Bengal Business Council: চাঁদের হাট নিউটাউনে! বাঙালি উদ্যোগপতিদের মহামঞ্চে শিল্পে নতুন স্বপ্ন
বাঙালি বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ছোট উদ্যোগপতিদের বোঝাপড়া বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন সংস্থার চেয়ারম্যান অভিষেক আড্ডি
Truth of Bengal: অনেকদিন ধরেই একটা ধরা-বাঁধা কথা ঘুরে বেড়ায়— “বাঙালি শুধু চাকরি করে, ব্যবসা নয়।” কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে বাঙালির মনের ভাষাও। চাকরির নিরাপদ ঘেরাটোপ পেরিয়ে আজকের বাঙালি চোখ রাখছে উদ্ভাবনের দিগন্তে, হাতে তুলে নিচ্ছে ঝুঁকি আর সাহসের পতাকা। কফির টেবিল থেকে কনভেনশন সেন্টারে, ছোট দোকান থেকে স্টার্টআপে— চারপাশে যেন শোনা যাচ্ছে একটাই গর্জন: “এবার বাঙালির ব্যবসা করার পালা!” আর সেই গর্জনকে এক সুসংহত প্ল্যাটফর্মে রূপ দিয়ে চলেছে একটি স্বপ্নময় সংস্থা— বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিল। ব্যবসায়িক ঐতিহ্যকে আধুনিক উদ্যোগে পরিণত করার যে মহাযাত্রা, তারই সাক্ষী রইল নিউটাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এই অনন্য সম্মেলন।

বলা হয়, বাঙালি নাকি ব্যবসায় বিমুখ। তবে কথাটি যে পুরোপুরি সত্যি নয় তার প্রমাণ অনেক আছে। বাঙালির ব্যবসায় অনেক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক আছে। আবার প্রাচীনকালে বাংলায় বাণিজ্য বেশ সমৃদ্ধ ছিল। বাঙালি বণিকরা দূরদূরান্তে ব্যবসা করতে যেতেন। মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে চাঁদ সওদাগর, ধনপতি সওদাগরের মতো বণিকদের কথা পাওয়া যায়। বর্তমানে সময়ে বহু বাঙালি উদ্যোগপতি নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করছেন। ঐতিহ্যবাহী ব্যবসার পাশাপাশি আধুনিক ব্যবসাতেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছেন। বাংলার শিল্পক্ষেত্রে নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন প্রখ্যাত বাঙালি দার্শনিক, কবি, রসায়নবিদ ও শিল্পপতি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।

তাঁর দেখানো পথে আজকের বাঙালি শিল্পোদ্যোগীরা এগিয়ে চলেছেন। বাঙালির ব্যবসায় অগ্রগামী এই ভাবনা সার্থক করতে চায় বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিল। গত রবিবার বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিলের বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে নিউটাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে বসেছিল চাঁদের হাট। বাঙালি বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ছোট উদ্যোগপতিদের বোঝাপড়া বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন সংস্থার চেয়ারম্যান অভিষেক আড্ডি, ভাইস প্রেসিডেন্ট সুব্রত দত্ত এবং সাধারণ সম্পাদক শুভাশিস দত্ত -সহ বিশিষ্ট জনেরা। বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিলের বার্ষিক সম্মেলন ও ভিশন কনক্লেভ ২০২৫-এ হাজির ছিলেন মুখ্য পৃষ্ঠপোষক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার (Bengal Business Council)।

বাঙালির রক্তে ব্যবসা নেই’— এই প্রথাগত প্রবাদ বাক্য থেকে বাঙালি এখন অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে। উন্নত-আধুনিক প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে কেউ মেধাকে পুঁজি করে,কেউ উদ্ভাবনী শক্তির সাহায্যে বাঙালি ব্যবসায়ীরা নতুন সামাজ্য গড়ছে।ইউরোপে যেভাবে একসময় গিল্ড তৈরি করে বাণিজ্য বিস্তার করা হয়,সেভাবেই বাংলায় সহযোগিতামূলক ভাবনা থেকে একুশে পথ চলা শুরু করে বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিল। বাঙালি ব্যবসায়ীদের একছাতার তলায় আনার পাশাপাশি উদ্যোগীদের মেলবন্ধনের মহাকৌশল নিয়ে আলোড়ন ফেলেছে বাণিজ্যবন্ধু সংস্থা।ভুবনায়নও মুক্ত বাণিজ্যের যুগে ব্যবসায়িক সহযোগিতার লক্ষ্যে রবিবার নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজন করা হয় বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিলের বার্ষিক কনক্লেভ।

৪৫০-র বেশি লাইফ মেম্বার সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই ভিশন কনক্লেভে অংশ নেন। বঙ্গীয় বাণিজ্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শুভাশিস দত্ত বলেন, ‘‘বাঙালির ব্যবসায়িক প্রসারের জন্য দুর্গাপুর-সুন্দরবনের উদ্যোগীরাও এগিয়ে আসছেন। বেঙ্গালুরু-দিল্লির পাশাপাশি শিলিগুড়িতে একটা চ্যাপ্টার খুলবো। বাংলায় ফ্যামিলি বিজনেস যাঁরা করেন তাঁদের অনেকেই ব্যবসায় আসতে চাইছেন না। তাই পরবর্তী প্রজন্মকে শিল্পমুখী করার জন্য শিল্প-প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন করানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাঙালিদের ব্যবসার প্রতি টান বজায় রাখার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে (Bengal Business Council)।’’

বঙ্গীয় বাণিজ্য পরিষদের চেয়ারম্যান অভিষেক আড্ডি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট সুব্রত দত্ত এই মেগা অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ব্যাখা করেন। অভিষেক আড্ডি বলেন, ‘‘বাঙালি শিল্পপতিদের স্বপ্ন সার্থক করতে ৬টি অ্যাজেন্ডা নেওয়া হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে ইকো-সিস্টেম। আরও বেশি সংখ্যক বাঙালির স্টার্ট আপ ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে উত্সাহিত করা হচ্ছে। বঙ্গীয় বাণিজ্য পরিষদের সদস্যদের মধ্য ব্যবসায়িক ভাবনার আদান-প্রদান বাড়ানো, সহযোগিতামূলক পদ্ধতিতে ব্যবসায়িক প্রসার ঘটানো। বঙ্গীয় বাণিজ্য পরিষদ সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সেতুবন্ধন করছে। উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে বাঙালির স্বপ্নের উড়ান সার্থক করা হচ্ছে।’’ ভাইস প্রেসিডেন্ট সুব্রত দত্ত বলেন, ‘‘বঙ্গীয় বাণিজ্য পরিষদে যেটুকু সদস্যরা দেন, তার থেকে ১০ গুণ পান। বাঙালি ব্যবসা করার জন্য শক্তি পাচ্ছে। সার্থক হচ্ছে বাঙালিদের হাত ধরে বঙ্গে বাণিজ্য বসতে লক্ষ্মী-এই ভাবনা। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৪৫০ হলেও সংগঠনে যুক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে আরও হাজারের ওপর ব্যবসায়ী (Bengal Business Council)।’’

টেকনো ইন্ডিয়ার কো চেয়ারপার্সন মানসী রায়চৌধুরী বলেন, ‘‘অনেকে বলেন বাংলায় নাকি কিছু হয় না। এই ধারণা বদলে যাচ্ছে পুরোপুরি। নতুন করে বাংলাকে গড়ার জন্য প্রতিষ্ঠিতও নতুন ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে আসছে। যার ফলে শিল্পের প্রকৃত নবজাগরণ হচ্ছে।’’ বাংলার ব্যবসায় পুনরুত্থানের জন্য সমস্ত স্তরের উদ্যোগীদের একছাতার তলায় আনার আসার আহ্বান জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

সাধারণত, ভাবা হয় বাঙালিরা চাকরি নির্ভর। সেই ভাবনা ঝেড়ে ফেলে ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগে যাতে সব বাঙালি এগিয়ে আসেন তার জন্য আয়োজকরা আহ্বান জানান। শিল্প-প্রসারের এই মেগা অনুষ্ঠানে নতুন শিল্পপতিদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বক্তব্য রাখেন জর্জ টেলিগ্রাফের সুব্রত দত্ত থেকে শুরু করে মহেন্দ্র দত্ত অ্যান্ড সন্সের শুভাশিস দত্তের মতো অভিজ্ঞরা। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার ইউরোপের গিল্ডের মতো বাংলায় ব্যবসায়িক ভাবনার আদান-প্রদানে জোর দেন। এই মহতী অনুষ্ঠানে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয় ‘কুকমি’-র ম্যানেজিং ডিরেক্টর অতনু দত্তকে। তিনি বলেন, ‘‘অনেক লড়াই, অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে সেই প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যখন সাফল্য আসে, তখন ভীষণ আনন্দ লাগে।

১৯৯৩ সালে বেঙ্গালুরুতে এই ব্যবসা শুরু করেছিলাম। ৩০-৩৫ বছর হয়ে গেল ওখানে। তখন থেকেই চিন্তা করতাম বাংলায় কিছু করতে হবে। তাই কলকাতায় কথা মাথায় রেখে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই উদ্যোগ আমার ছেলে আরও এগিয়ে নিয়ে বলে যাবে আশা করি।’’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সোনার বাংলা হোটেল গ্রুপের অভিষেক পাল চৌধুরি, ইউনিরক্স সাইকেলের সুবীর ঘোষ, আদিত্য স্কুলের অনির্বাণ আদিত্য, চাওম্যান ও আওধ-এর দেবাদিত্য চৌধুরি এবং পিয়ারলেস হোটেলের তরফে দেবশ্রী রায়। বাঙালি ব্যবসায়ীদের সাফল্যের শিখর ছোঁয়ার জন্য এই অনন্য সংস্থা যেমন পাশে রয়েছে, তেমনই বিশ্বজুড়ে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ‘আর কবে? এবার হবে— বাঙালি ব্যবসায় অগ্রগামী’। এই স্লোগানকে সামনে রেখে একদিন বাঙালি ব্যবসায়ীরা শিল্পের শিখর ছোঁবেন বলে আশাপ্রকাশ করেন বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিল-এর কর্মকর্তারা (Bengal Business Council)।






