সম্পাদকীয়

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ের জন্য জনগণের দায়ও কম নয়

The people are not less responsible for the decline of the democratic system

Bangla Jago Desk, কাজল ব্যানার্জিঃ আমাদের প্রধান সমস্যা হল, আমরা ইস্যভিত্তিক ভাবে রাজনৈতিক বিষয়গুলিকে বিবেচনা না করে অগ্রিম বেছে নেওয়া নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে সেগুলির পক্ষে বা বিপক্ষে আমরা যুক্তি সাজাই এবং সওয়াল করে থাকি। অর্থাৎ, প্রথমেই আমরা আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্দিষ্ট করে ফেলি। তারপর দেখি রাজনৈতিক ইস্যুটি কারা নিয়েছে।

নিজের দলের নেওয়া পদক্ষেপ হলেসেটিকে ভাল বলে প্রতিপন্ন করতে নানাভাবে সেটিকে যুক্তিগ্রাহ্য করে তুলি। আর বিপক্ষ দলের হলে নানা যুক্তিতে সেটিকে ভুল প্রতিপন্ন করাই আমাদের মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে। একটি সরকারের কিছু পদক্ষেপ ভাল আবার কিছু পদক্ষেপ খারাপ থাকতেই পারে। কিন্তু আমরা তা বলি না। এমনকী নিজ সমর্থিত দলের অপছন্দের খবরগুলিকে আমাদের অবচেতন মন সবসময় এড়িয়ে যেতে চায়।

এর অর্থ হল যুক্তির ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিই না, সিদ্ধান্তের সমর্থনে যুক্তি সাজাই। অর্থাৎ, পক্ষপাতদুষ্টতা আমাদের মজ্জায়। সেখান থেকে বের হতে না পারার জন্যই আমাদের আজ এই হাল। এরফলেই কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। যদি কখনও ব্যতিক্রমীভাবে কেউ সবদলেরই ভালমন্দগুলির নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরতে থাকেন, তাহলে তাঁকেও হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।

এমনকী কোনও নিউজ চ্যানেল নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করতে থাকলে তাদের টিআরপি নীচে নামতে থাকে। মানুষ পছন্দ করেন সেই টিভি চ্যানেলটি যেটি তাঁর নিজ দলের স্তুতি করে। তাই ব্যবসায়িক স্বার্থে সংবাদমাধ্যম গুলিও সময়ভেদে বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকে। টিভিতে নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক না বসিয়ে, কয়েকটি দলের নেতাকে ধরে এনে বসানো হয়।

আর যেদলকে তর্কে জেতানো হবে, সেই দলের পক্ষে দক্ষ নেতা ও বিপক্ষ দলের পক্ষে অদক্ষ নেতাকে আমন্ত্রণ করে আনা হয়। আর রাজনৈতিক নেতারা তো কখনওই নিজেদের পদক্ষেপের বিপক্ষে কোনও কথা কোনও চ্যানেলে শুনতেই চান না। এমনকী দুটি বাইরের দেশের মধ্যে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা হলেও সেখানে ‘ভাল খেলাটা’কে সমর্থন না করে আমরা আগে একটি দেশের সমর্থক হয়ে যাই, তারপর সেই দলকে সমর্থন দিতে থাকি। এমনকী খেলা চলাকালীন নিজের পাড়ার বিপক্ষ দলের সমর্থকদের সঙ্গে গোলমালে জড়িয়ে পড়ি!

জনগণের মনোরাজ্যের মনোবিজ্ঞানগত এই সকল সমস্যাই কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে একেবারে শেষ করে দেয়!
আমরা প্রত্যেকেই জানি, গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভ।
১. প্রথম স্তম্ভ হল আইনসভা (বিধানসভা, লোকসভা, রাজ্যসভা যেখানে আইন রচিত হয়)
২. দ্বিতীয় স্তম্ভ হল বিচারব্যবস্থা (নিম্ন আদালত, উচ্চ আদালত, সর্বোচ্চ আদালত)
৩. তৃতীয় স্তম্ভ হল প্রশাসন (পুলিশ, আমলা, সরকারি কর্মচারী যারা এই আইনকে প্রয়োগ করবেন। আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন, মানুষকে নিরাপত্তা দেবেন। জেলার ডিএম থেকে এসপি, বিডিও দারোগা এই স্তম্ভের অংশ)
৪. চতুর্থ স্তম্ভ হলমিডিয়া, প্রেস, সংবাদ মাধ্যম।
এছাড়াও আজ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অদৃশ্য অথচ গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসাবে কাজ করেন পুঁজিপতিরা। যাঁদের আর্থিকবলে নিয়ন্ত্রিত হতেই পারে ওপরের সবকটি স্তম্ভ। তাই গণতান্ত্রিক কাঠামোয় পুঁজিপতিদের পঞ্চম স্তম্ভ বললে অত্যুক্তি করা হবে না বরং তাঁদের স্থান স্তম্ভের ওই ক্রমতালিকা আরও ওপরে কিনা তা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে।

এখন স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে, প্রথম স্তম্ভ দখল করে আছেন আমাদের নেতারা। যাঁদেরঅনেকেই নানা কেলেঙ্কারিতে যুক্ত।
দ্বিতীয় স্তম্ভও আজ অনেকটাই আক্রান্ত এবং দখলীকৃত হওয়ার পথে। সেখানের রাজনৈতিক শক্তি হাত বাড়াতে শুরু করেছে। কখনও কখনও বিচারপতিরাও নেতাদের বাধ্য ছাত্রের মতো তাঁদের নির্দেশ অনুযায়ী রায় দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠছে।

তৃতীয় স্তম্ভকে সবসময় চলতে হয় শাসকের অঙ্গুলিহেলনে। এই স্তম্ভের কোনও মেরুদণ্ড আছে বলে মনে হয় না। শাসকের দুর্নীতিতে সাহায্য করেআধিকারিকা‘প্রসাদ’ পেতে ভালবাসেন। বাকিগণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। আমাদের ‘চাহিদা’র দৈন্যতায় সেটিও আজ নিরপেক্ষতার পথ এড়িয়ে বাজার ধরার প্রতিযোগিতায় ধাবমান।

আমার ধারণা, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভটি যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শাসকের দ্বারা তার থেকেও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের পক্ষপাতদুষ্ট চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে। তাহলে এই যেখানে স্তম্ভগুলির অবস্থা, সেখানে ইমারত সুরক্ষিত থাকবে কী করে? তাই, কোনও একটা রাজনৈতিক পালাবদলে সব ঠিক হয়ে যাবে–এমনটা বিশ্বাস করি কীভাবে? রাজনীতিকে ও গণতন্ত্রকে তো শেষ করলাম আমরাই।