উত্তাল তিস্তায় ৩ কিমি ভেসে গেল ১৩ দিনের হস্তিশাবক! প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচালেন পাঁচ মৎস্যজীবী
৭ ফুট গভীর জলে শুঁড় তুলে বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা! অবশেষে বনদফতরের সহায়তায় মায়ের কোলে ফিরল শাবক
Truth of Bengal: খরস্রোতা নদীর গর্জন আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অলৌকিক এক ভালবাসার জয় দেখল উত্তরবঙ্গের গজোলডোবা। মায়ের সঙ্গে নদী পার হওয়ার সময় প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া মাত্র ১৩ দিন বয়সের এক অসহায় হস্তিশাবককে খাস মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনলেন স্থানীয় কয়েকজন সাহসী মৎস্যজীবী। উত্তাল তিস্তা নদীর জলে প্রায় ৩ কিলোমিটার ভেসে গিয়েও শেষপর্যন্ত জীবন ফিরে পেল ওই খুদে। আর ঘটনার শেষে নদীর পারেই দেখা গেল মা ও সন্তানের এক হৃদয়স্পর্শী মিলন দৃশ্য, যা দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত বনকর্মী ও সাধারণ গ্রামবাসী।
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার সকালে উত্তরবঙ্গের গজোলডোবা লাগোয়া তিস্তা নদীর ১২ নম্বর পার এলাকায়। বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, বৈকুণ্ঠপুরের গভীর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তিস্তা নদী পেরিয়ে সরস্বতীপুর চা বাগানের জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিল একটি হাতি ও তার ১৩ দিনের ছানা। কিন্তু ঠিক সেই সময় তিস্তা ব্যারেজের লকগেট খোলা থাকায় নদীর আপার স্ট্রিমে আচমকা জলের তীব্র স্রোত তৈরি হয়। চোখের নিমেষে মায়ের চোখের সামনে থেকে ভেসে যায় অবুঝ শাবকটি। সন্তানকে বাঁচাতে মা হাতিটি জল নেমে প্রাণপণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় এবং পার দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করতে থাকে। স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে কাঠামবাড়ি এলাকায় চলে আসে ছানাটি। কখনও নদীর অতল জলে ডুবে যাচ্ছিল, আবার কখনও প্রাণপণে ছোট্ট শুঁড়টি জলের ওপর তুলে বাঁচার চেষ্টা করছিল সে।
ঠিক সেই সময়েই তিস্তার ওই ১২ নম্বর পার এলাকায় জীবন বিপন্ন করে মাছ ধরছিলেন বাবলু দাস, মিঠু দাস, গোপাল দাস, বাপি দাস ও বিশ্বনাথ দাস নামের পাঁচজন স্থানীয় মৎস্যজীবী। তারা ‘উত্তরবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম’-এর সক্রিয় সদস্য। মৎস্যজীবীরা মাঝনদীতে দূর থেকে হস্তী শাবকটিকে হাবুডুবু খেতে দেখেই আর এক মুহূর্ত দেরি করেননি। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে ছোট্ট একটি ডিঙি নৌকা নিয়ে ফুঁসে ওঠা তিস্তার মাঝদরিয়ায় ছুটে যান তাঁরা। অনেক কসরত করে অতল জল থেকে ধস্তাধস্তি করে ১৩ দিনের ওই ভিজে জড়সড় হয়ে যাওয়া ভারী শাবকটিকে নৌকায় তুলে ডাঙায় নিয়ে আসেন।
ডাঙায় ওঠার পরই নিজের মায়ের খোঁজে ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করতে শুরু করে শাবকটি। মৎস্যজীবীরা সঙ্গে সঙ্গে খবর দেন স্থানীয় কাঠামবাড়ি বনদফতর রেঞ্জে। রেঞ্জ অফিসার ও বনকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটিকে সাবধানে গজলডোবা তিস্তা ব্যারেজ পার করিয়ে শুকনো জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে মা হাতিটি ব্যাকুলভাবে অপেক্ষা করছিল। দীর্ঘ দু’ঘণ্টার যৌথ প্রচেষ্টায় অবশেষে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয় দুধের শিশুটিকে। সন্তানকে কাছে পেয়েই কাণ্ড দিয়ে জাপটে ধরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে মা হাতিটি। মৎস্যজীবীদের এই নজিরবিহীন সাহসিকতাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বনদফতরের শীর্ষ আধিকারিকরা।




