সম্পাদকীয়

আকাশবাণী: ভুলে যাওয়া এক শতাব্দীপ্রাচীন বন্ধুর গল্প-কথা

তন্বী তরুণীর মত সেই রেডিও সেটে শুধু শুনতে পাওয়া যায় এফএম-এর অনুষ্ঠান। মাথায় একটা করে টিকি অর্থাৎ অ্যান্টেনা।

শান্তম চক্রবর্তী: মহালয়ার ভোর। সাড়ে তিনটের সময় ঘুম থেকে উঠে জনতা স্টোভে চা বসালেন মুখার্জি গিন্নি। আর কিছুক্ষণ পরেই গোটা বাড়ি জেগে উঠবে। বেজে উঠবে রেডিও। পুজো শুরু হয়ে যাবে মহিষাসুরমর্দিনীর সুরে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্তকণ্ঠে চণ্ডী পাঠের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়বে গোটা পাড়ায়।

কলকাতার ধর্মতলায় ফুটপাতে বড় ঝুড়িতে করে বিকোচ্ছে রেডিও। সোনালি রুপোলি রঙের সেইসব রেডিও একটু বিশেষ ধরনের। তন্বী তরুণীর মত সেই রেডিও সেটে শুধু শুনতে পাওয়া যায় এফএম-এর অনুষ্ঠান। মাথায় একটা করে টিকি অর্থাৎ অ্যান্টেনা। ৫০, ১০০ টাকায় হু হু করে বিক্রি হচ্ছে সেই রেডিও।

ওপরের দুটো ছবির মধ্যে ফারাক বিস্তর। সময়ের দূরত্ব, প্রজন্মের দূরত্ব। প্রথমটা হয়তো ৭০-৮০ দশকের ছবি, আর দ্বিতীয়টা নতুন সহস্রাব্দের শুরুর দিকের। একটা সময় ছিল যখন বাঙালির বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল রেডিও বা বেতার। টিভি তখনও ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েনি। তখন গোটা গ্রামের মধ্যে হয়তো একটা বর্ধিষ্ণু বাড়িতে রেডিও সেট থাকত। সবার ক্ষমতা ছিল না রেডিও কেনার। বিশাল ঢাউস একটা রেডিও সেট, তাও আবার বোতাম টেপা নয় – নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফ্রিকোয়েন্সি মিলিয়ে ধরতে হতো সেন্টার। গ্রামের সব মানুষ এসে জড়ো হত সেই বাড়িতে, রেডিওর অনুষ্ঠান শোনার জন্য। চাষীভাইদের জন্য, কৃষিকথার আসর – বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল সে সময় গ্রামের কৃষিজীবী মানুষের মধ্যে। তবে শহুরে মানুষের পছন্দ ছিল একটু আলাদা। সেখানেও অনেক দূরে দূরে একটা বাড়িতে হয়তো মিলত সেই ঢাউস ভালভ সেটের রেডিও। রবিবার দুপুরের নাটক, কিংবা অনুরোধের আসরের সময় দেখে পাড়ার গিন্নিদের ভিড় জমত সেই বাড়িতে। সবাই মিলে জমিয়ে বসে সেলাই করতে করতে অথবা উল বুনতে বুনতে রেডিওর আকাশে ডানা মেলে হারিয়ে যেতেন উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত বাড়ির গৃহবধূরা।

কর্তাদের পছন্দটা একটু অন্যরকম ছিল। শীতের রবিবার দুপুরের নাটক তাঁরা হয়তো জমিয়ে মাংস-ভাত খেয়ে উঠে শুনতেন, তবে ময়দানে ফুটবল ম্যাচ থাকলে আর অন্য কোনও দিকে কান দেওয়ার ফুরসত মিলত না বাড়ির কিশোর থেকে পরিণত বয়সী পুরুষদের। মোহন-ইস্ট ম্যাচের দিন সমবেত শ্রোতার ভিড়ে বাড়ির উঠোনটাই হয়ে উঠত ডার্বির ময়দান। কিংবা যদি ভারতের ক্রিকেট ম্যাচ থাকত শীতের ইডেন গার্ডেনসে। অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য, পুষ্পেন সরকার, প্রেমাংশু চ্যাটার্জিদের গলার উত্তেজনা শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ত শ্রোতাদের শরীরে। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে অনুভব করতেন মাঠের উত্তেজনা। খেলা ছাড়াও আরেকটা ইন্টারেস্ট ছিল বাড়ির কর্তাদের, সেটা হল সংবাদ বা খবর। হিন্দি তখন এতটা জনপ্রিয় ছিল না, বাংলা খবর ছাড়া মূলত ইংরেজিতে দিল্লির খবরটি শুনতেন তাঁরা। রোজ অফিস-কাছারি থেকে ফিরে হাত-পা ধুয়ে বৈঠকখানা অথবা দাওয়ায় বসে কান পেতে শুনতেন- ‘স্থানীয় সংবাদ পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়’…। ’৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল উপেন তরফদার-দেবদুলাল-প্রণবেশ ত্রয়ীর ‘সংবাদ বিচিত্রা’। মানুষ অনুভব করেছিল তাঁদের হাত ধরে নতুন বাংলাদেশকে।

আজ ২৬ আগস্ট, কলকাতা রেডিওর জন্মদিন। আকাশবাণী কলকাতা বা লোকমুখে রেডিও – তখন এতটাই জনপ্রিয় ছিল, স্বয়ং কোনও বিখ্যাত মানুষ বা ঘটনা সম্পর্কে যতক্ষণ না বেতারে কিছু জানানো হচ্ছে, ততক্ষণ বিশ্বাসই করত না কেউ। রাজনৈতিক চাপ ছিল, কিন্তু এখনকার মতো এত প্রকট হয়ে দেখা দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকারি মিডিয়ায়। পরাধীন ভারতে তখন ব্রিটিশ রাজ চলছে। ১৯২৩ সালের জুন মাসে বম্বে প্রেসিডেন্সি রেডিও ক্লাব এবং অন্যান্য রেডিও ক্লাবের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্প্রচার শুরু হয় এ দেশে। ১৯২৭ সালের ২৩ জুলাই একটি চুক্তি অনুসারে, বেসরকারি ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি লিমিটেড (আইবিসি) দুটি রেডিও স্টেশন পরিচালনার জন্য অনুমোদিত হয়। তার মধ্যে একটি মুম্বই স্টেশন, সম্প্রচার শুরু করে ২৩ জুলাই ১৯২৭ এবং কলকাতা স্টেশন, সম্প্রচার শুরু করে ২৬ আগস্ট ১৯২৭। ১৯৩০ সালের ১ মার্চ ওই সংস্থাটি বন্ধ হয়ে যায়। সরকার সম্প্রচারের দায়িত্ব নেয় এবং ১ এপ্রিল ১৯৩০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং সার্ভিস (আইএসবিএস) চালু করে। ১৯৩২ সালের মে মাসে এটি একটি স্থায়ী পরিষেবায় পরিণত হয় এবং পরে ৮ জুন ১৯৩৬ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওর নামকরণ করা হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের একটি শুভেচ্ছা কবিতার সূত্র ধরে পরে যার নতুন নাম হয় ‘আকাশবাণী’।

এরপর গঙ্গানদী দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। ১৯৭৫ সালে ভারতে টেলিভিশনের জয়যাত্রা শুরুর পর ধীরে ধীরে দুয়োরানি হয়ে পড়ল বেতার। কথার সঙ্গে সেখানে ছবিও দেখা যায় যে। তবুও ঘরের কোণে পড়ে ছিল ধূলিমলিন রেডিওটা। বছরে একবার ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার আগ্রহে হয়তো পাড়ার রেডিও-সারাইয়ের দোকানে ভিড় করতেন গৃহস্থেরা। কিন্তু সে ছবিটাও ধীরে ধীরে বদলে গেল নতুন শতাব্দীর আগমনের ঠিক আগেই। দেশের অন্য একাধিক শহরের মতো কলকাতাতেও পদার্পণ করল এফএম – ‘ফ্রিকোয়েন্সি মডিউলেশন’। কলকাতা ‘ক’, কলকাতা ‘খ’, বিবিধ ভারতীর একদা জনপ্রিয়তাকে বলে বলে দশ গোল দিল এফএম। লাইভ অনুষ্ঠান, সাম্প্রতিক গানের ডালি, সরাসরি ‘রেডিও জকি’ বা ‘আরজে’-দের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ তো এর আগে পায়নি শহর থেকে গ্রামের মানুষ। লোকের পকেটে পকেটে ঘুরতে লাগল ছোট্ট ছোট্ট এফএম সেট – অন্যকে বিরক্ত না করে ইয়ারফোন দিয়েই যা দিনরাত শুনল শ্রোতারা। এক-দু বছরের মধ্যে মোবাইল ফোনেও ঢুকে পড়ল এফএম।

আকাশবাণী কলকাতার তরফে ১৯৯৬ সালে এফএম-এ বাংলায় লাইভ অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই কর্মকাণ্ডের অন্যতম কাণ্ডারী তৎকালীন কেন্দ্র অধিকর্তা মনোবিদ ড. অমিত চক্রবর্তী কলকাতার রবীন্দ্রসদনে আকাশবাণীর একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘পরবর্তী দশকটা রেডিওর দশক’। কথাটা কতদূর সত্যি ছিল, সেটা পরবর্তীতেই বোঝা গিয়েছে। কারণ ২০১০-এর পর থেকেই ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসতে থাকল এফএম-এর সেই জনপ্রিয়তা। কলকাতা শুধু নয়, গোটা ভারত এবং সারা বিশ্ব জুড়েই ইন্টারনেট পরিষেবা হাতের মুঠোয় চলে আসার ফলে অডিও-ভিজুয়ালে মজে গেল জেন এক্স, জেন ওয়াই। ইউটিউব, স্পটিফাই, গানা, জিও-সাবন এখন অনেক বেশি ‘ফ্রেন্ডলি’ জেন জি-র কাছে। আস্তে আস্তে স্মার্ট ফোনের ছোট্ট স্ক্রিনটার মধ্যেই মনোরঞ্জনের সবকিছু পাওয়া গেলে আর খরচ করে কে রেডিও কিনবে? এখন সে তাই বড় হয়ে যাওয়া বাড়ির আদুরে কন্যার এককালের প্রিয় পুরনো পুতুলের মতো বাতিলের ঝুড়িতে ঠাঁই পেয়েছে। তবুও… শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা রেডিওতে এবারও আবার বেজে উঠবে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে…’ আবার শোনা যাবে দেবীর আগমনবার্তা। স্মার্ট ফোনে, গাড়ির রেডিওতে, বাড়ির সদ্য সারিয়ে আনা ট্রানজিস্টরে সুরে ভরবে মহালয়ার ভোর।

হাইলাইট- আজ ২৬ আগস্ট, কলকাতা রেডিওর জন্মদিন। আকাশবাণী কলকাতা বা লোকমুখে রেডিও – তখন এতটাই জনপ্রিয় ছিল, স্বয়ং কোনও বিখ্যাত মানুষ বা ঘটনা সম্পর্কে যতক্ষণ না বেতারে কিছু জানানো হচ্ছে, ততক্ষণ বিশ্বাসই করত না কেউ। রাজনৈতিক চাপ ছিল, কিন্তু এখনকার মতো এত প্রকট হয়ে দেখা দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকারি মিডিয়ায়। পরাধীন ভারতে তখন ব্রিটিশ রাজ চলছে। ১৯২৩ সালের জুন মাসে বম্বে প্রেসিডেন্সি রেডিও ক্লাব এবং অন্যান্য রেডিও ক্লাবের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্প্রচার শুরু হয় এ দেশে। ১৯২৭ সালের ২৩ জুলাই একটি চুক্তি অনুসারে, বেসরকারি ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি লিমিটেড (আইবিসি) দুটি রেডিও স্টেশন পরিচালনার জন্য অনুমোদিত হয়।

Related Articles