ভূত চতুর্দশী: অন্ধবিশ্বাস নয়, প্রজ্ঞার ঐতিহ্য
সংস্কৃতে ‘ভূত’ শব্দের আদি তাৎপর্য যা পূর্বে ছিল কিংবা যা পঞ্চভূতে বিলীন হয়েছে
রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী: কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত ‘ভূত চতুর্দশী’ কেবল একটি লৌকিক পার্বণ নয়; এটি সনাতন দর্শনের অতীত-চেতনা, পূর্বপুরুষের প্রতি গভীর প্রণতি এবং দেশজ লোকায়ত প্রজ্ঞার এক অনুপম মেলবন্ধন। সংস্কৃতে ‘ভূত’ শব্দের আদি তাৎপর্য যা পূর্বে ছিল কিংবা যা পঞ্চভূতে বিলীন হয়েছে। লোকবিশ্বাস ও পৌরাণিক প্রত্যয় অনুসারে, শ্যামাপূজা ও দীপাবলির প্রাক্কালে ইহলোক ও পরলোকের মধ্যবর্তী অদৃশ্য ব্যবধান শিথিল হয়ে আসে; মর্ত্যধামে নেমে আসেন পরলোকগত চোদ্দ পুরুষের আত্মারা। তাঁদের পথ আলোকিত করতে এবং গৃহকোণ থেকে অশুভ শক্তির প্রভাব দূর করতে প্রজ্বলিত করা হয় চোদ্দটি মাটির প্রদীপ—যা মূলত অজ্ঞতার অন্ধকার হটিয়ে অন্তরে চেতনার আলো জ্বালানোর প্রতীক।
এই উৎসবের সবচেয়ে বাস্তবমুখী দিকটি হলো ‘চোদ্দ শাক’ (ওল, কেঁউ, বেতো, সর্ষে, নিম, জয়ন্তী, শালিঞ্চ, হেলঞ্চা, পলতা, গুলঞ্চ, কালকাসুন্দে, ভাঁট, শুশনি ও শেলু) গ্রহণের বিধান। শরৎ বিদায় নিয়ে হেমন্তের আগমনে প্রকৃতির এই ঋতু পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে পেটের গোলযোগ, কফ-পিত্তের আধিক্য ও ভাইরাসজনিত সংক্রমণের প্রকোপ বাড়ে। আয়ুর্বেদের ‘ঋতুচর্যা’ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবিত এই প্রাচীন লোকবিধি আসলে এক অনন্য প্রাকৃতিক প্রতিষেধক। তিক্ত, কটু ও কষায় স্বাদের এই ভেষজ পাতাগুলি শরীরের ত্রিদোষ প্রশমিত করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। আধ্যাত্মিকতার আবরণে পূর্বসূরিরা মূলত এক গভীর গণস্বাস্থ্যবিধিই আমাদের ঐতিহ্যে বুনে দিয়েছিলেন।
পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও তাঁদের শান্তির আকাঙ্ক্ষা কিন্তু ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির এক বিশ্বজনীন আর্তি। জাপানের ‘ওবন’ উৎসবে গৃহদ্বারে ‘মুকায়ে-বি’ অগ্নিশিখা জ্বেলে আত্মাকে আবাহন কিংবা নদীতে ‘তরো নাগাসি’র লণ্ঠন ভাসানোর দৃশ্য আমাদের চোদ্দ প্রদীপেরই প্রতিচ্ছবি। বিশেষত চীনের ঐতিহ্য এখানে প্রণিধানযোগ্য। তাও ও বৌদ্ধ দর্শনের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা চীনের চান্দ্র সপ্তম মাসের ‘ঝংইউয়ান’ বা ‘হাংরি ঘোস্ট’ উৎসবে অতৃপ্ত আত্মাদের জন্য রাজপথে সুস্বাদু খাদ্য নিবেদন করা হয়, পোড়ানো হয় প্রতীকী ‘জোশ পেপার’ বা কাগজের মুদ্রা, এমনকি অপেরা মঞ্চের সামনের পুরো একটি সারি শূন্য রাখা হয় অদৃশ্য আত্মাদের রসাস্বাদনের জন্য। আধুনিক প্রযুক্তির শীর্ষে থাকা চীন একে বিন্দুমাত্র অবজ্ঞা না করে ‘ফিলিয়াল পায়টি’ বা পূর্বপুরুষের প্রতি পরম পারিবারিক ঋণ হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লালন করে।
অথচ এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই উন্মোচিত হয় এক তীব্র সাংস্কৃতিক দ্বিচারিতা। পাশ্চাত্যের ‘হ্যালোউইন’ যখন বাণিজ্যিক চাকচিক্যের ডানায় ভর করে আধুনিক ফ্যাশন হয়ে ওঠে কিংবা চীনের প্রেতস্মরণ যখন ‘গৌরবোজ্জ্বল জাতীয় ঐতিহ্য’ হিসেবে বন্দিত হয়, ঠিক তখনই ভারতের মাটিতে চোদ্দ প্রদীপ দেওয়া বা চোদ্দ শাক খাওয়ার মতো বিজ্ঞানসম্মত আচরণ দেখলেই এক শ্রেণির তথাকথিত প্রগতিশীলের গায়ে জ্বালা ধরে। ঔপনিবেশিক দাসত্বে অন্ধ এই মানসিকতা নিজেদের সুগভীর দর্শন ও জীববৈচিত্র্যের জ্ঞানকে না বুঝেই চটজলদি ‘কুসংস্কার’ ও ‘পশ্চাৎপদতা’র তকমা এঁটে দেয়। পশ্চিমের ভূত যদি শৈল্পিক রোমাঞ্চ হতে পারে, তবে ভারতের পিতৃস্মরণ কেন অন্ধবিশ্বাস হবে? আসলে কুসংস্কার ভারতীয় ঐতিহ্যে নয়, বাসা বেঁধেছে স্বজাতির শিকড়কে অবজ্ঞা করা ওই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মজ্জাগত হীনমন্যতায়। ভূত চতুর্দশী কোনো ভয় বা অলৌকিক অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকার নয়; এটি পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধার সেতুবন্ধন, অন্ধকার ভেদ করে আলোকের উদ্বোধন এবং প্রকৃতির ছন্দে শরীর ও মনকে সুস্থ রাখার এক চিরন্তন জীবনাদর্শ।





