রাজ্যের খবর

কালীপুজোয় কেন নিবেদন করা হয় ‘কারণবারি’? দেবী কি সত্যিই সুরাপান করেন?

সাধারণ মদ্যপান নাকি চরম আধ্যাত্মিক সাধনা? শ্যামাপুজোয় মদ নিবেদনের নেপথ্যে ঋষি বশিষ্ঠের গোপন ইতিহাস!

Truth of Bengal: শরৎকালের শেষ অমাবস্যা তিথি মানেই আলোর উৎসব শ্যামাপুজো। মা কালীর আরাধনায় জবা ফুল, হোম-যজ্ঞ, ধূপ-দীপ আর বলির পাশাপাশি এক অদ্ভুত ও অনন্য উপাদানের উপস্থিতি দেখা যায়। তা হল ‘কারণবারি’ বা সুরা। সাধারণ গৃহস্থ বাড়ির পুজোয় এর সচরাচর ব্যবহার না থাকলেও, তান্ত্রিক পুজো কিংবা শ্মশান সাধনায় এটি অত্যন্ত আবশ্যিক এক উপাদান। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, বিশ্বজননী মা কালী কি সত্যিই মদ্যপান পছন্দ করেন? নাকি এই আচার-অনুষ্ঠানের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে গভীর কোনও তান্ত্রিক ও আধ্যাত্মিক দর্শন?

শাস্ত্র ও তন্ত্রমতে, শক্তি আরাধনার মূল ভিত্তি হল ‘পঞ্চতত্ত্ব’ বা পঞ্চ ‘ম’কার, মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন। এই পাঁচটি উপাদানের প্রথম ও অন্যতম প্রধান উপাদান হল মদ্য বা কারণবারি। ‘মহানিৰ্বাণ তন্ত্র’-এ বিভিন্ন প্রকার সুরার উল্লেখ পাওয়া যায়। সাধকদের মতে, এটি সাধারণ তৃষ্ণা মেটানোর পানীয় নয়, বরং এক মহৌষধির প্রতীক, যার আশ্রয়ে জগতের জীব নিজের সমস্ত জাগতিক দুঃখ-কষ্ট ভুলে আত্মস্থ হতে পারে। তবে ভোগ-বিলাসের জন্য নয়, একমাত্র কঠোর সাধনার উদ্দেশ্যেই এর প্রয়োগ নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

পৌরাণিক কাহিনী ও লোককথা অনুযায়ী, বাংলায় কারণবারি সহযোগে এই তন্ত্রসিদ্ধ পুজোপদ্ধতির প্রচলন করেছিলেন স্বয়ং ঋষি বশিষ্ঠ। কথিত আছে, বহু বছর কঠোর তপস্যা করেও যখন তিনি সিদ্ধিলাভে ব্যর্থ হন, তখন বিষ্ণুর নির্দেশে তিনি চিন বা তিব্বত অঞ্চলে যান। সেখানে গিয়েই তিনি পঞ্চ-মকার ও কারণবারি সহযোগে তারা ও কালী সাধনার গোপন বিদ্যা আয়ত্ত করেন। পরবর্তীতে সেই তান্ত্রিক মার্গ ধরেই বাংলায় শ্যামাপুজোয় কারণবারি অর্পণের বিশেষ প্রথা ছড়িয়ে পড়ে।

তবে এই আচারের প্রকৃত অর্থ নিহিত রয়েছে পরম আধ্যাত্মিক দর্শনে। ‘আগমসার’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, সাধনার উচ্চ মার্গে ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে যে সোমরস বা অমৃতধারা ক্ষরিত হয়, তা পান করেই সাধক পরমানন্দ লাভ করেন, এটিই প্রকৃত মদ্যসাধনা। জাগতিক স্তরে মদ যেমন মানুষের চেতনা ও ভয় ভুলিয়ে দেয়, তেমনই দেবীর চরণে মদ্য নিবেদনের অর্থ হল সাধক তাঁর অন্তরের সমস্ত পশুবৃত্তি, অহংকার, মোহ এবং নেতিবাচক ভাবনাকে মায়ের পায়ে চিরতরে বলি দিচ্ছেন। ফলে কালীপুজোয় কারণবারি নিবেদনের এই প্রথা কেবল কোনও বাহ্যিক নিয়ম নয়, বরং অহংকার বিসর্জন দিয়ে পরম মুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য তান্ত্রিক সোপান।

Related Articles