কলকাতা

‘এই রাজনীতিকে আমি ঘৃণা করি!’ বিজয়ার দিনেই রাজনীতি ছাড়ার বার্তা মদনের

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি

Truth of Bengal: তৃণমূল সরকারের পতনের পরও নিজের রাজনৈতিক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিলেন কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র। দলের কঠিন সময়ে প্রথম দিকে তাঁকে দেখা গিয়েছিল কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশপাশে। তবে মাস দুয়েকের মধ্যেই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের দিকে ঝুঁকতে দেখা যায় তাঁকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। সতীর্থদের পাশে দাঁড়িয়েও সরব হয়েছেন বিভিন্ন ইস্যুতে। কিন্তু এবার যেন নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েই সংশয়ে মদন। পুজোর আগে থেকেই রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন কামারহাটির বিধায়ক। বিজয়ার দিনে সেই জল্পনাই আরও জোরালো হল। প্রকাশ্যেই রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথা বললেন তিনি। নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে মদন মিত্রের মন্তব্য, “এখন চালের মধ্যে কাঁকড় বেশি। তেমনই রাজনীতিতেও অধার্মিক-অনৈতিক লোক বেশি। আমি এই রাজনীতিকে ঘৃণা করি এবং রাজনীতিক হিসেবে নিজের প্রতিও আমার ঘৃণা হয়।”

দেবী দুর্গার বিদায়ে যখন উৎসবের রেশ কাটিয়ে বিষাদের সুর চারদিকে, তখন মদন মিত্রের কণ্ঠেও ধরা পড়ল হতাশা। তবে তাঁর আক্ষেপের কারণ ব্যক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। বিধায়কের দাবি, জীবনে এই প্রথম বিজয়ার দিনে তিনি সেই মানুষের কাছে পৌঁছতে পারেননি, যাঁদের ভোটে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। মদন মিত্রের অভিযোগ, খুন, সন্ত্রাস ও হিংসার আশঙ্কায় তিনি মানুষের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তাঁর কথায়, তাঁকে খুনের চেষ্টা করা হয়েছে। বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানানোর পর তিনি পুলিশকেও বিষয়টি দেখতে বলেছিলেন বলে দাবি করেন বিধায়ক। তবুও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি তাঁর। মদনের বক্তব্য, “এবার যাব, তাতে যদি মৃত্যু আসে, তাও ভালো। মুখ্যমন্ত্রী সারা বাংলার ঘুরলেন, আমি পারলাম না। বন্দুক নিয়ে খুনিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রকাশ্যে।” নির্বাচনে জয়ের ব্যবধান বাড়ার প্রসঙ্গ টেনেও আক্ষেপ শোনা যায় তাঁর গলায়। জেল খাটার পরেও মানুষের সমর্থন বেড়েছে বলে দাবি করে মদন প্রশ্ন তোলেন, বিজয়ার মতো আনন্দের দিন কেন তাঁকে চোখের জল নিয়ে কাটাতে হবে? তাঁর কথায়, এই পরিস্থিতি তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন মদন মিত্র। তাঁর বর্ণময় ব্যক্তিত্বের জন্য রাজনৈতিক মহলে ‘কালারফুল বয়’ হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে। সেই নেতাই এখন রাজনীতি নিয়ে চরম বিতৃষ্ণার কথা বলছেন। নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মদন জানান, তিনি নিজেই সংশয়ে রয়েছেন। তবে আপাতত রাজনীতি ছেড়ে দেওয়াকেই একমাত্র পথ বলে মনে করছেন। মদন মিত্রের কথায়, “আমি রাজনীতিতে খুব ক্লান্ত। রাজনীতিতে আমার ঘৃণা এসে গেছে। আমি বলছি রাজনীতিকে ঘৃণা করি। সেই রাজনীতির একটা অংশ হিসেবে নিজেকেও ঘৃণা করি। কারণ আমি মনে করি মানুষের সঙ্গে বেইমানি করছি, মিথ্যে কথা বলছি, প্রতারণা করছি।” কথাগুলি বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বিধায়ক। গলা ধরে আসে, চোখের কোণে জল চিকচিক করে। তবে পরক্ষণেই হাসিমুখে সেই আবেগের ব্যাখ্যা দেন তিনি। জানান, দীর্ঘদিনের জমে থাকা কথাগুলি বলতে পেরেই তাঁর চোখে জল এসেছে। ফের চালের মধ্যে কাঁকড়ের উপমা টেনে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন, রাজনীতিতে অনৈতিকতার বিস্তার এতটাই বেড়েছে যে, সেখান থেকে ভালো-মন্দ বেছে নেওয়াই কঠিন হয়ে উঠেছে।

তবে কি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দেওয়াকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন মদন? এই প্রশ্নেও সরাসরি কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছননি তিনি। বরং তাঁর বক্তব্য, জীবনের কিছু অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। এই পুজোয় তিনি উপলব্ধি করেছেন, ঈশ্বর ছাড়া কেউ কাউকে প্রকৃত আশ্রয় দিতে পারে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে কটূক্তি না করার বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি বিজয়ার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মমতা ও শুভেন্দু অধিকারী—দু’জনকেই। একইসঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, ক্ষমতা বা অহংকারের বশে যেন কেউ সাধারণ মানুষের কথা ভুলে না যান।

Related Articles