বিদেশি পানীয়ের ভিড়ে ধুঁকছে বিধানচন্দ্র রায়ের তৈরি ‘নীরা প্রাশ’
তালমিছরি আর হালকা টকের ম্যাজিক! কলকাতার বুক থেকে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী স্বাদের সন্ধান
রাকেশ চক্রবর্তী: রঙ-বেরঙের কেমিক্যাল যুক্ত বিদেশি বহুজাতিক কোল্ড ড্রিঙ্কসের দাপটে রঙিন বোতলে ঢেকে গিয়েছে শহরের ঠান্ডা পানীয়ের বাজার। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানির কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপনী চমকের মাঝেও গত সাত দশক ধরে নিজের অস্তিত্ব ও স্বতন্ত্র দেশীয় স্বাদকে সগৌরবে টিকিয়ে রেখেছে তিলোত্তমা কলকাতার নিজস্ব তৈরি পানীয়, ‘নীরা প্রাশ’। ১৯৫৫ সালে অবিভক্ত পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের দূরদর্শী ভাবনায় ও বিশেষ উদ্যোগে ঐতিহ্যবাহী এই দেশীয় পানীয় প্রথম বাজারে পা রেখেছিল। উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, ক্ষতিকারক বিদেশি সফট ড্রিঙ্কসের স্বাস্থ্যকর ও খাঁটি দেশীয় বিকল্প হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে একটি সুস্বাদু উপাদান পৌঁছে দেওয়া।
পানীয়টির ঐতিহাসিক নাম ‘নীরা প্রাশ’ হলেও, বর্তমানে এটি প্রস্তুত করতে মূলত ব্যবহৃত হয় স্বাস্থ্যকর তালমিছরি। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মেশানো হয় সাইট্রিক অ্যাসিড এবং সামান্য পরিমাণে খাদ্যোপযোগী নিরাপদ সংরক্ষণকারী উপাদান। মিষ্টি ও হালকা টকের এক অপূর্ব মিশেলে তৈরি এই শীতল পানীয় চরম গরমে তৃষ্ণার্ত পথচলতি মানুষের প্রাণ জুড়াতে একসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এই পানীয়টি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তৈরি ও সরবরাহ করে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল তালগুড় শিল্প সমবায়িকা’ (West Bengal Talgur Shilpo Samavayika)।
তবে আধুনিক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে বহুজাতিক পেপসি, কোকাকোলা বা স্প্রাইটের মতো আন্তর্জাতিক ব্রান্ডের ব্যাপক দাপট এবং সহজলভ্যতা বেড়েছে। অন্যদিকে সরকারি বিপণনের সীমাবদ্ধতার কারণে ‘নীরা প্রাশ’-এর প্রচার কিছুটা থমকে গেলেও কলকাতার নির্দিষ্ট কিছু ঐতিহ্যবাহী স্পটে আজও মিলছে এর বিপুল স্বাদ। বিশেষ করে মধ্য কলকাতার ব্যস্ততম বিবাদী বাগে পূর্ব রেলের সদর দফতরের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি নির্দিষ্ট ভ্যান থেকে আজও নিয়মিত বিক্রি হয় নীরা প্রাশ। সোমবার থেকে শুক্রবার প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সেখানে ভিড় জমান নস্টালজিক ভোজনরসিকরা। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক এক প্রশাসনিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই একক স্থান থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৪০০ বোতল নীরা প্রাশ বিক্রি হচ্ছে! এ ছাড়াও দেশপ্রিয় পার্কে রাজ্য তালগুড় সমবায়িকার অফিস থেকেও মিলছে এই পানীয়।
সময়ের নিরিখে জিনিসপত্রের দাম শত গুণ বাড়লেও নীরা প্রাশের দাম এখনও রয়েছে একবারে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের নাগালের মধ্যে। ২৫০ মিলিলিটারের ঐতিহ্যবাহী কাচের বোতলের দাম মাত্র ১০ টাকা এবং ৪০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিকের বোতলের দাম মাত্র ২০ টাকা। পরিবেশরক্ষায় কাচের বোতল ব্যবহারের পর সংগ্রহ করে পুনর্বার জীবাণুমুক্ত ও পরিষ্কার করে রি-ইউজ করা হয়। বিপুল বহুজাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও সাত দশক ধরে টিকে থাকা এই পানীয় আজ কেবল তৃষ্ণা মেটানোর নাম নয়, বরং তিলোত্তমা কলকাতার হারিয়ে যেতে বসা খাদ্য ও শিল্প-ঐতিহ্যের এক অমূল্য দলিল।


