ডিএ কোনও দয়া নয়, আইনি অধিকার! সুপ্রিম কোর্টে ঐতিহাসিক জয় রাজ্য সরকারি কর্মীদের
রাজ্য সরকারকে বকেয়া ২৫ শতাংশ ডিএ দিতেই হবে।
Truth of Bengal: দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে বড় স্বস্তি পেলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা। বকেয়া মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, ডিএ কোনও দয়ার বিষয় নয়—এটি কর্মচারীদের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার। রাজ্য সরকারকে সেই অধিকার মেনেই বকেয়া ডিএ মেটাতে হবে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি সঞ্জয় করোল ও বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্য সরকারকে বকেয়া ২৫ শতাংশ ডিএ দিতেই হবে। যেহেতু ডিএ-র হার সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, তাই এই বকেয়া হিসাব ও পরিশোধের পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রার নেতৃত্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আগামী ৬ মার্চের মধ্যে এই কমিটি গঠন করতে হবে। বকেয়া ডিএ-র প্রথম কিস্তি মেটানোর শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ মার্চ। পাশাপাশি, ১৫ মে-র মধ্যে কমিটিকে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে এবং সেই সময়ের মধ্যেই বাকি বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ রয়েছে।
এই মামলায় রাজ্য সরকার বকেয়া মেটাতে অতিরিক্ত ছয় মাস সময় চেয়ে আবেদন করেছিল। তবে আদালত সেই আবেদন আংশিক মঞ্জুর করলেও মূল নির্দেশে কোনও রকম ছাড় দেয়নি। বকেয়া ডিএ পরিশোধ করতেই হবে—এই অবস্থানেই অনড় থাকে শীর্ষ আদালত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এর আগেও কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই রায়কেই চ্যালেঞ্জ করে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ মেটানোর নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর করা হয়নি। বরং রাজ্য সরকার সময় বাড়ানোর আবেদন জানায়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মামলার শুনানি শেষ হয়। অবশেষে ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ আদালতের চূড়ান্ত রায় প্রকাশ্যে এল। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় রাজ্য প্রশাসনের ওপর বড়সড় চাপ তৈরি করল।
বিচারপতি সঞ্জয় করোলের বেঞ্চ আরও জানিয়ে দিয়েছে, আদালতের নির্দেশ মানা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে আগামী ১৫ মে-র মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যনির্বাহী রিপোর্ট জমা দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। আদালত সূত্রে খবর, বকেয়া ডিএ মেটাতে রাজ্য সরকারের কোষাগার থেকে আনুমানিক ১০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ সংক্রান্ত আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইবুনাল থেকে। সেখান থেকে বিষয়টি গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে। ২০২২ সালের ২০ মে কলকাতা হাইকোর্ট রায় দেয়, রাজ্য সরকারকে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দিতে হবে। সেই রায়ের বিরুদ্ধেই রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানায়। পরে ২০২৪ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট চার সপ্তাহের মধ্যে ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ মেটানোর নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশও কার্যকর না করে রাজ্য সরকার আবার ছয় মাস সময় চায়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা ১৮ শতাংশ হারে ডিএ পাচ্ছেন। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সেই হার ৫৮ শতাংশ। ফলে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কর্মীদের মধ্যে ডিএ-র ফারাক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈষম্যের অবসান ঘটার পথে এটাই যে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ, তা মানছেন কর্মী সংগঠনগুলিও।






