রাজ্যের খবর

থিম বা আলোর রোশনাই নয়, এখানে পুজোর মূল আকর্ষণ প্রাচীন পরম্পরা! নজর কাড়ছে হাওড়ার এই বনেদি পুজো

১২৫ বছরের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও তাই এই বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব আজও বহন করে চলেছে নিজস্ব ঐতিহ্যের স্বাক্ষর

সুমন আদক, হাওড়া: সময় বদলেছে, বদলেছে পুজোর উদযাপনের ধরনও। কোথাও থিমের অভিনবত্ব, কোথাও আলোর ঝলকানি, কোথাও আবার শিল্পের নিত্যনতুন পরীক্ষায় দুর্গোৎসব হয়ে উঠেছে আধুনিকতার ক্যানভাস। কিন্তু মধ্য হাওড়ার মল্লিকবাড়িতে দুর্গাপুজোর আকর্ষণ অন্যত্র। এখানে পুজোর জৌলুসের চেয়ে বড় পারিবারিক পরম্পরা, চোখধাঁধানো আয়োজনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন আচার, আর উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে পূর্বপুরুষদের স্মৃতি। ১২৫ বছরের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও তাই এই বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব আজও বহন করে চলেছে নিজস্ব ঐতিহ্যের স্বাক্ষর। বৈষ্ণবমতে দেবী আরাধনা, সন্ধিপুজোর সন্ধিক্ষণে পশুবলির পরিবর্তে মণ্ডা বলি, রুপোর গহনায় সজ্জিত একচালার মাতৃপ্রতিমা এবং ধুনো পোড়ানোর প্রাচীন রীতি—সব মিলিয়ে মল্লিকবাড়ির পুজো যেন সময়ের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস। পরিবারের প্রবীণদের স্মৃতি থেকে নতুন প্রজন্মের আবেগ, প্রতিটি পরতে জড়িয়ে রয়েছে বনেদিয়ানার নিজস্ব গল্প।

মধ্য হাওড়ার ব্যবসায়ী ধরণীধর মল্লিকের হাত ধরে ১৯০১ সালে এই দুর্গাপুজোর সূচনা। সেই সময় থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে বহন করে চলেছেন এই আরাধনার দায়িত্ব। দীর্ঘ পথচলায় বদলেছে সামাজিক পরিস্থিতি, পাল্টেছে জীবনযাপনের ধরন, এসেছে সময়ের নানা পরিবর্তন। তবু মল্লিকবাড়ির পুজোর মূল সুর আজও অক্ষুণ্ণ। গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা মেনে নির্দিষ্ট বিধি অনুসারে সম্পন্ন হয় দেবীর আরাধনা। এখানে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, পরিবারের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ অটুট রাখার এক বার্ষিক উপলক্ষ। যে বাড়িতে একসময় পূর্বপুরুষেরা দেবীর আরাধনা শুরু করেছিলেন, সেই বাড়ির উঠোনেই আজও ফিরে আসে পুজোর পরিচিত আবহ। আত্মীয়-পরিজনের সমাগম, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর প্রাচীন রীতির অনুশাসনে কয়েকটি দিন যেন থমকে দাঁড়ায় সময়। মল্লিকবাড়ির পুজোর প্রস্তুতিও শুরু হয় নিজস্ব পরম্পরা মেনে। রাধাষ্টমীর দিন একটি কচি বাঁশ পুজো করে দুর্গোৎসবের সূচনা করা হয়। সেই বাঁশকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় প্রতিমা নির্মাণের কাজ। একচালার কাঠামোয় গড়ে ওঠেন দেবী দুর্গা ও তাঁর পরিবার। প্রতিমার গড়নে থাকে সাবেকি রীতির ছাপ, আর সাজসজ্জায় বনেদি আভিজাত্যের প্রকাশ। মাথা থেকে পা পর্যন্ত রুপোর গহনায় সজ্জিত মাতৃপ্রতিমার রূপে ফুটে ওঠে ঐতিহ্যের নিজস্ব ভাষা।

আধুনিক প্রতিমাশিল্পের নানা বৈচিত্র্যের ভিড়ে এই একচালার প্রতিমা যেন মনে করিয়ে দেয় বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসবের চিরপরিচিত ছবি। পরিবারের কাছে দেবী কেবল আরাধ্যা নন, তিনি যেন ঘরেরই মেয়ে—যাঁর আগমনকে ঘিরে তৈরি হয় আনন্দ, আবেগ ও আপনজনদের ফিরে পাওয়ার অনুভূতি। পুজোর দিনগুলিতেও মল্লিকবাড়ি আঁকড়ে ধরে রয়েছে প্রাচীন বিধি ও আচার। মহাষষ্ঠীতে বেলবরণ ও দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল উৎসব। মহাসপ্তমীতে সুগন্ধি দ্রব্য ও ১০৮ ঘটি জল দিয়ে বাড়িতেই সম্পন্ন হয় নবপত্রিকার মহাস্নান। এরপর পঞ্জিকার নির্ধারিত সময় মেনে নবপত্রিকার গৃহপ্রবেশ, গণেশের পাশে তার প্রতিষ্ঠা এবং ঘট স্থাপনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে দেবী আরাধনা। প্রতিটি আচারেই রয়েছে দীর্ঘদিনের অভ্যাস, পারিবারিক বিশ্বাস এবং প্রজন্মান্তরে বহন করে চলা ধর্মীয় অনুশাসনের ছাপ। এই পুজোর অন্যতম স্বাতন্ত্র্য বৈষ্ণবমতে দেবীর আরাধনা। সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায় সন্ধিপুজোর বিশেষ রীতিতে। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে যেখানে অনেক পুজোয় বলির প্রচলন রয়েছে, সেখানে মল্লিকবাড়িতে পশুবলির পরিবর্তে নিবেদন করা হয় মণ্ডা। এই মণ্ডা বলিই পরিবারের পুজোর অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই রীতি আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন পরিবারের সদস্যরা। বনেদি বাড়ির পুজোর মাহাত্ম্য যে শুধু প্রতিমা কিংবা মণ্ডপের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আচার-অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতার মধ্যেও নিহিত, মল্লিকবাড়ির সন্ধিপুজো তারই পরিচয় বহন করে। তবে এই বাড়ির পুজোর আবহকে অন্য মাত্রা দেয় ধুনো পোড়ানোর প্রাচীন প্রথা। বাড়ির বধূ দু’হাতে ও মাথায় একটি করে মাটির সরা নিয়ে দেবীর সামনে বসেন। সরায় জ্বলে কর্পূর ও ধুনো। ধোঁয়ার আবেশ, প্রদীপের আলো আর পুজোর মন্ত্রোচ্চারণে তৈরি হয় এক নিবিড় ধর্মীয় পরিবেশ।

এই আচার শুধুমাত্র একটি প্রথা নয়, বরং পরিবারের পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি ও বিশ্বাসেরও অংশ। সময়ের পরিবর্তন সত্ত্বেও এমন রীতিগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্য দিয়েই মল্লিকবাড়ি তার নিজস্ব পরিচয় ধরে রেখেছে। মহাষ্টমীর পুজোর পর নবমীতে অনুষ্ঠিত হয় কুমারীপুজো। এরপর হোমের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় আরাধনার গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। দশমীতে গঙ্গায় পুজো দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি শুরু হয়। সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা দেবীকে বরণ করে নেন, চলে বিদায়ের আচার। তারপর রামকৃষ্ণপুর গঙ্গার ঘাটে প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। দেবী বিদায় নিলেও বাড়ির উঠোনে থেকে যায় পুজোর স্মৃতি, পরের বছরের অপেক্ষা আর আবারও আপনজনদের একসঙ্গে ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা। ১২৫ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রায় মল্লিকবাড়ির দুর্গোৎসবের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাই তার ধারাবাহিকতা। পুরনো দিনের রীতিকে নিছক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে না দিয়ে দৈনন্দিন পারিবারিক বিশ্বাসের অংশ করে তোলার মধ্যেই রয়েছে এই পুজোর বিশেষত্ব।

নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের একসূত্রে বাঁধা এবং পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকারকে সম্মানের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হয়ে উঠেছে এই আরাধনার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। আধুনিক দুর্গোৎসবের জগতে মল্লিকবাড়ির পুজো তাই ব্যতিক্রমী এক অভিজ্ঞতা। এখানে নতুনত্বের সন্ধান নেই বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতিযোগিতায়, বরং পুরনোকে যত্ন করে ধরে রাখার মধ্যেই রয়েছে তার স্বতন্ত্র আবেদন। ১২৫ বছর ধরে চলে আসা এই বনেদি দুর্গোৎসব মনে করিয়ে দেয়, ঐতিহ্য কখনও কেবল অতীতের গল্প নয়—যত দিন বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও পারিবারিক আবেগের মধ্যে তার চর্চা অব্যাহত থাকে, তত দিন তা বর্তমানেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকে। মধ্য হাওড়ার মল্লিকবাড়িতে তাই দেবীর আগমন মানে শুধু বার্ষিক উৎসবের সূচনা নয়, বরং একশো পঁচিশ বছরের পারিবারিক ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও বনেদিয়ানার উত্তরাধিকারকে আরও একবার নতুন করে উদযাপন করা।