সম্পাদকীয়

ভালবাসার দিনে ভালবাসার বিকিকিনি

ইতিহাসের পাতা অনুযায়ী সাধু ভ্যালেনটাইন শহিদ হয়েছিলেন ২৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি।

প্রবীর মজুমদার: ভালবাসার দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি। যে ভালবাসার রং লাল। ভালবাসার রং লাল হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে রক্তাক্ত এক ইতিহাস। পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে পোপ গেলাসিয়াস, ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন।

ইতিহাসের পাতা অনুযায়ী সাধু ভ্যালেনটাইন শহিদ হয়েছিলেন ২৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি। রোমান আইনে সাধু প্রায় রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে কারারুদ্ধ ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। পরিস্থিতি তখন মরণোত্তর ভোজের অনুকূলে ছিল না। সময় তাঁকে স্মৃতি থেকে সরিয়েও দিচ্ছিল; কিন্তু ২২৭ বছর পর ১৪ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবার্ষিকীতে ‘বড় খানা’র আয়োজন করে তাঁকে মানুষের স্মৃতিতে জাগ্রত করা হল। ক্যাথলিক, অ্যাংলিকান ও লুথারিয়ান চার্চ সাধু ভ্যালেনটাইনের নামে ভোজের জন্য এই দিনটি বেছে নেয়; কিন্তু খ্রিস্টীয় ইস্টার্ন অর্থডক্সদের ভোজের সময় ৬ ও ৩০ জুলাই।

রোমের বাসিন্দা, খ্রিস্টধর্মের যাজক ও চিকিৎসক সাধু ভ্যালেন্টাইনের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেই উদযাপিত হয়েছিল এই দিনটি। সে দেশে নিষিদ্ধ হওয়া খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য রোমের তৎকালীন সম্রাট দ্বিতীয়ত ক্লডিয়াস সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে বন্দি করার আদেশ দেন।

সে সময় সেনাদের বিয়ের বন্ধনে আটকে যাওয়ার ওপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা ছিল; কিন্তু যুদ্ধবিরোধী সাধু দেখলেন তরুণ যোদ্ধাদের বিয়ে দিতে পারলে তারা যুদ্ধে যাওয়ার অযোগ্য ঘোষিত হবে। ফলে তাদের মৃত্যুর আশু আশঙ্কা হ্রাস পাবে, নারী সান্নিধ্যে তাদের সুখকর সময়ও কাটবে। কিন্তু তিনি ধরা পড়ে যান। নিষিদ্ধ বিয়েতে পৌরোহিত্য করার অপরাধে তিনি কারারুদ্ধ হন। কারারক্ষকের কন্যা এস্টারিয়াস অসুস্থ হলে সাধু তাকেও সারিয়ে তোলেন। এদিকে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার দিনও ঘনিয়ে আসে। সাধু ভ্যালেনটাইন এস্টারিয়াসকে একটি শেষ বিদায়ের চিঠি লিখলেন। চিঠির শেষে ইতিতে লিখলেন- ‘তোমার ভ্যালেনটাইন’।

সেকালে তো আর স্মার্টফোন ছিল না। কাজেই ‘তোমার ভ্যালেনটাইন’ কথাটি একালের ভাষায় ‘ভাইরাল’ হতে সময় লেগেছে। সাংস্কৃতিক বাধার কারণে কোনও কোনও অঞ্চলে তা প্রবেশের অনুমতি পায়নি। ফলাফল উল্টো হয়েছে— যারা বাধা দিয়েছে তারাই সাধু ভ্যালেনটাইনকে তাদের সংস্কৃতির অংশ করে নিয়েছে। সাধু ভ্যালেনটাইন শুধু প্রেম ও পরিণয়ের সেন্ট প্যাট্রন নন, সব ধরনের বন্ধুত্বেরও।

সাধু ভ্যালেনটাইনকে যদি জিজ্ঞেস করতেন, ভালবাসা বানানটা কী? তিনি জবাব দিতেন; বোকারাম, ভালবাসার কোনও বানান নেই। ভালবাসার কিছু অনুভূতি আছে।

রবীন্দ্রনাথ তো কবেই লিখেছিলেন—

‘তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।

চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার–

কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।’

বা বর্তমান সময়ের কবি জয় গোস্বামীর কলমে—

‘তুমি আমাকে মেঘ ডাকবার যে বইটা দিয়েছিলে একদিন

আজ খুলতেই দেখি তার মধ্যে এক কোমর জল।

পরের পাতায় গিয়ে সে এক নদীর অংশ হয়ে দূরে বেঁকে গেছে।’

সাধু ভ্যালেন্টাইন কিন্ত কোনও দিন ব্যক্তিপ্রেমের কথা প্রচার করেননি। ভালবাসাকে বেঁধে দেননি নারী-পুরুষের শরীরী ছন্দে। তাঁর প্রচার এবং প্রসার ছিল জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানবপ্রেম নিয়ে। সেই ভালবাসাই বিবর্তনের পদচিহ্ন অনুসরণ করে হয়ে একেবারে ব্যক্তিগত পরিধিতে বাঁধা পড়ে গিয়েছে।

তবে আজ এই একবিংশ শতকের ব্যস্ততার সময়ে ভালবাসার ফুরসতও মেলে না। তাই বিশেষ দিনগুলিতে হিড়িক পড়ে উদযাপনের। অন্য সবের মতো একইভাবে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনস ডে-র দিন ভালবাসা উদযাপন হয়। যুগলেরা মহা আনন্দে এই দিন কাটান। ভ্যালেন্টাইনস ডে-কে ঘিরে উন্মাদনা ক্রমশ বাড়ছে। তা এখন এমন আকার নিয়েছে যে এটা বলা যেতে পারে  প্রেম এখন বড় পণ্য। ভালবাসা বিক্রি হচ্ছে।

প্রেম দিবস বা ভ্যালেন্টাইনস ডে শুধু গোলাপ ফুল, প্রেমপত্রে সীমাবদ্ধ নেই। ভ্যালেন্টাইন ডে-তে ভারতে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনকে ঘিরে ক্যান্ডেলাইট ডিনার থেকে ডায়মন্ড রিং, টেডি বিয়ার, চকোলেট, ফুল, গয়নার উপহার দেওযার চল বাড়ছে। খরচের তালিকায় প্রচুর জিনিস। উপহারের তালিকায় নতুন ট্রেন্ড হচ্ছে বিলাসবহুল সামগ্রী, পোষ্যও। এই বাণিজ্য আবর্তিত হচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, রেস্তোরাঁ ও পরিবহণ সংস্থাগুলিকে ঘিরে।