রোগী রেফার ও দালাল চক্রে জিরো টলারেন্স, ২৪ ঘণ্টা চালুর ঘোষণা শুভেন্দুর
সরাসরি জেলা হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজগুলির রোজনামচা তদারকি করবে রাজ্য সরকার
Truth of Bengal: রাজ্যের চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়ন, দালাল চক্রের দাপট বন্ধ এবং মুমূর্ষু রোগীদের বিনা কারণে ‘রেফার’ করার মানসিকতা রুখতে এবার ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এই সমস্ত প্রক্রিয়ার ওপর কড়া নজরদারি চালাতে স্বাস্থ্য ভবনে একটি অত্যাধুনিক ও স্থায়ী কন্ট্রোল রুম চালু করার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সম্পূর্ণ পেশাদার কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত এই কন্ট্রোল রুমটি ২৪ ঘণ্টাই সক্রিয় থাকবে, যার মাধ্যমে সরাসরি জেলা হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজগুলির রোজনামচা তদারকি করবে রাজ্য সরকার।
নবান্নে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, সরকারি হাসপাতালগুলির ভেতরের পরিস্থিতি কেমন তা এই কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। হাসপাতালে দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে কি না, চিকিৎসকেরা সঠিক সময়ে ডিউটি করছেন কি না, রোগীরা যথাযথ পরিষেবা পাচ্ছেন কি না, এমনকি হাসপাতাল চত্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রয়েছে কি না বা সেখানে কুকুর-বেড়ালের উপদ্রব রয়েছে কি না— সবটাই ধরা পড়বে এই নজরদারিতে। রাজ্যে বেআইনি রেফার পুরোপুরি বন্ধ করতে সরকার কতটা কঠোর, তা বোঝাতে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সম্প্রতি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে এক মুমূর্ষু রোগীকে রেফার করার অপরাধে সেখানকার এমএসভিপি (MSVP)-কে ইতিমধ্যেই সাসপেন্ড বা সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকেও এই ধরণের দালাল চক্র বা রেফার সংক্রান্ত কোনও অভিযোগ থাকলে তা সরাসরি প্রশাসনকে জানানোর আর্জি জানিয়েছেন তিনি।
সরকারি হাসপাতালগুলির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে এক অভিনব ও যুগান্তকারী সমন্বয় ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বিগত দিনে যে সমস্ত বেসরকারি হাসপাতাল রাজ্য সরকারের কাছ থেকে মাত্র ‘এক টাকায়’ জমি লিজ বা কিনে নিয়েছে, এবার তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে বেড না থাকলে বা অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে, সেখান থেকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া রোগীদের ওই সব বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে। এই ধরণের রেফারের জন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড নির্দিষ্ট রাখতে হবে এবং সরকারি খরচে ওই রোগীদের সম্পূর্ণ পরিষেবা দিতে তারা বাধ্য থাকবে।
রাজ্যে কার্যকর হচ্ছে ‘আয়ুষ্মান ভারত’, নাম বদলে হচ্ছে ‘আয়ুষ্মান মন্দির’ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রকল্প নিয়ে রাজ্যের চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, চলতি বছর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে পুর্ণাঙ্গভাবে কেন্দ্রীয় প্রকল্প ন্যাশনাল হেলথ মিশন (NHM) এবং আয়ুষ্মান ভারত কার্যকর হতে চলেছে।ন্যাশনাল হেলথ মিশনের আওতায় পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভারত সরকার ২,১০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যার মধ্যে ৫২৭ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই রাজ্যের তহবিলে চলে এসেছে। এর পাশাপাশি আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের জন্য এই বছর রাজ্য আরও ৯৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। রাজ্যের প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ পরিবারের মোট ৬ কোটিরও বেশি মানুষকে এই আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে। এই কার্ডের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকেরা শুধু রাজ্যেই নয়, সমগ্র ভারতের যে কোনও তালিকাভুক্ত হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে ভিন রাজ্যে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত লাভদায়ক হবে। কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা মেনে এবার রাজ্যের উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলির নাম বদলে করা হচ্ছে ‘আয়ুষ্মান মন্দির’। সাধারণ মানুষকে কম দামে গুণগত মানের ওষুধ জোগাতে রাজ্য জুড়ে আরও ৪৬৭টি প্রধানমন্ত্রী জনওষুধি কেন্দ্র চালু করা হতে চলেছে।
চার জেলায় নতুন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ রাজ্যের চিকিৎসা পরিকাঠামোকে সুষম রূপ দিতে আরও একটি বড় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গের যে চারটি জেলায় এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি মেডিক্যাল কলেজ নেই— অর্থাৎ আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং পশ্চিম বর্ধমান— এই চার জেলাতেই নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করবে রাজ্য সরকার। প্রান্তিক এলাকার কোনও নাগরিক যাতে উন্নত চিকিৎসা ও ডাক্তারি পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তার জন্যই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এইগুচ্ছ ঘোষণা রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার খোলনলচে বদলে দেবে বলে আশাবাদী ওয়াকিবহাল মহল।



