বস্তু তাদের হাতে চলে আসবে।
মহারাষ্ট্রে শাসকপক্ষকে ভেঙে নতুন দল তৈরি করে ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করেছিল বিজেপি। প্রায় একই কায়দা। কিন্তু ইন্দ্রজিতের মত মেঘের আড়াল থেকে তির ছুড়লেন রাজ্যের কিংবদন্তি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বাংলায় বিরোধীপক্ষে আড়াআড়ি বিভাজন তৈরি করে শুধু মূল বিরোধী শক্তির শিরদাঁড়া ভাঙাই নয়, অন্য বিরোধীদেরও বিশেষ বার্তা। তবে এক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতর থেকেই প্রতিবাদের আগুন উঠে এলো। ভুল স্বাক্ষর, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এর চিঠি, রেজিলিউশন সঠিক অর্থে না দেওয়া সবটাই আইনগত অভিযোগের ভিত্তিতে বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে জমা পরল তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের থেকেই। মহারাষ্ট্রের মডেল থেকে বেশ খানিকটা আলাদা। এবং উন্নতও বটে। আর ফলাফল?
পরিস্থিতির এমনই পরিহাস যে তৃণমূলের জন্মদাত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ‘নব্য তৃণমূল’-এর মুখ্য পরামর্শদাতা হওয়ার জন্য “অফার” করলেন মমতার হাত ধরেই সিপিআইএম থেকে তৃণমূলে এসে রাজ্যসভা সাংসদ, ট্রেড ইউনিয়ন সভাপতি ও প্রথমবার বিধায়ক হওয়া “নব্য” তৃণমূল নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। আসলে ভোটের ফলাফল সামনে আসতেই তৃণমূলের ভিতরে আড়াআড়ি বিভাজন স্পষ্ট হয়েছিল। পরিষদীয় দলনেতা কে হবেন তা নিয়ে দলীয় বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশ সেই আগুনে ঘি ঢালে। বৈঠকে যারা বিদ্রোহী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তাদের মধ্যে অন্যতম ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সাহা, শিউলি সাহা ও অন্যান্যরাও। বলাই বাহুল্য, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একদিকে দুর্নীতি, অপরাধকে সামনে রেখে সামাজিক ও আইনিভাবে তৃণমূলের ‘টার্গেট’ নেতাদের বেআইনি কাজকর্ম প্রকাশ্যে এনে রাজনৈতিক ময়দান থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া এবং একইসঙ্গে দলের অভ্যন্তরে ভাঙন ধরিয়ে তৃণমূলকে আরও কোণঠাসা করতে তৎপর হয় শাসক বিজেপি। পাশাপাশি তৃণমূল নেত্রীর রাজ্যের বিজেপি বিরোধী সব দলকে এক ছাতার তলায় আনার আবেদন এবং সর্বভারতীয় স্তরে ইন্ডিয়া বৈঠকে যোগ দেওয়ার প্রাক্কালে তৃণমূলকে আরও বেশি শক্তিহীন করার কৌশল হাতছাড়া করতে নারাজ বিজেপি। নব্য তৃণমূলীদের মতে “মমতার তৃণমূল আজ মমতার হাতছাড়া। হাইজ্যাক করেছে অভিষেক ও তাঁর কর্পোরেট সংস্থা। মা মাটি মানুষের সংযোগ ছেড়ে কর্পোরেট সংস্থার দলে পরিণত। দলনেত্রীর সিদ্ধান্ত সেখানে গুরুত্বহীন হয়ে কর্পোরেট সংস্থার (পড়ুন অভিষেকের) সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বলে গণ্য হয়। সংসদীয় বা পরিষদীয় দলেও দলনেত্রীর সিদ্ধান্ত গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।” কার্যত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে ‘নব্য’ তৃণমূলের নেতা ঋতব্রতর বক্তব্য, “সংগঠনে শুধু সং আছে, কোনও গঠন নেই। আর কাজের দায়িত্ব ভাগ করতে কিছু পদ তৈরি হলেও তৃণমূল পরিষদীয় দলে কোনও নেতা নেই। পুরোটাই একটা টিমগেম।” তেমনি সন্দীপন সাহার বক্তব্য, “পরিষদীয় দলের সঙ্গে অভিষেকের দূর-দূরান্তের কোনও সম্পর্ক নেই। তা সত্ত্বেও তাঁর এই মাতব্বরি কেউ মানছি না।” দলের দীর্ঘদিনের সঙ্গী অথচ গত পাঁচ বছর ধরে বিধানসভায় একদিনও কিছু বলার সুযোগ না পাওয়া কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা জানান, “যে নেতা-কর্মীরা রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে তৃণমূলকে ক্ষমতায় এনেছিল তাদেরই কোনও দাম ছিল না দলে। অভিষেক স্নেহে অন্ধ হয়ে দিদিও ব্রাত্য করেছিলেন তাঁদের। এই অন্ধ স্নেহ দলের ক্ষতি করছে জেনেও প্রশ্রয় দিয়েছেন কেন তা জানি না। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি পুর্ণ আস্থা জানিয়ে বলি আপনি আমাদের পথপ্রদর্শক থাকুন, কিন্তু স্নেহে অন্ধ হয়ে ভাবনা বন্ধ করুন। অন্তত ভাবা প্র্যাকটিস করুন।”
একইসঙ্গে অভিষেকের উদ্যোগে রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের জন্য যে সই জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে তা সংসদে তুলে ধরে লোকসভা স্পিকার তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন এই আবেদনও জানাতে পারে “নব্য” তৃণমূল। একই দাবিতে আসন্ন বিধানসভা অধিবেশনে সোচ্চার হতে পারে বিজেপি পরিষদীয় দলও। ফলে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে অভিষেককে কোণঠাসা করে তৃণমূলনেত্রীকেও বিশেষ বার্তা দিতে চায় ‘নব্য’ তৃণমূল। আর এক ঢিলে অনেক পাখি মেরে রাজ্যে প্রধান বিরোধী শক্তিকে দুরমুশ করার সুযোগ হাতছাড়া করেনি বিজেপি। তবে বাংলার সেই প্রবাদটা এখানে বড়ই মানানসই। সাপ মরবে অথচ লাঠি ভাঙবে না। প্রতিবাদ এসেছিল তৃণমূল থেকেই। অভিযোগ এসেছিল তৃণমূল থেকেই। আইনগতভাবে তৃণমূল বিধায়করা সমর্থনের চিঠি জমা দেয়। আইনগতভাবেই তারাই এখন প্রধান বিরোধী দল। ১৯৯৮ সালের পর ২০২৬-এর এসে আবার এক তৃণমূলের জন্ম হল। সর্বহারা হয়ে রইলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর অন্তর্যামী শুভেন্দু অধিকারী মেঘের আড়াল থেকে হাসলেন।






