Sri Aurobindo: অগ্নিযুগের মহানায়ক শ্রী অরবিন্দ ঘোষ
১৯৪৭ সালের এই দিনটিতেই ভারতবর্ষ বিদেশি শাসনের হাত থেকে মুক্ত হয়।
রাজু পারাল:
‘‘ঐ মহামানব আসে,
দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে
মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে ।
সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ
নবলোকে বাজে জয়ডঙ্ক,
এল মহাজন্মের লগ্ন।’’
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাতৃভূমির শৃঙ্খলমোচনের জন্য শত সহস্র কত যে বিপ্লবী নির্ভীক চিত্তে আত্মবলিদান দিয়েছেন, তার সঠিক ইতিহাস অনুধাবন করা প্রায় অসম্ভব। তবে যে কয়েকজনের আত্মবলিদানে ভারত স্বাধীনতার সূর্য দেখেছিল, তাঁদের মধ্যে শ্রী অরবিন্দের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে পরম যোগী ও মহাবিপ্লবী শ্রীঅরবিন্দের (Sri Aurobindo) নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে আজও। প্রথম জীবনে যিনি ছিলেন মহান বিপ্লবী, সশস্ত্র পন্থায় যিনি ভারতের বুকে বিপ্লববাদের সূচনা করেছিলেন, পরবর্তীকালে তিনিই আবার হয়ে উঠেছিলেন অধ্যাত্মিক জগতের মধ্যমণি। বিশ্ব ব্যক্তিত্বের ইতিহাসে যা এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। আজও পণ্ডিচেরিতে গেলে মনে পড়ে যায় তাঁর স্থাপন করা বিশ্বজনীন মানবধর্মের সেই মহান কেন্দ্রের কথা। দেশ বিদেশের অগণিত মানুষ যেখানে আসেন। সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আর মনে মনে কল্পনা করে নেন সেই মহান ঋষির দিব্যকান্তি চেহারা।
[আরও পড়ুন: Horoscope: বৃহস্পতিতে ধৈর্যই সৌভাগ্যের চাবিকাঠি, পড়ুন আজকের রাশিফল]
১৫ আগস্ট আধুনিক ভারতের ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট দিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনটিতেই ভারতবর্ষ বিদেশি শাসনের হাত থেকে মুক্ত হয়। ভারতের মহাকাশে উদয় হয় নতুন সূর্যের। আবির্ভাব হয় কবি, দার্শনিক, চিন্তানায়ক, যোগীশ্রেষ্ঠ এক মহামানবের। তিনি শ্রী অরবিন্দ ঘোষ (Sri Aurobindo)। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি সমস্ত জীবনটা কাটিয়েছেন মানব কল্যাণের উদ্দেশ্যে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন তাঁকে বলেছিলেন ‘Prophet of Nationalism’।
অল্পবয়স থেকেই অরবিন্দ বাবা কৃষ্ণধন ঘোষ এবং মা স্বর্ণলতা দেবীর সংস্পর্শে থেকে একজন দেশপ্রেমিক হয়ে ওঠেন। বাড়িতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচলন ছিল। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বাতাবরণও ছিল। পিতা-মাতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে বাল্যকালে অরবিন্দ সে সব গুণগুলিই আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। সাত বছর বয়সে শিক্ষার জন্য অরবিন্দ বিলেতবাসী হন। তাঁর আগে তিনি কিছুদিন দার্জিলিং-এর ‘লরেটো’ স্কুলে পড়াশোনা করেন। একুশ বছর বয়স পর্যন্ত অরবিন্দ বাংলা ভাষার সংস্পর্শে আসেননি। বাবার ইচ্ছানুসারে আইসিএস পরীক্ষা দিলেও অশ্বচালনা পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকায় শেষপর্যন্ত মনোনীত হননি।
বিলেতে থাকাকালীন অরবিন্দের ভাব জগতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। বাবার লেখা চিঠি থেকে তিনি জানতে পারেন, পরাধীন ভারতের শাসনের ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকার অত্যন্ত হৃদয়হীন। বাবার পাঠানো দেশীয় সংবাদপত্র পড়ে বুঝতে পারেন ভারতে কীভাবে ইংরেজদের হাতে দেশীয় মানুষকে অপমানিত হতে হচ্ছে। এইসব পড়ে তাঁর মনে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জেগে ওঠে। মাতৃভূমি ভারতবর্ষের পরাধীনতার জ্বালা কবে অবসান হবে, সে সব চিন্তায় তিনি বিভোর হয়ে থাকতেন। হাতের কাছে পান বঙ্কিমচন্দ্র ও স্বামী বিবেকানন্দের লেখা বই। পড়লেন বইগুলি। একজনের লেখায় পেলেন অনুপ্রেরণা, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হলেন। অন্যজনের মাধ্যমে চিনলেন চিরন্তন ভারতাত্মাকে। স্বামীজির লেখা পড়ে তিনি বলতেন, ‘স্বামীজির ভাষায় প্রাণের সাড়া পাওয়া যায়, ভাষার, ভাবের এরূপ ঝঙ্কার, শক্তি ও তেজ অন্যত্র দুর্লভ।’
এই সময় মামা যোগেন্দ্রনাথ বসুর সংস্পর্শে থেকে শিখে নেন সাহিত্য এবং সংস্কৃতির নানাদিক। তেরো বছর বরোদার মহারাজার কাছে চাকরি করার পর অরবিন্দ কলকাতায় ফিরে আসেন ভগিনী নিবেদিতার ডাকে। সে সময়ে তিনি রাজনৈতিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন পূর্ণরূপে। বাংলার চরম জাতীয়তাবাদীদের সংগঠিত করলেন। বয়কট ও স্বদেশি আন্দোলনকে তিনি এক বিরাট জাতীয় আন্দোলনে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করলেন। শুরু করলেন জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
এই সময়ে কলকাতার যাদবপুরে ‘জাতীয় কলেজ’ স্থাপিত হলে অরবিন্দ তাতে যোগ দেন ‘অধ্যক্ষ’ হিসেবে। অধ্যক্ষ পদে যুক্ত থেকে তিনি নানা বক্তৃতায় জাতীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য ও আদর্শ প্রচার করতে লাগলেন। ‘জাতীয় কলেজে’ সে সময়ে শিক্ষকতার জন্য এগিয়ে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দ কুমারস্বামী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, বিনয়কুমার সরকার, রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়, সখারাম দেওস্কর প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি। কলকাতায় চরমপন্থীদের সংগঠিত করার প্রধান দ্বায়িত্ব নিলেন অরবিন্দ।
একই সময়ে বাংলায় গুপ্ত সমিতি তৈরি করার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলেন অরবিন্দ। এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন তাঁর ভাই বিপ্লবী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ। মুরারিপুকুরে বিপ্লবীদের গোপন বোমার আস্তানা নির্মাণ এবং মেদিনীপুরে বিপ্লবীদের গুপ্ত সমিতি তৈরি করাতেও অরবিন্দকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেছিলেন বারীন্দ্র কুমার। চন্দননগরে বিপ্লবী সমিতি গড়ার ব্যাপারেও অরবিন্দের পাশে ছিলেন বারীন্দ্র কুমার। তবে কেবলমাত্র গুপ্ত সমিতি গড়েই অরবিন্দ (Sri Aurobindo) থেমে থাকেননি।
বিপ্লবী দলের মুখপত্র ‘যুগান্তর’ ও ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকা’র মাধ্যমে পূর্ণ স্বাধীনতার আদর্শ, জন আন্দোলনের কর্মসূচি প্রচার করতে থাকেন। ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকা সম্পর্কে শ্রী অরবিন্দ বলেছিলেন, ‘দেশের এই সংকট মুহূর্তে দেশের একান্ত প্রয়োজন মেটাবার জন্যই এই পত্রিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। দেশবাসীর নিকট ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকা একটি নতুন পথের সন্ধান দিতে চায়…। কোনও বাধাই তাকে একাজ থেকে নিবৃত্ত করতে পারবে না।’ বলাবাহুল্য, এই দুটি পত্রিকা বাংলার সশস্ত্র সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করেছিল। ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকা’র লেখাগুলি সে সময়ে দেশবাসীকে সর্বতোভাবে স্বদেশিমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল। মাত্র দু’বছরে বাংলার সশস্ত্র সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন অরবিন্দ এবং বারীন্দ্র কুমার। বালগঙ্গাধর তিলক এবং ভগিনী নিবেদিতার অনুপ্রেরণায় অরবিন্দ যখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তখন তাঁর বয়স ৩০ কোঠায়।
ভারতের সর্বত্র ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকা যখন একটি জাতীয়তাবাদী পত্রিকা হিসেবে জনপ্রিয় হতে থাকল, সে সময়ে ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি পড়ল অরবিন্দের উপর। ১৯০৭ সালের আগস্ট মাসে তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগ আনা হল। কিন্তু তাঁকে অভিযুক্ত করার সমস্ত প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হল ব্রিটিশ সরকার। প্রমাণের অভাবে তাঁকে ছেড়ে দিতে হয়।
এরপরেই ঘটেছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯০৮ সাল। ঘটনাস্থল মুজফফরপুর। দুই তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী অত্যাচারী ইংরেজ শাসক কিংসফোর্ডকে বোমা ছুঁড়তে গিয়ে নিরপরাধ দুই মহিলাকে মেরে ফেলেন। অত্যন্ত তৎপর হয়ে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁদের খুঁজতে খুঁজতে সন্ধান পায় মানিকতলায় এক বোমা তৈরির কারখানা। অন্যান্যদের সঙ্গে গ্রেফতার হলেন অরবিন্দ। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লব ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে মামলা শুরু হল। ইতিহাসে এই মামলাই ‘মানিকতলা বোমা মামলা’ নামে পরিচিত।
[আরও পড়ুন: Haringhata Fish: বাজারে এল হরিণঘাটা ফিস ও গোল্ড ডিম]
এই মামলায় শ্রী অরবিন্দের (Sri Aurobindo) পক্ষ সমর্থন করেছিলেন তরুণ ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাস। সরকারী কৌঁসুলির যুক্তিজাল ছিন্ন করে চিত্তরঞ্জন প্রমাণ করলেন, এ পর্যন্ত রাজনীতি ক্ষেত্রে শ্রীঅরবিন্দ যা করেছেন, তা কোনমতেই বেআইনি নয়। দেশপ্রেম কোনও আইন অনুসারেই নিন্দনীয় হতে পারে না। চিত্তঞ্জনের প্রখর আইনজ্ঞানের কাছে ব্রিটিশ আইনজীবীরা ধরাশায়ী হলেন। অরবিন্দের ভাই বারীন ঘোষ ও আরও কয়েকজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সহ নানাবিধ কঠোর শাস্তি হলেও অরবিন্দ মুক্তি পেলেন। কারাগারে তিনি ছিলেন এক বছর। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যেই তাঁর মনে এক বিরাট পরিবর্তন আসে। যে অরবিন্দ জ্বলন্ত ধূমকেতুর মতো সহস্র যুবককে উদ্ভুদ্ধ করেছিলেন অপরাজেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, সেই তিনিই আবার আবির্ভূত হলেন অধ্যাত্মপুরুষ হিসেবে। শেষপর্যন্ত স্বেচ্ছায় তিনি ফরাসি অধিকৃত চন্দননগরে চলে যান এবং সেখান থেকে প্রায় দেড় মাস বাদে তিনি পণ্ডিচেরি পৌঁছন। প্রায় চল্লিশ বছর তিনি পণ্ডিচেরিতে সাধনায় মগ্ন থেকে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেছিলেন।
১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর পণ্ডিচেরিতেই তিরোধান হয় মহাযোগী শ্রীঅরবিন্দের। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এই মহাপুরুষকে অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখলেন, ‘অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহ নমস্কার/ হে বন্ধু, হে দেশবন্ধু, স্বদেশ আর তার বাণী মুক্তি তুমি।’





