Folk Theatre: মানভূম-পুরুলিয়ার প্রাচীন লোকসংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে আয়োজিত হল তিন দিনের বিশেষ কর্মশালা।
নয়ন কুইরী, পুরুলিয়া: মানভূম তথা পুরুলিয়া জেলায় লোকনাট্য তথা যাত্রাপালা আগের গরিমা হারিয়েছে। আগেকার দিনে গ্রামগঞ্জে লোকশিল্পীরা নানা রকমের লোকনাট্য, যাত্রা ও নানান লোকসংস্কৃতি পরিবেশন করতেন (Folk Theatre)। অনেক শিল্পী যাত্রা পালা করতেন। হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো গ্রামীণ লোকনাটক দেখতে। দুর্গাপুজো, কালীপুজোর আগে বিভিন্ন যাত্রাপালার অভিনয়ের মহড়া চলত। পুজোর কয়েক মাস আগে থেকে যাত্রাপালার অভিনয়ের জন্য শিল্পীরা নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতেন।
প্রতিদিন নিজেদের নির্দিষ্ট সময় মতো তারা যাত্রাপালার মহড়া দিতেন। তারপর একটা যাত্রাপালা পরিবেশন করতেন। আর এই যাত্রাপালা থেকে শুরু করে লোকনাট্য ও লোকনাটকের মধ্য দিয়ে সামাজিক পরিবর্তন আনতেন সমাজে। মানুষ যাত্রাপালা দেখার জন্য এক বুক আবেগ নিয়ে অপেক্ষা করতেন কবে পরিবেশিত হবে যাত্রা, কবে নাটক পরিবেশন হবে। সেই সময় পাড়ায় পাড়ায় নাটকের দল গড়ে উঠেছিল। গ্রামে ছিল যাত্রার দল। গ্রামের যুবক যুবতীরা সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে পরিবেশন করতেন বিভিন্ন নাটক, যাত্রা। লোকশিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এই লোকসংস্কৃতির।
আজ থেকে দশ বছর আগেও পাড়ার ৮ থেকে ৮০ সব বয়সী মানুষ লোকনাট্য ও যাত্রাপালা (Folk Theatre) দেখার জন্য এক বুক আবেগ নিয়ে দিন গুনতেন। আর তাতেই সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব এসে পড়ত সামাজিক জীবনে। স্মার্টফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে এত মাতামাতি ছিল না গ্রামীণ এলাকায়। গ্রামীণ খেলাধুলা, গ্রামীণ সংস্কৃতি মানুষকে আবদ্ধ রেখেছিল। নতুন প্রজন্মকে মোবাইল তখনও গ্রাস করেনি এতটা। সোশ্যাল মিডিয়া কী সেটা মানুষের অজানা ছিল।
একে অপরের সাথে মেলবন্ধন তৈরি হতো এই যাত্রার নতুন নাটকের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সে সব এখন অতীত। পুরুলিয়াতে এই লোকসংস্কৃতি এখন হারিয়ে যাওয়ার মুখে। আগে পুরুলিয়া জেলার প্রত্যেকটা গ্রাম অঞ্চলেই সারা বছর ধরেই লেগে থাকত বিভিন্ন লোকনাট্য। নাটকের মাধ্যমে গ্রামের বাসিন্দাদের সচেতন বার্তা যেমন দেওয়া হতো একইভাবে ঠিক যাত্রাপালার মাধ্যমে সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হতো। ছিল না কোন এআই, ছিল না কোন এডিটিং, শুধুমাত্র বাস্তবতা তুলে ধরা হতো নাটকের মাধ্যমে। কিন্তু আজ সেই পুরুলিয়া জেলাতে মানভূমের লোকনাট্য ও নাটক, যাত্রা পালা এখন হারিয়ে যাওয়ার মুখে। লোকশিল্পী থাকলেও পরিবেশন হচ্ছে না লোকনাট্য ও যাত্রাপালা।
মানভূমের ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য-যাত্রাপালা (Folk Theatre) যাতে হারিয়ে না যায়, হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি পুনরুদ্ধোর করার লক্ষ্যে শিল্পীদের মনকে আরও উৎসাহী করে তুলতে শুরু হয়েছে একাধিক উদ্যোগ। আবার পুরুলিয়া জেলাতে লোকনাট্য, যাত্রাপালাকে নিয়ে আসতে পুরুলিয়াতে আয়োজিত হল লোকনাট্য ও যাত্রা কর্মশালা। লোকনাট্য ও যাত্রাপালাকে বর্তমান প্রজন্মের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে আয়োজিত হল তিন দিনের বিশেষ কর্মশালা।
দীর্ঘদিন পরে অবশেষে স্বপ্ন পূরণ হল মানভূম কালচারাল আকাদেমির। লোকনাট্য ও যাত্রাপালাকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে আয়োজিত হল তিন দিনব্যাপী মানভূমের লোকনাট্য ও যাত্রা কর্মশালা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুরুলিয়া মানভূম কালচার একাদেমি আয়োজনে ও জেলা তথ্য ও সাংস্কৃতিক দফতরের ব্যবস্থাপনায় পুরুলিয়া জেলার রবীন্দ্রভবনে জেলার লোকনাট্য ও যাত্রাপালার শিল্পীদের নিয়ে আয়োজিত হল মানভূমের লোকনাট্য যাত্রা কর্মশালা। আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মশালার শুভ সূচনা করেন মানভূম কালচারাল আকাদেমির জেলা সভাপতি ও জেলা পরিষদের পূর্ত বিভাগের কর্মাধ্যক্ষ হংসেশ্বর মাহাত ও জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের আধিকারিকরা।
পুরুলিয়া মানভূম কালচারাল আকাদেমির চেয়ারম্যান হংশ্বেসর মাহাত জানান, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের একটা খুব আশা ছিল যে পুরুলিয়ার মানভূমের কালচারাল আকাদেমির পক্ষ থেকে জেলার লোকশিল্পীদের নিয়ে লোকনাট্য, যাত্রাপালার বিশেষ কর্মশালা করার। আমরা কর্মশালার সূচনা করলাম। মানভূমের তথা বর্তমান পুরুলিয়ার বিভিন্ন গ্রামে বিগত দিনে যে সকল লোকনাট্য ও লোকনাটক (Folk Theatre) ছিল যেমন সীতার বনবাস, তিলোত্তমার বনবাস, বিনাতার সংসার, কমলীকা বিনি, এরকম অজস্র নাটক ছিল যেগুলো গ্রামে গ্রামে অভিনীত হতো।
এরকম প্রচুর লোক ও নাট্য আগে গ্রামে পরিবেশন হতো এবং প্রচুর লোক ও নাটকের দল ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই লোক নাটকের দল এখন দেখা যায় না প্রায় শেষের মুখে। তখনকার দিনে এই লোক নাটকের মূল্য ছিল অসাধারণ। এই লোক ও নাটকের মধ্য দিয়ে গ্রামের মানুষের সমাজ শিক্ষার বিস্তার ঘটে। এবং এই নাটক দেখে গ্রামের মানুষরা তখন ভালো-মন্দ বুঝতে পারেন।
এই লোক-নাটকের মধ্য দিয়ে ভাল মন্দ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো তখনকার দিনে। কিন্তু এখন চর্চার অভাবে সমাজ শিক্ষার ব্যবস্থা থেকে গ্ৰাম ও শহরের মানুষজনরা বঞ্চিত হচ্ছে। তাই যাতে এই লোকনাট্য যাত্রা যাতে না হারিয়ে যায় তাই এই উদ্যোগ। মানুষের চেতনা জাগিয়ে তুলতে মানুষের কাছে শিক্ষা ব্যবস্থা পৌঁছে দিতে হবে। তাই আবার পুনরুজ্জ্বীত করতে আমরা আবার লোকো নাটহক-যাত্রাপালার ওপর বিশেষ কর্মশালা করছি। যাতে এখন নতুন নতুন শিল্পীরা নতুন দল করতে পারে আবার লোকনাটক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে তাই এই কর্মশালা।






