স্তব্ধ হয়ে গেল আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ! প্রয়াত কিংবদন্তি শিল্পী যোগেন চৌধুরী!
রাষ্ট্রপতির ভবনের কিউরেটর থেকে তৃণমূলের সাংসদ, জীবনভর নানা রঙের জাদুতে মুগ্ধ করা শিল্পী আর নেই!
Truth of Bengal: দেশভাগের দংশন যাঁর জীবনকে উদ্বাস্তু করেছিল, আর সেই উদ্বাস্তু জীবনের গভীর ক্ষত, মানুষের ভাঙাচোরা মুখ কিংবা শরীরের নানা বিকৃতিই কালক্রমে যাঁর তুলির প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছিল, আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার সেই অন্যতম প্রধান স্তম্ভ যোগেন চৌধুরী প্রয়াত। রবিবারে বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। গত ১৪ মাস ধরে মারণ ক্যানসারের সঙ্গে অত্যন্ত শক্ত হাতে লড়াই চালাচ্ছিলেন ৮৭ বছর বয়সি এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী। সম্প্রতি এর সঙ্গেই যুক্ত হয়েছিল মারাত্মক মূত্রনালীর সংক্রমণ, যার জেরে পুজোর ষষ্ঠীর দিন তাঁকে তড়িঘড়ি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে চলে যান তিনি।
১৯৩৯ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার দহরপাড়া গ্রামে জন্ম হয়েছিল যোগেন চৌধুরীর। তাঁর পিতা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন ফরিদপুরেরই এক সম্ভ্রান্ত জমিদার। জমিদার পরিবারের রক্ত প্রবাহিত হলেও তাঁর মধ্যে প্রথম শিল্পী মন খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর মা, যাঁর হাত ধরেই তাঁর আঁকার হাতেখড়ি হয়েছিল। ছোটবেলায় কলকাতার নিজের বাড়ির দেওয়ালে একটি সুন্দর ময়ূরের ছবি এঁকে তিনি তাঁর জীবনের প্রথম অঙ্কনকর্ম শুরু করেছিলেন। এরপর ধাপে ধাপে তাঁর শিল্পচর্চা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছয়। ১৯৬০ সালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি সুদূর প্যারিসে পাড়ি দেন। সেখানে বিখ্যাত ‘Ecole des Beaux Arts’ এবং উইলিয়াম হেটারের নামী ‘Atelier 17’-এ অঙ্কনের ওপর উচ্চশিক্ষা ও পাঠ গ্রহণ করেন। ইউরোপ তাঁকে হাতে ধরে রেখা জালের অদ্ভুত কারসাজি শিখিয়েছিল, আর অন্যদিকে তাঁর নিজস্ব শিকড় তথা বাংলার উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল তাঁর শিল্পের মূল ভিত। এই দুইয়ের এক অপূর্ব মিশ্রণে ভারতীয় চিত্রশিল্পের দুনিয়ায় এক বিশাল মাইলফলক স্থাপন করেছিলেন তিনি। তাঁর ছবিতে নিখুঁত আড়াআড়ি রেখার জাল ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্য, যার মাধ্যমে তুলির টানে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন ফোলা, বিকৃত অথচ গভীর মানবিকতা সম্পন্ন সমস্ত মুখাবয়ব। তাঁর ছবির দুনিয়ায় গণেশ, দম্পতি ও নারী সবসময়ই অত্যন্ত প্রিয় বিষয় হিসেবে স্থান পেয়েছে।
প্যারিস থেকে সফলভাবে ফেরার পর একজন সমাজসচেতন ও প্রখর দৃষ্টিসম্পন্ন শিল্পী হিসেবে তিনি ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। সমাজের নানা কদর্য দিক ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর ব্যঙ্গাত্মক চিত্রকর্ম সবসময়ই শিল্পপ্রেমীদের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলেছিল। খ্যাতির পাশাপাশি তাঁর মুকুটে একে একে যোগ হয়েছিল একাধিক মর্যাদাপূর্ণ সম্মান। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটরের দায়িত্ব সামলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতনের কলাভবনের অধ্যাপক ও প্রধান হিসেবেও গুরুদায়িত্ব পালন করেন। পদ্মভূষণ সম্মান ছাড়াও ললিতকলা একাডেমি এবং ফ্রান্সের ‘প্রিক্স দে লা জঁ পেন্তুর’-এর মতো আন্তর্জাতিক সম্মানও তাঁর ঝুলিতে এসেছে। শুধু শিল্পকলা নয়, ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী, তবে তাঁর কাছে রাজনীতির পরিসরের চেয়ে তাঁর নিজের স্টুডিওর ক্যানভাস ও সৃষ্টিশীলতা সর্বদা অনেক বেশি বড় ছিল।
কলকাতায় নিজের হাতে পরম যত্নে গড়ে তোলা ‘চারুবাসনা দ্য যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’ তাঁর জীবনের অন্যতম শেষ স্বপ্ন হিসেবে রয়ে গেল। বাংলা চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও যামিনী রায়ের পর যে হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পী নিজস্ব স্বাধীন ব্যাকরণ ও শৈলী তৈরি করতে পেরেছিলেন, যোগেন চৌধুরী ছিলেন সেই ধারারই সর্বশেষ উজ্জ্বল স্তম্ভ। তাঁর নিজের জীবনের রেখাটি আজ চিরতরে থেমে গেলেও, তাঁর রেখে যাওয়া অজস্র ছবির মায়াজালে চিরকালের মতো আচ্ছন্ন হয়ে রইল গোটা শিল্পের বিশ্বমণ্ডল।


