বাস্তুহারার গান, নাটকে বর্তমান সময়ের চোরা রাজনীতির গল্প
Songs of the homeless, stories of current political corruption in the play
Truth Of Bengal: ইন্দ্রজিৎ আইচ : বেঙ্গল রেপার্টরি বিগত প্রায় ১২ বছর ধরে পারফর্মিং আর্টের ক্ষেত্রে কাজ করছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু পরীক্ষামূলক স্টেজ পারফরম্যান্স করেছে তারা। উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা হল- মনন, বাসনা, অশ্বত্থামা, দ্য ওয়ার মেশিন, আবাহন, কথা-কর্ণভার, স্বর্ণ-সংহার, ঝুলন, জশন-এ-রঙ্গ ইত্যাদি। ভারত রঙ্গ মনোভাব, থিয়েটার অলিম্পিক সহ নানান আন্তর্জাতিক ও জাতীয় অনুষ্ঠানে এই দলটি অংশগ্রহণ করেছে। গ্রুপের শিল্পীরা নিয়মিত পারফর্মিং আর্ট অনুশীলন, গবেষণা এবং তীব্র প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকে। ভারতীয় নাট্যতত্ত্ব ও কলার অনুশীলনে জোর দেয় বেঙ্গল রেপার্টরী।অঙ্গশুদ্ধি ও অঙ্গিকাভিনয়ের উপর দলটি বিশেষভাবে যত্নবান।
শুরু থেকেই হঠযোগ অনুশীলন রেপার্টরীর অপরিহার্য অংশ। সদস্যদের আবৃত্তির অনুশীলন এবং প্রশিক্ষণে উৎসাহিত করা হয়। বেঙ্গল রেপার্টরী সর্বদা তার সদস্য ও শ্রোতাদের মধ্যে ভারতীয় দর্শন এবং আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে সচেষ্ট। গিরীশ মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আয়োজিত নাট্যমেলা-য় অভিনীত হয় বেঙ্গল রেপার্টরী প্রযোজিত বাস্তুহারার গান নাটকটি। যাদুবাস্তবের মোড়কে গাঁথা এই নাটক অস্তিত্ববাদ-কে বারবার প্রশ্ন করলেও বারবার সংলাপে উঠে আসে রাজনীতি এবং তার অন্তরে নিহিত মতাদর্শের দ্বন্দ। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র সেবাস্তিয়ান এই গল্পে সেই অস্তিত্ববাদের মুখোমুখি দাঁড়ানো নির্ভীক প্রশ্নকর্তা। সে বিনা দ্বিধায় বাস্তবকে অবজ্ঞা করে এবং মুখ ফিরিয়ে নিতে চায় বাস্তব থেকে। কিন্তু কেউ তাকে বোঝে না। তার মা-কে সে বোঝাতে চায় কিন্তু তার মা বোঝে না। কেউ বুঝবে না এই সত্য মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে থাকে নিজের জীবনে।
কিন্তু ব্যাঘাত ঘটে যখন নাটকের অপর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মরাম্বিও সেবাস্তিয়ান-এর অস্তিত্বের উপেক্ষা-কে খারিজ করে নিজের ভোগবাদী দর্শন এর দর্প এক জীবন-মৃত্যুর বাজির মাধ্যমে সেবাস্তিয়ানের উপর আরোপ করার চেস্টা করে। পরিচালক সুমিত দে এই নাটকের মাধ্যমে কোথাও কোনো উত্তর দেওয়ার চেস্টা করেন নি। তিনি চরিত্র মননের এই গভীর টানাপড়েন-কে আশ্চর্য কৌশল বলে আলো এবং মঞ্চ সজ্জার আবহে বেঁধেছেন। এর খানিকটা বাহবা চিরঞ্জিত কে যায় যিনি কোরিওগ্রাফি-র মাধ্যমে পরিচালকের এই কৌশল-কে সাবলীল ভাবে মঞ্চে তুলে ধরেছেন। আলো এই নাটকে মাঝে মাঝে যেন নিজেই একটা চরিত্র হয়ে ওঠে। সাধন পারুই -এর আলোর ব্যবহার এক কথায় প্রশংসনীয়। সেবাস্তিয়ানের চরিত্রে অরিন্দম সর্দার যেন আসলেই সেবাস্তিয়ান। তার অভিনয় দেখে একবারের জন্যেও মনে হয় না অভিনেতা অভিনয় করছেন। তার প্রতিটা বলা শব্দ যেন আসলে লিখে দেওয়া কোনো সংলাপ নয়, আদতে তারই মনের কথা।
পরিচালক-অভিনেতার যুগলবন্ধী এবং যত্ন এই নাটকে অভিনয় করা প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে বর্তমান। মরাম্বিও-এর চরিত্রে সানি চ্যাটার্জি যথাযথ। সবার মধ্যে আরেকজন অভিনেতার কথা উল্লেখ্য, কৌস্তভ চৌধুরী যিনি হেক্টর-বেশে এসে দাঁড়ান মরাম্বিয়-এর সামনে। নাটকের প্রথম বেশ কিছুটা তাদের দুজনের সংলাপ বিনিময়ের মাধ্যমেই মুল বিষয়ে প্রবেশ করে। শব্দের মেলবন্ধনে সেই সংলাপ বিনিময় রাজনৈতিক হলেও আসলে তা ইঙ্গিত দেয় মানুষের বেঁচে থাকার অস্তিত্ব-কে। নাটককার বিদিশা ঘোষ সংলাপ রচনার মুন্সিয়ানায় এইখানেই অস্তিত্ববাদের মূল প্রশ্নবীজ রোপণ করেন। আভিজাত্যের পাগলামির আসলে সেই মানুষ করে, যে পাগলামির আভিজাত্য কখনো চেখে দেখেনি।
নাটকের এই সংলাপটি আসলে অল্প শব্দে দর্শক মনে যে আশ্চর্য তৈরি করে তা নাটকটি শেষে এসে ভাবে রূপান্তরিত হয়। অদ্ভুত এক উপলব্ধি চলতেই থাকে ক্রমাগত। এছাড়াও এই নাটকে মা-এর চরিত্রে প্রীতি কর্মকার মঞ্চে তার অভিনয়ের মাধ্যমে এক অদ্ভুত মেলানকোলিক আমেজ তৈরি করে। যা পুরো নাটক-কে আলাদা মাত্রায় নিয়ে যায়। ইসমায়েল-এর চরিত্রে পরিচালক পরিচালনার পাশাপাশি নিজের অভিনয় ক্ষমতার দখল প্রমান করে যান। সর্বোপরি কোরাস এ নাটকের অনন্য সম্পদ। নাট্টকার বিদিশা শব্দ বাঁধার পাশাপাশি সঙ্গীত পরিকল্পক হিসেবে উল্লেখযোগ্য সহযোগ দিয়েছেন।


