ছদ্মবেশে গৃহত্যাগ থেকে রহস্যময় অন্তর্ধান, ইতিহাসের পাতায় নেতাজির এক রূপকথার লড়াই
আঘাতের পর আঘাত হেনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ব্যস্ত ও উত্ত্যক্ত করে তুলেছিলেন সুভাষচন্দ্র।
রাজু পারাল (বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক): নেতাজি সুভাষচন্দ্রের জীবনকথা রূপকথার মতোই রোমাঞ্চকর। একথা অনস্বীকার্য, নেতাজির আগে পৃথিবীর অন্য কোনও রাষ্ট্রনেতা জনমানসে এতটা শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারেননি। সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্ব দেওয়ার নির্ভুল ক্ষমতা ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের জন্য সমগ্র দেশ তাঁকে নেতার আসনে বসাতে কোনও দ্বিধাবোধ করেনি। ত্যাগ, সংযম, নির্লোভ ও কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনার মধ্যে দিয়ে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন দেশমাতৃকার সেবায়। আঘাতের পর আঘাত হেনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ব্যস্ত ও উত্ত্যক্ত করে তুলেছিলেন সুভাষচন্দ্র।
অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেশপ্রেমিক সুভাষ চন্দ্র সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘তুমি তো আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নও, তুমি দেশের জন্য সমস্ত দিয়াছ– তাইতো দেশের খেয়াতরী তোমাকে বহিতে পারে না, সাঁতার দিয়া তোমাকে পদ্মা পার হইতে হয়! তাই তো দেশের রাজপথ তোমার কাছে রুদ্ধ, দুর্গম পাহাড়-পর্বত তোমাকে ডিঙ্গাইয়া চলিতে হয়!.. কোন বিস্মৃত অতীতে তোমারই জন্য তো প্রথম শৃঙ্খল রচিত হইয়াছিল, কারাগার তো শুধু তোমাকে মনে করিয়াই নির্মিত হইয়াছিল, সেই তো তোমার গৌরব! তোমাকে অবহেলা করিবে সাধ্য কার? এই যে অগণিত প্রহরী, এই যে বিপুল সৈন্যভার সে তো কেবল তোমারই জন্য! দুঃখের দুঃসহ গুরুভার বহিতে তুমি পারো বলিয়াই তো ভগবান এতোবড় বোঝা তোমারই স্কন্ধে অর্পণ করিয়াছেন। মুক্তি পথের অগ্রদূত, হে পরাধীন দেশের রাজবিদ্রোহী, তোমাকে শতকোটি নমস্কার!’
সুভাষচন্দ্র মুখ্যত কর্মবীর; তাঁর প্রতিভার চরম নিদর্শন আশ্চর্য কর্মকুশলতা। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি স্বামী বিবেকানন্দকে অনুসরণ করতেন। কৈশোরে নিজের আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে বিবেকানন্দ প্রাপ্তির আনন্দকে প্রতিটি ছত্রে ছত্রে ফুটিয়ে তুলেছিলেন— ‘একদিন দৈবক্রমে এমন একটি জিনিস হাতে পড়ল, যা সংকটকালে প্রধান সহায়ক হয়ে দাঁড়াল।… নজরে পড়ল স্বামী বিবেকানন্দের রচনাবলি। কয়েকটি পৃষ্ঠা উল্টেই বুঝলাম, এতে এমন কিছু আছে যা এতদিন ধরে খুঁজছি।… বইগুলি বাড়িতে নিয়ে এসে গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। মজ্জাবধি শিহরণ বয়ে গেল।… সমগ্র সত্তাকে উৎসর্গ করতে পারি, এমন বস্তু বিবেকানন্দ এনে দিলেন।… আমার মধ্যে শুরু হয়ে গেল বিপ্লব।’
সুভাষচন্দ্রের সমগ্র জীবন, কর্ম ও সাধনার মুলে আছে ঈশ্বরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সব কাজকেই তিনি ঈশ্বরের কাজ বলে ভাবতেন। দেশের কাজ যে ঈশ্বরেরই নির্দেশিত কাজ, এ কথা তিনি প্রবলভাবে বিশ্বাস করতেন। সুভাষচন্দ্রের মধ্যে যে ত্যাগ, সাহসিকতা, সেবাপরায়নতা, দেশপ্রেম এবং সর্বোপরি যে আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল তার মূলে আছে শ্রী রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের সুমহান আদর্শ। স্বামীজির মতো সুভাষচন্দ্রও আমাদের দেশে ধর্মের নামে যে শোষণ, অন্যায় ও পাপাচার হচ্ছে তার তীব্র নিন্দা করেছেন এবং অন্তর দিয়ে ভারতবর্ষের কল্যাণ কামনা করে নিজেকে ভারতমাতার চরণে সম্পূর্ণভাবে নিবেদন করেছেন। জননী জন্মভূমির সেবাকেই সুভাষচন্দ্র সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন।
শৈশবে সুভাষচন্দ্রের অন্তরে যিনি প্রকৃত দেশপ্রেম, সৌন্দর্যচেতনা ও নীতিবোধ জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি কটকের রাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাস। সুভাষচন্দ্রের জীবনের প্রথম প্রেরণাদাতা তিনিই। বেণীমাধব ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের প্রাণপুরুষ কেশবচন্দ্র সেনের শিষ্য ও ভক্ত। এই বেণীমাধব দাসই সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন বিপ্লবী হেমন্তকুমার সরকারের। যাঁর সান্নিধ্যে এসেই সুভাষচন্দ্র বিভিন্ন রাজনৈতিক ও বিপ্লবী দল সম্পর্কে বিশদ তথ্য পান।
সুভাষচন্দ্র তাঁর ‘ভারত পথিক’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘প্রথম রাজনৈতিক প্রেরণা লাভ করি ১৯১২ সালে, প্রায় আমারই সমবয়সী এক ছাত্রের কাছ থেকে। সে কটক ও পুরী বেড়াতে এসেছিল, প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাস আমাদের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আসবার আগে সে কলকাতার একটি বিশেষ দলের সঙ্গে (দলের নেতা সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) জড়িত ছিল। যার নিজস্ব আদর্শ ছিল আধ্যাত্মিক উন্নতি ও গঠনমূলক কাজের মধ্য দিয়ে জাতির সেবা। যখন আমার মন জাতীয় ও সামাজিক সমস্যাগুলির দিকে ফিরতে শুরু করেছিল, সেই সময়েই কটকে তার আগমন হয়।’
পরবর্তী সময়ে, হেমন্তকুমার সরকার সুভাষচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোগী হয়ে ওঠেন। উল্লেখ্য, হেমন্তকুমার সরকার নিজের লেখাগুলিতে দাবি করেছিলেন, বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্রের মৃত্যুর খবর ভুল ছিল এবং আশাপ্রকাশ করেছিলেন সুভাষ শীঘ্রই ভারতে ফিরে আসবেন। সুভাষচন্দ্র ফিরে আসেননি। অবশ্য তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে পরবর্তী সময়েও কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি।
১৯১৩ সালে রাভেনশ কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সুভাষচন্দ্র ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। ওই কলেজের অধ্যাপক ওটেন সাহেব ক্লাস করার সময় ভারতীয় ছাত্রদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করলে সুভাষচন্দ্রের দেশপ্রেমিক সত্তায় আঘাত লাগে। এর প্রতিবাদে সুভাষ ও তাঁর সঙ্গীরা ওটেন সাহেবকে আক্রমণ করেন এবং তাঁকে মন্তব্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেন। এই ঘটনার জেরে সুভাষচন্দ্র বসুকে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান এবং সেখান থেকেই ১৯১৯ সালে দর্শন শাস্ত্রে অনার্সসহ বিএ পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হন। পরে এমএ ক্লাসে ভর্তি হলেও সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। কিন্তু ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি করার মতো ইচ্ছে তাঁর ছিল না। পরাধীন ভারতকে স্বাধীন করার স্বপ্নে সর্বদা বিভোর হয়ে থাকতেন তিনি।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি ছিলেন আপসহীন নিরলস যোদ্ধা। তাঁর জীবন ও কর্মের একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশের স্বাধীনতা। তার জন্য যে কোনও ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে তিনি কুন্ঠাবোধ করেননি। দেশসেবার আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভারতের মুক্তি সংগ্রামে অবশেষে যুক্ত করলেন নিজেকে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন হয়ে উঠলেন তাঁর রাজনৈতিক গুরু। বলাবাহুল্য, দীর্ঘসময় দেশবন্ধুর সান্নিধ্যে থেকে সুভাষচন্দ্র সঞ্চয় করেছিলেন প্রচুর জ্ঞান, কাজ করার উদ্দীপনা ও আগ্রহ। এই সময়ে গান্ধীজির সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে সুভাষচন্দ্র কারারুদ্ধ হন।
১৯৩০ সালের ২২ আগস্ট কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে সুভাষচন্দ্র সমাজের মানুষের জন্য ব্যাপক পরিষেবা দেন। তাঁর বিপুল কর্মপ্রেরণা ও আদর্শে কর্পোরেশন সেবা ও রাজনৈতিক সংগ্রামের এক সমম্বয় কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯৩৮ এবং ১৯৩৯ সালে দু’বার কংগ্রেস সভাপতি হয়েও কংগ্রেস সদস্যদের আচরণ সুভাষচন্দ্রের পছন্দ না হওয়ায় তিনি দল ত্যাগ করে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ নামে নতুন একটি দল গঠন করেন। ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেলে সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে দেশের স্বাধীনতা আনতে চাইলেন কিন্তু ‘হলওয়েল মনুমেন্ট’ অপসারণ আন্দোলনের জন্য এই সময়েই (১৯৪০) সুভাষচন্দ্রকে গ্রেফতার করা হয়।
সরকারের কাছে এক ঐতিহাসিক পত্র দিয়ে মুক্তির দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন তিনি। অবশেষে বাধ্য হয়ে ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেন সুভাষচন্দ্রকে তাঁর এলগিন রোডের বাড়িতে নজরবন্দি করে রাখা হবে। কিন্তু ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে ১৯৪১ সালে মৌলবী জিয়াউদ্দিনের ছদ্মবেশে তিনি গৃহ হতে নিষ্ক্রান্ত হন। কাবুল হয়ে প্রথমে তিনি জার্মানির বার্লিন এবং পরে সেখান থেকে জাপান পৌঁছন। সেখানে তিনি রাসবিহারী বসুর অনুরোধে এবং মোহন সিং-এর সহযোগিতায় প্রবাসী ভারতীদের সংগঠিত করে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠন করেন এবং নিজে তার নেতৃত্ব দেন। জনগণের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘নেতাজি’ নামে।
এই মুক্তিকামী সৈন্যদের উদ্দেশে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো।’ সৈন্যবাহিনী সমেত সুভাষচন্দ্র ভারতের পথে অগ্রসর হলেন। তাঁর ফৌজ স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছে শেষপর্যন্ত তাঁর ফৌজ পরাজিত হল। পরাজিত হলেও নতুন আশা নিয়ে সুভাষচন্দ্র পুনরায় জাপানের পথের রওনা হন। এই সময়ে তিনি বলেন, ‘… কোনও অবস্থাতেই পরাজয় মেনে নিতে আমি রাজি নই। ইম্ফলের মাটিতে, আরাকানের পাহাড়ে, জঙ্গলে, বার্মার তৈলখনি অঞ্চলে শত্রুর বিরুদ্ধে যে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম আমরা করেছি, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’
১৯৪৫ সালের ২৩ আগস্ট জাপান বেতার থেকে ঘোষণা করা হয়, সিঙ্গাপুর থেকে টোকিও যাওয়ার পথে তাইহোকু বিমানবন্দরে নেতাজির বিমানখানি ভেঙে পড়ে এবং সেই দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান। নেতাজির মৃত্যুর বিষয়টি আজও রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর সংগ্রামী জীবন ও আদর্শ আজও বেঁচে আছে এবং চিরদিন থাকবে।




