স্মরণে: উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়,বাংলা ভাষায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভ্রমণ সাহিত্যিক
Umaprasad Mukhopadhyay was one of the greatest travel writers in Bengali language

Truth of Bengal, রাজু পারাল: বাংলা ভাষায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভ্রমণ সাহিত্যিক ছিলেন উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। একজন অক্লান্ত পরিব্রাজক রূপেও তিনি সকলের কাছে পরিচিত। বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষের তৃতীয় পুত্র উমাপ্রসাদ জন্ম নেন সেকালের ৭৭ নং রসা রোডের (বর্তমান আশুতোষ মুখার্জী রোড) বাড়িতে যোগমায়া দেবীর কোল আলো করে। বিজয়া দশমীর দিনে জন্ম হওয়ায় তাঁর ডাকনাম রাখা হয় ‘বিজু’ আর জগজ্জননী উমার প্রসাদে জন্ম, তাই নামকরণ ‘উমাপ্রসাদ’।
শৈশব থেকেই কৃষ্ণনগরের (মামার বাড়ি) পটুয়াদের বিস্ময়কর জগৎ, ঘোড়ায় টানা গাড়ি, পালকি, রাতে শিয়াল ডাকা, বাড়ির বিশাল লাইব্রেরির আনাচে কানাচে ঘোরা… ইত্যাদি তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। মা যোগমায়া দেবীর স্নেহ-ভালভাসাও তাঁকে দেয় এক অনন্য মাত্রা। ছোট থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। হাতের লেখাটিও ছিল যেমন সুন্দর তেমন পরিচ্ছন্ন। শোনা যায়, তিনি হাঁসের পালকের কলমে লিখতেন।
৬বছর বয়স পর্যন্ত তিনি গৃহশিক্ষক প্রিয়নাথ বসুর কাছে পড়তেন ‘বর্ণ পরিচয়’ আর প্যারিচরণ সরকারের ‘ফার্স্ট বুক’। পরে আর এক শিক্ষক মহেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের কাছেও পড়াশোনা করেন। ঘরে পড়ার দিনগুলি শেষ হলে উমাপ্রসাদ ভর্তি হন ভবানীপুরের ‘মিত্র ইনস্টিটিউশনে’। এখানে প্রধান শিক্ষক সতীশচন্দ্র বসু ও অন্যান্য সহকারি শিক্ষক হরিদাস কর, পণ্ডিত হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন, হর্ষ নাথ বন্দোপাধ্যায়, আশুতোষ ঘোষপ্রমুখেরসংস্পর্শে এসে পরবর্তী জীবনের রসদ সংগ্রহ করে নেন উমাপ্রসাদ।
১৯১৯ সালে এই শিক্ষায়তন থেকেই এন্ট্রান্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে একাধিক বিষয়ে বৃত্তি ও পদক পান তিনি। ১৯২১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকেআইএ পরীক্ষায় প্রথম এবং ১৯২৩ সালে এই কলেজ থেকেই ইংরেজিতে অনার্স সহ বিএপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিবিধ স্মারক ও বৃত্তি লাভ করেন উমাপ্রসাদ। পরে এমএপাশ করেন ‘চারুকলা ও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস’ নিয়ে। ‘আইন’ পাশ করে কিছুদিন হাইকোর্টে প্র্যাকটিসও করেন তিনি।
১৯৩০ সালে আলিপুর কোর্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যবহারজীবী হিসেবে সফল হলেও সেই পেশা শেষপর্যন্ত তাঁর ভাল লাগেনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজে প্রায় পনেরো বছর অধ্যাপনা করার পর সেখানেও ইস্তফা দেন উমাপ্রসাদ। পরিবারিক উদ্যোগে নিজের বাড়ি থেকে একসময় ‘বঙ্গবাণী’ মাসিক পত্রিকার প্রকাশ হতে শুরু হলে উমাপ্রসাদ তাতে অংশ গ্রহণ করেন। সেই সূত্রে পরিচয় হয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
শরৎচন্দ্রের লেখা ‘পথের দাবী’ ধারাবাহিক ভাবে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ছাপার পর উমাপ্রসাদ প্রকাশক হয়ে উপন্যাসটিকে বই হিসেবে প্রকাশ করার আগ্রহ দেখান। শরৎচন্দ্র সেই সময় স্ববিস্ময়ে বলেন, “তুমি! সে কী করে হয়?…ছাপিয়ে যদি জেল হয় তোমার?” উমাপ্রসাদ হেসে বলেন, ‘জেল যদি হয় প্রকাশক ও লেখক দু’জনেরই হবে, আপনার সঙ্গে থাকা, সে তো মহা ভাগ্যের কথা।’নানা যুক্তি-তক্কের শেষে উমাপ্রসাদই মনস্থির করেন ‘পথের দাবী’ ছাপবেন।
শেষপর্যন্ত ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় পুস্তকাকারে প্রকাশ পায় ‘পথের দাবী’ উপন্যাস। এসকেলাহিড়ীর কটন প্রেস থেকে উপন্যাসটি ছাপার তারিখ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ ( ইংরেজি ১৯২৬)। রাখ-ঢাক না করে বইটির ব্যাপক প্রচার হয়েছিল। সে রাতে শরৎচন্দ্র উমাপ্রসাদের ভবানীপুরের বাড়িতে রাত্রিযাপন করেন। পরে ব্রিটিশ সরকার ‘পথের দাবী ‘ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে প্রকাশক ও লেখকের কোনও শাস্তিবিধান হয়নি।
অনেক পরে ফজলুল হক সাহেবের মন্ত্রিসভার আমলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হলে বইটির তৃতীয় সংস্করণ (১৩৫৪) প্রকাশিত হয়। ওই সংস্করণে প্রচ্ছদপটে ও ভেতরে দু’খানি ছবি এঁকে দেন নন্দলাল বসু। উমাপ্রসাদ তাঁর জীবনকালে বহু স্বনামধন্য ব্যক্তির সংস্পর্শে আসেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনহলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি মধুসূদন দত্ত, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, দিলীপ কুমার রায়, নলিনীকান্ত সরকার, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ।
বাল্যকাল থেকেই উমাপ্রসাদের ভ্রমণের নেশা পেয়ে বসে। বয়স যত বাড়তে থাকে, তাঁর জীবনও হয়ে ওঠে ততই ভ্রাম্যমান। উমাপ্রসাদ প্রথমবার বিদেশ ভ্রমণে যান মায়ানমারে। যৌবনের প্রারম্ভে মা যোগমায়া দেবীকে নিয়ে তিনি প্রথম হিমালয় দর্শনে যান ১৯২৮ সালে। তারপর থেকে অকৃতদার এই পরিব্রাজক দীর্ঘদিন হিমালয়ের পথে পথে ঘুরেছেন পরনে গেরুয়া ফতুয়া, লুঙ্গি আর কাঁধে ঝোলা নিয়ে।
পরিব্রাজক জীবনের প্রথমে হিমালয় ছিল তাঁর প্রাণ। সত্তর বছর ধরে বার বার হিমালয়ে গিয়েছেন, অচেনা অজানা পথের সন্ধান করেছেন, বহু ভ্রমণ বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছেন। পরে ঘুরে বেড়িয়েছেন গহীন জঙ্গলে, রুক্ষ মরুভূমিতে, নৌকার যাত্রী হয়ে। নিজের দেখা, নিজের বিষয়কে নিয়ে সহজ ভাষায় লেখা তাঁর বইগুলি বিশিষ্ট সাহিত্য হয়ে উঠেছে পরবর্তীকালে। হিমালয় ও ভারতের বিভিন্ন গিরিপথ ও গিরিশৃঙ্গ বিষয়ে অনেক বই তিনি লিখেছেন।
যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিমালয়ের পথে পথে, ত্রিলোকনাথের পথে, কৈলাশ ও মানস সরোবর,শেরপাদের দেশে, কুয়ারী গিরিপথেইত্যাদি। তবে উমাপ্রসাদের লেখা প্রথম বই ‘গঙ্গাবতরণ’ যা ১৯৫৫ সালে প্রকাশ পায়। এর পরেও তিনি অনেক বই রচনা করেছিলেন।
যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পঞ্চকেদার, পালামৌর জঙ্গলে, তপোভূমি মায়াবতী, কাবেরী কাহিনী,বৈষ্ণোদেবী ও অন্যান্য কাহিনী, মণি মহেশ, দুই দিগন্ত, কৈলাশ ও মানস সরোবর, শরৎচন্দ্র প্রসঙ্গ, শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরি ও মৃত্যু প্রসঙ্গ (সম্পাদনা), ধেয়ানে আলোকরেখা, ক্যালাইডস্কোপইত্যাদি। ভ্রমণ পিয়াসী উমাপ্রসাদ ঘরকুনো বাঙালিকে ঘরের বাইরে টেনে এনেছেন তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে।
তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও উমাপ্রসাদ বলেছেন, ‘নির্জন গৃহকোণে একান্তে বসেও উপভোগ করি আজ সেই গোপন পথের গভীর আনন্দ।’ অকৃতদার এই মহৎ মানুষটিবার্ধক্যজনিত কারণে ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে চিকিৎসার জন্যে রামকৃষ্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেও শেষরক্ষা হয়নি।
১৯৯৭ সালের ১২ অক্টোবর বিজয়া দশমীর দিনেপ্রয়াতহন। কেওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তাঁর মৃত্যুতে একটি বিশেষ যুগের অবসান হয়। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর অন্তিম ইচ্ছার কথা বলেছিলেন, তাঁর মরদেহ যেন ফুল দিয়ে সাজানো না হয় এবং তাঁর শ্রাদ্ধাদি যেন না করা হয়। বলাবাহুল্য, তাঁর এই ইচ্ছে সামাজিক কারণে পূরণ করা হয়নি।


