দেশ

Jagannath Rath: রথের দড়িতে হাত মিলিয়ে সাম্যের বার্তা দেন জগন্নাথ

ভারত যে সব জাতি ও ধর্মের মিলনক্ষেত্র তা যেন সর্বার্থেই সজীব হয়ে ওঠে রথযাত্রায়। রথযাত্রার দিন মন্দিরের চার দেওয়ালের অন্তঃপুর থেকে সপার্ষদ ভক্তদের মাঝে হাজির হন ভগবান জগন্নাথ।

Truth of Bengal: জাত-পাতে দীর্ণ আমাদের এই ভারত ভূমিতে প্রভু জগন্নাথই হলেন সাম্যবাদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ একমাত্র সাম্যবাদী জন দেবতা। ভারত যে সব জাতি ও ধর্মের মিলনক্ষেত্র তা যেন সর্বার্থেই সজীব হয়ে ওঠে রথযাত্রায়। রথযাত্রার দিন মন্দিরের চার দেওয়ালের অন্তঃপুর থেকে সপার্ষদ ভক্তদের মাঝে হাজির হন ভগবান জগন্নাথ। ভগবানের পবিত্র রথের রশি টানেন ভক্তরাই। ধনী-দরিদ্র, জাত-ধর্ম নির্বিশেষে ভক্তদের প্রেমে মিলেমিশে একাকার হয়ে যান জগতের নাথ প্রভু জগন্নাথদেব। রাস্তায় রথে চেপে খোদ ভগবানই বের হন ভক্তদের খোঁজ নিতে। এমনটা আর কোনো উৎসবে হয় না। উপনিষদে রথযাত্রাকে মানবশরীরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, গোটা জীবনটাই একটা পথ। যেখানে রথে অধিষ্ঠিত আত্মারূপী ঈশ্বর। আমাদের মন, চিন্তাভাবনার নিয়ন্ত্রক বিবেক সেই রথ টেনে নিয়ে চলেছে (Jagannath Rath)।

প্রভু জগন্নাথদেব আসলে সর্ব ধর্মের এমন ১ সমন্বয়ী দেবতা যাঁর ওপর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী থেকে ১ জন ভূমিহীন অন্ত্যজেরও সমান অধিকার। কথিত, রত্নবেদীতে তিনি বিষ্ণু, শয়নকালে শক্তি, গমনে শিব, স্নানবেদীতে বিনায়ক আর রথে চলার সময় সূর্য। ওড়িশায় এই ৫ দেব-দেবীর আলাদা আলাদা মন্দির আছে। পুরীধামে বিষ্ণু, কোনারকে সূর্যদেব, ভুবনেশ্বরে লিঙ্গরাজ আর যাজপুর বিরজাক্ষেত্রে দেবী বিরজা, মহাবিনায়ক। তিনি একাধারে যেমন শবরদের দেবতা তেমনই তিনি বৈষ্ণবদের কৃষ্ণ। তিনিই শিব আবার তিনিই গণপতি, কালী। জগন্নাথদেবের পুজোর রীতিনীতিতেও এর প্রমাণ মেলে। ঐশ্বর্যের গজদন্তমিনার থেকে প্রভু জগন্নাথ ভক্তদের মাঝে নেমে আসেন বলেই আক্ষরিক অর্থে রথযাত্রা পতিতপাবন যাত্রা। কেন না রথযাত্রায় অনিবার্যভাবে মিশে থাকে সাধারণ ভক্তদের প্রতি পরম করুণাময় ঈশ্বরের আশ্বাসবাণী—‘আমি তোমাদেরই লোক।’ আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের পুন্য তিথিতে ৩টি সুদৃশ্য রথে দাদা বলরাম, বোন সুভদ্রাকে নিয়ে আরোহন করে বিজয় যাত্রা করেন প্রভু জগন্নাথ। বলরামের রথকে তালধ্বজ নামে ডাকা হয়। ৪৪ ফুট উচ্চতার রথের চাকার সংখ্যা ১৪টি। হল বা লাঙল শোভিত ১৪টি চাকা সপ্তলোকের প্রতীক (Jagannath Rath)।

রক্তলাল আর উজ্জ্বল নীল রঙের যে কাপড় মাথায় উড়ছে তার নাম উচ্ছনি। হরিহর, লাটম্বর, গজন্তক, প্রলম্বর, ত্রিপুরারি, রুদ্র, গণেশ আর স্কন্দ হলেন পার্শ্ব দেবতা। রক্ষক হলেন ভাস্কর, সারথি সুদ্যুন্ম। স্থিরা, ধৃতি, স্থিতি আর সিদ্ধা নামে ৪টি কালো রঙের ঘোড়া রথ টানছে। রথের দ্বারপাল হলেন রদ্র ও সাত্যকি। রথের দড়ি বাসকী। লাল ও কালো রঙের কাপড়ে ঢাকা সুভদ্রার রথের নাম দর্পদলন। ৪৩ ফুট উঁচু রথের ১২টি চাকা বছরের ১২ মাসকে চিহ্নিত করছে। বনদুর্গা বা জয়দুর্গা হলেন রথের রক্ষক। সারথির নাম অর্জুন। রথের দেবী হলেন ভক্তিসুমেধা, রথের দেবী হলেন ভূ ও শ্রী। সুমেধা, চামরহস্তা, বিমলা, চামুণ্ডা, ভদ্রকালী, হরচন্দ্রিকা, মঙ্গলা, বারাহী, কাত্যায়নী, জয়দুর্গা ও কালী হলেন রথের পার্শ্বদেবী। রোচিকা, মোচিকা, জিতা আর অপরাজিতা নামে ৪টি খয়েরি ঘোড়া রথ টানছে। সুভদ্রার রথে থাকেন সুদর্শন। রথের দড়ির নাম স্বর্ণচূড়। লাল ও হলুদ রঙের কাপড়ে ঢাকা জগন্নাথদেবের ৪৫ ফুট রথের নাম নন্দীঘোষ (Jagannath Rath)।

রথের ১৬টি চাকা চন্দ্রের ষোড়শ কলার প্রতীক। রথের রক্ষক গরুড়। বিমলা আর বিরজা হলেন রথের দেবী। হনুমান, রাম, লক্ষ্মণ, নারায়ণ, কৃষ্ণ, গোবর্ধন, চিন্তামণি, রাঘব ও নৃসিংহ হলেন রথের পার্শ্বদেবতা। শঙ্খ, বলাহ, শ্বেত আর হরিদাক্ষ নামে ৪টি সাদা রঙের ঘোড়া রথ টানছে। রথের সারথি মাতলি। জয় আর বিজয় ২ দ্বারপাল। রথের রশির নাম শঙ্খচূড়। রথে অধিষ্ঠাত্রী যোগমায়া দেবী। রথের পতাকার নাম ত্রৈলোক্যমোহিনী, যাতে বিরাজমান শ্রীহনুমান। কালো রঙের ঘোড়ারা জগন্নাথ দেবের রথের সঙ্গে সংযুক্ত। রক্তবর্ণের ঘোড়া রয়েছে সুভদ্রা দেবীর রথের সামনে আর বলরামের রথের ঘোড়ার রঙ সাদা। সনাতন হিন্দুরীতি থেকে আলাদা ৩ বিগ্রহ—জগন্নাথ, সুভদ্রা আর বলরামের রূপ। সাধারণত মাটি অথবা পাথর দিয়ে নির্মিত হয় দেব-দেবীর মূর্তি। কিন্তু জগন্নাথদেব দারু বা কাঠ দিয়ে নির্মিত বলেই নাম দারুব্রহ্ম। নিমকাঠ দিয়ে তৈরি জগন্নাথদেবের কলেবর (Jagannath Rath)।

গুন্ডিচা দেবী হলেন সম্পর্কে জগন্নাথদেবের মাসি। প্রত্যেক বছর রথের দিন জগন্নাথ দেব, বলরাম দেব ও সুভদ্রা দেবী রথে চেপে মাসির বাড়ি যান।সপ্তাহখানেক সেখানে থেকে ফের জগন্নাথ মন্দিরে ফিরে আসেন জগন্নাথদেব। রথের দিন সকালে সকাল ধূপ বা খিচুড়ি ভোগ খেয়ে ‘পহান্ডি বিজয়’ করে রথে ওঠেন জগন্নাথদেব, বলরাম আর সুভদ্রা। রথে অবস্থানের পর একে একে দ্বিপ্রহর ধূপ, সন্ধ্যা ধূপ বা বড় শৃঙ্গার ধূপ হয়ে থাকে। গমের তৈরি দ্রব্য দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। প্রভু জগন্নাথদেব রথে উঠে গুন্ডিচা মন্দিরে যাওয়ার সময় পথে যেসব ভোগ দেওয়া হয় তাকে দাণ্ডপন্তি ভোগ বলে। নানা ধরণের ফলমূল ভোগে দেওয়া হয় (Jagannath Rath)।

Related Articles