সম্পাদকীয়

নাগরিকদের আজ দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে অভিযুক্তের মতো

জমির কাগজ ঠিক হবে, ক্ষতিপূরণ মিলবে, চাকরির তালিকায় নাম উঠবে।

সন্তোষ সেন: ভোরের আলো ঠিকমতো ফুটে ওঠার আগেই বাসস্ট্যান্ডে ভিড় জমতে শুরু করেছে। কারও হাতে নথির ফাইল, কারও হাতে পুরনো আবেদনপত্র, কারও চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ। আজ এসআইআর-এর শুনানি। আজ নাকি সব সমস্যার সমাধান হবে। জমির কাগজ ঠিক হবে, ক্ষতিপূরণ মিলবে, চাকরির তালিকায় নাম উঠবে। অন্তত অভিযোগটা শোনা হবে। হরেন মণ্ডল ভিড়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে। তিনবার এসেছেন, আজ চতুর্থবার। প্রতিবারই কিছু না কিছু কাগজ ‘অসম্পূর্ণ’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোন কাগজ? কে বলবে? নোটিশে লেখা থাকে— ‘প্রয়োজনীয় নথিপত্র সহ উপস্থিত হবেন।’ প্রয়োজনীয় বলতে ঠিক কোনটা, সেটা যেন এক রহস্য। শুনানির ঘরের বাইরে লম্বা লাইন। মাঝে মাঝে একজন করে ঢুকছে, বেশিরভাগই বেরিয়ে আসছে নত মাথায়। কারও চোখে জল, কারও মুখে চাপা ক্ষোভ। ভিড়ের মাঝে এক রোগা প্যাংলা লোক হলুদ দাঁত বের করে ফিসফিস করে বলে— ‘আজ স্যর খুব ব্যস্ত। আপনার পক্ষে বারবার আসা সম্ভব নয়। একটু বুঝে দিলে আজই কাজ হয়ে যাবে।’

হরেন কথাটা শুনেও না শোনার ভান করে। তার মতো মানুষদের কাছে ‘বুঝে দেওয়া’ মানে মাসের বাজার উধাও হয়ে যাওয়া।ভেতরে ঢোকার সময় ঘড়িতে তখন দুপুর। এসআইআর উঁচু চেয়ারে বসে, টেবিল জুড়ে ফাইলের পাহাড়। চোখ ওঠে না, শুধু প্রশ্নবাণ ছুটে আসে— ‘আগে কেন আসেননি?’ এই কাগজটা কোথায়?’ ‘আপনি নিয়ম জানেন না?’ উত্তর দিতে গিয়ে হরেনের গলা জড়িয়ে যায়। সে জানে না কোন নিয়মের কথা বলা হচ্ছে। নিয়মগুলো যেন কেবল কাগজে লেখা। মানুষের জীবনে নয়। এসআইআর-এর কলম থামে না, কিন্তু মানুষের কথা শোনার সময় নেই। বাইরে অপেক্ষা করা নারীটি আরও অসহায়। তার স্বামীর মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ আটকে আছে তিন বছর। প্রতিবার শুনানিতে এসে নতুন নতুন কাগজের তালিকা হাতে পায়। আজও পেল। তার চোখে প্রশ্ন— এই কাগজগুলো কি তার স্বামী বেঁচে থাকতে জোগাড় করে যাওয়ার কথা ছিল?শুনানির দিন মানেই প্রশাসনিক ভবনের সামনে ভোর থেকে মানুষের সারি। এরা কেউ অপরাধী নয়, কেউ রাষ্ট্রদ্রোহী নয়। এরা দেশের নাগরিক। নাগরিকদেরই দাঁড় করিয়ে রাখা হয় অভিযুক্তের মতো, যেন রাষ্ট্রের কাছে কিছু চাইবার অধিকারটাই এক অপরাধ।

কিছুটা টোটো, কিছুটা ছেলের পিঠে চেপে এসেছেন ধনঞ্জয় দাস। ভিড়ের এক কোণে বসে আছেন সত্তর ছুঁইছুঁই ধনঞ্জয়বাবু। হাঁটতে পারেন না। হাঁটু ফুলে আছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবু তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছে সশরীরে উপস্থিত থাকার জন্য। ছেলের কাছে শুনেছেন, না গেলে ফাইল ‘ক্লোজ’ হয়ে যাবে। রাষ্ট্রের কাছে বয়স, অসুস্থতা, শারীরিক অক্ষমতা, কিছুই গ্রহণযোগ্য অজুহাত নয়। শুনানির ঘর থেকে এসআইআর-এর শীতল, কর্তৃত্বপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ না হওয়া এক ভাষা ভেসে আসে— ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ আপন মনে বলে  ‘যত্তসব হাড় হাভাতের দল’। এই প্রশ্নগুলোর কোনওটাই সমস্যার সমাধানের জন্য নয়। এগুলো শাসনের প্রশ্ন, দমন করার প্রশ্ন। যেন নাগরিক নিজেই দোষী। দরিদ্র হওয়ার দোষে, অসুস্থ হওয়ার দোষে, বেঁচে থাকার দোষে। বৃদ্ধা কমলা দাসী মেঝেতে বসে পড়েছেন। রোদে মাথা ঘুরছে। জল নেই, বসার চেয়ার নেই। নিরাপত্তারক্ষী বলে উঠলেন, ‘লাইন ভাঙবেন না। নিয়ম মানতে হবে।’ নিয়ম এখানে মানুষের শরীরের ওপর চড়ে বসা এক অমানবিক যন্ত্র। অসুস্থতা এখানে বিশৃঙ্খলা।

Related Articles