সম্পাদকীয়

যে পরিবারগুলির দুর্গোৎসবের আনন্দ ম্লান হল, তার দায় কার?

সোমবার রাত বারোটা থেকে বৃষ্টির সূত্রপাত। চলল মঙ্গলবার ভোর পাঁচটা পর্যন্ত।

জয়ন্ত চক্রবর্তী: দুর্গাপুজোয় মণ্ডপগুলিতে আলো ঝলমল করবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সববরাহের কৃতিত্ব দাবি করে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দেবে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন লিমিটেড বা সিইএসসি। আমরা অজান্তে হাততালি দেব এই কৃতিত্বের জন্য। কিন্তু, আমরা একবারও কী ভাববো সেই ৯ জনের কথা, যাঁরা তাঁদের জীবনে যবনিকা টানলেন মঙ্গলবার শহরের তৃতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতে! সোমবার রাত বারোটা থেকে বৃষ্টির সূত্রপাত। চলল মঙ্গলবার ভোর পাঁচটা পর্যন্ত।

মানছি এই বৃষ্টি গত ৩৯ বছরে দেখেনি কলকাতা। মানছি এত বেশি বৃষ্টি হলে বিপর্যয় নেমে আসে জনজীবনে। কিন্তু মানতে পারছি না ৯টি প্রাণের চলে যাওয়াটা? ম্যান মেড বন্যার কথা আমরা আগে শুনেছি। ম্যান মেড ডেথ এই প্রথম দেখলাম। সিইএসসি-র ফিডার বক্সগুলি জলের তলায় চলে গিয়েছিল, বিদ্যুতের বক্সগুলিও নিচু এলাকায় জলের তলায় চলে যায়। ফলে জল এবং ল্যাম্পপোস্টগুলি বিদ্যুৎবাহী হয়ে যায়। তাই এই বিপত্তি। দুর্গোৎসবের আগে ৯টি পরিবারে অমানিশার অন্ধকার নেমে এল।

নেতাজিনগরের সেই ফল নিক্রেতাকে আমি চিনতাম। না, পোশাকী আলাপ তার সঙ্গে কোনওদিনই আমার হয়নি। কিন্তু, আমার অফিসের উল্টোদিকেই নিয়মিত আপেল-আঙুরের পসরা নিয়ে তিনি বসে থাকতেন। কতদিন ট্যাক্সি থেকে নেমে টাকা খুচরো করেছি তার কাছ থেকে! এই যে মঙ্গলবার সকালে তিনি অঙ্গারে পরিণত হল এর দায় কে নেবে? মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সিইএসসি-র ওপর এমনি এমনি ক্ষুব্ধ হননি! আমফানেও এইভাবে মারা গিয়েছিল বেশ কিছু লোক। সেই সময় সিইএসসি-র পক্ষে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় আধুনিককরণ করা হবে।

আমফানের আস্ফালনের পর তিন বছর কেটে গিয়েছে। এখনও অবস্থা যে কে সেই! এখনও বেশি বৃষ্টি হলেই তড়িদাহত হয় প্রাণ যায়। মুখ্যমন্ত্রী সঠিকই বলেছেন, ‘এই শহরে ব্যবসা করবে আর উন্নয়ন আর আধুনিককরণের কাজ সব রাজস্থানে– তা চলতে পারে না!’ আতিকায় দৈত্য এই শহর থেকে প্রচারের ফয়দা তুলবে আর এই মহানগরীকেই ব্রাত্য করে রাখবে এই অনাসৃষ্টি চলে না। মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই একটা অভিমান, এই সিইএসসি যখন অন্য শহরে অন্য বেশভূষা গায়ে চাপিয়ে অন্য মতাদর্শকে সমর্থন করে তখন আপনি কিংবা আপনারা নীরব থাকেন কেন? কেন প্রতিবাদে সরব হন না? ৯টি তরতাজা প্রাণ তখন বিনষ্ট হয় না বলেই কী!

আসলে এত কথা লিখে ফেললাম একরাশ অভিমান থেকে। দুর্গাপুজোর আগে সেই সব বাড়ির কথা ভেবে যাদের আর কোনওদিন দুর্গাপুজো হবে না। পুজো এলেই তাদের মনে পড়ে যাবে বিভীষকার সেই রাতের কথা। তাদের জীবনে মঙ্গলবারও সকাল এসেছিল। কিন্তু এ কোন সকাল যা রাতের থেকেও অন্ধকার!

মুখ্যমন্ত্রীর সাহৃদয় মন বলেছে, সিইএসসি-র উচিত মৃতদের পরিবার পিছু পাঁচলক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া। তা হয়তো বেনিয়া বুদ্ধিসম্পন্ন সংস্থাটি দিয়ে দেবে। কারণ, সাধারণের ওপর বিদ্যুতের দাম চাপিয়ে এই টাকা তুলে নেওয়া তো বাঁ হাতের খেল! কিন্তু দুর্গোৎসব যখন তুঙ্গে পৌঁছবে, যখন মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় উপচে পড়বে তখন কী একবারও কারও মনে পড়বে বিদ্যুতের বলি এই ৯জনের কথা! আঁধারে ঘরের প্রদীপ হয়ে শুধু তা জ্বলবে আত্মজনদের মনের মুকরে। আলোর প্লাবনে ভাসবে কলকাতা, শুধু আঁধারে থাকবে ৯টি গৃহকোণ। হাজার আলোর রোশনাইও আলোকিত করতে পারবে না এই ৯টি ঘরকে।

Related Articles