সম্পাদকীয়

মোবাইল নেশায় হারাচ্ছে শিশুদের কল্পনার জগৎ, বাড়ছে বিপদ!

বইয়ের প্রতি শিশুর আগ্রহ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, আর মোবাইল দখল করে নিচ্ছে তাদের মন ও সময়।

সুভাষ চন্দ্র বাগ: আজকের সমাজে মোবাইল ফোন যেন এক অপরিহার্য বাস্তবতা। যোগাযোগ থেকে বিনোদন, শিক্ষা থেকে তথ্য— সব কিছুই এখন হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার এক আশ্চর্য সাফল্য। কিন্তু এই সাফল্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা— শিশুদের শৈশব ধীরে ধীরে মোবাইলের পর্দায় বন্দি হয়ে পড়ছে। একসময় যাদের অবসর মানেই ছিল বইয়ের পাতা উল্টানো, গল্পে হারিয়ে যাওয়া, এখন তাদের চোখ আটকে থাকে রঙিন স্ক্রিনে। ফলে বইয়ের প্রতি শিশুর আগ্রহ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, আর মোবাইল দখল করে নিচ্ছে তাদের মন ও সময়।

শিশুরা জন্ম থেকেই আজ প্রযুক্তি-বেষ্টিত এক পরিবেশে বড় হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের প্রতিদিনের জীবনে মোবাইল ফোনের ব্যবহার এত বেশি যে শিশুরাও তা অনুসরণ করছে। বাবা-মা অনেক সময় শিশুকে শান্ত রাখার জন্য মোবাইল হাতে তুলে দেন— একটি ভিডিও, একটি গেম বা কার্টুনের বিনিময়ে শিশুটি নীরব হয়ে যায়। কিন্তু এই নীরবতার পেছনে তৈরি হয় ভয়ঙ্কর এক নেশা। মোবাইলের আলোয় চমকপ্রদ জগৎ বইয়ের পৃষ্ঠার সরলতা ও ধীরগতিকে অচিরেই ম্লান করে দেয়। ফলে বই পড়া তাদের কাছে আর আনন্দের নয়, বরং একঘেয়ে ও অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।

একসময় বই ছিল শিশুর কল্পনার দরজা। বই পড়ে তারা নতুন পৃথিবী আবিষ্কার করত, চরিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলত, ভাষা শিখত, চিন্তা বিকশিত করত। কিন্তু এখন সেই কল্পনার জায়গা দখল করেছে পর্দার দ্রুত চলমান ছবি। ইউটিউব, শর্ট ভিডিও, গেমস বা সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন জগত শিশুর মস্তিষ্কে এমন তাত্ক্ষণিক উত্তেজনা তৈরি করে, যা বইয়ের স্থির ও গভীর আনন্দের সঙ্গে তুলনাহীন। ফলে শিশুর মন আর ধৈর্য ধরে পড়তে চায় না; মনোযোগ ভেঙে যায়, মন ক্রমে অস্থির ও তুচ্ছতায় ভরা হয়ে ওঠে।

শিক্ষাবিদদের মতে, দীর্ঘক্ষণ পর্দা দেখার ফলে শিশুদের মস্তিষ্কে মনোযোগের ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হতে থাকে। ছোটবেলায় যে বোধগম্যতা ও কল্পনাশক্তি বই পড়ে তৈরি হয়, তা মোবাইল দিতে পারে না। বরং মোবাইলের অতি ব্যবহার শিশুকে একাকী, অস্থির ও বাস্তবজ্ঞানহীন করে তোলে। স্কুলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যায়, ভাষার ওপর দখল দুর্বল হয়, এমনকি সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সংকোচ তৈরি হয়। এর পাশাপাশি চোখের সমস্যা, নিদ্রাহীনতা ও মানসিক চাপ— সব মিলিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে শিশুর বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।

এক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান কারণ হল অভিভাবকদের উদাসীনতা। ব্যস্ত জীবনের চাপে বাবা-মায়েরা আজ প্রায়ই সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই ফোনে ব্যস্ত থাকেন, ফলে শিশুরা সেই আচরণ অনুকরণ করে। আবার অনেক অভিভাবক ভাবেন, মোবাইল শিশুর বিনোদনের সহজ উপায়— তাতে ক্ষতি নেই। এই অজ্ঞানতা ও অবহেলাই সমস্যাকে গভীর করে তোলে। তারা বুঝতে পারেন না, শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া মানে ধীরে ধীরে তার কল্পনাশক্তি, পাঠাভ্যাস ও চিন্তার স্বাধীনতাকে হত্যা করা। পরিবারের অভ্যন্তরে পাঠাভ্যাস বা গল্প শোনানোর পরিবেশ না থাকলে শিশু স্বাভাবিকভাবেই বই থেকে দূরে সরে যায়।

তবে এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করা অসম্ভব নয়, যদি পরিবার ও সমাজ সচেতন হয়। প্রথমত, অভিভাবকদের নিজস্ব আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। শিশুর সামনে বড়রা যদি সর্বক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করেন, তবে শিশুর পক্ষে বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা কঠিন। বরং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা, গল্প শোনানো এবং একসঙ্গে পড়ার পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। স্কুলগুলোতেও পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া উচিত— পাঠচক্র, গল্প বলা, বইমেলা ইত্যাদির মাধ্যমে।

সরকার ও শিক্ষাব্যবস্থার দিক থেকেও বইয়ের প্রতি শিশুদের আগ্রহ জাগানোর মতো প্রকল্প গ্রহণ করা দরকার। লাইব্রেরিকে আরও সহজলভ্য করা, ডিজিটাল পাঠাগার তৈরি করা এবং স্কুলের পাঠ্যক্রমে গল্পপাঠের বাধ্যতামূলক সময় রাখা যেতে পারে। প্রযুক্তি পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু সেটিকে শিক্ষণীয় ও সৃজনশীল পথে ব্যবহার করতে হবে। শিশু যেন বুঝতে শেখে— মোবাইল আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু বই শেখায়, চিন্তা জাগায় এবং মানুষ করে তোলে।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক। যদি তারা বই থেকে দূরে সরে যায়, তবে ভবিষ্যতের সমাজ হবে চিন্তাহীন ও মূল্যবোধহীন। বই শুধু জ্ঞানের উৎস নয়, মানবিকতারও পাঠ দেয়। মোবাইলের পর্দা মুহূর্তের বিনোদন দিতে পারে, কিন্তু বই গড়ে তোলে চরিত্র, মস্তিষ্ক ও মনন। তাই আমাদের দায়িত্ব— শিশুর হাতে আবার বই ফিরিয়ে দেওয়া, তাদের কল্পনার ডানায় উড়তে সাহায্য করা।

শেষ পর্যন্ত, প্রযুক্তি হোক আমাদের সহযোগী, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। মোবাইলের পর্দা নয়, বইয়ের পাতা হোক শিশুর শৈশবের আলোকবর্তিকা। তবেই হয়তো আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশব, যেখানে জ্ঞানের আলো জ্বলে বইয়ের পাতায়, আর শিশুর মুখে ফুটে ওঠে কৌতূহলের মিষ্টি হাসি।

Related Articles