খেলা

দেড় লক্ষ মানুষের দেশ কুরাসাও খেলবে বিশ্বকাপ, ভারত হারে বাংলাদেশের কাছে

জয়ন্ত চক্রবর্তী: সাড়ে পাঁচ লক্ষ নাগরিক যে দেশের, সেই কেপ ভারদে বিশ্বকাপ ফুটবলের মূলপর্বে জায়গা পাওয়ার পর কুরাসাও বিশ্ব ফুটবলে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কুরাসার জনসংখ্যা মোট দেড় লক্ষ। ভারতের যে কোনও জেলাতে এর থেক বেশি লোক বাস করে। এটা ঠিক যে এবারের বিশ্ব ফুটবলে যোগদানকারী দেশের সংখ্যা ৪৮ হওয়ায় অনেক দেশই বিশ্বকাপে যোগদানের সুযোগ পাচ্ছে, যাদের কাছে বিশ্বকাপে খেলাটা স্বপ্ন ছিল। কেপ ভারদে, কুরাসা কিংবা হাইতিও বিশ্বকাপ খেলবে। আর আমাদের একশো চল্লিশ কোটি মানুষের দেশ এশিয়ান কাপের বাছাই পর্বের খেলায় গ্রুপে শেষ স্থানটি পাচ্ছে বাংলাদেশের কাছে হেরে। বাইশ বছর পরে বাংলাদেশের কাছে হার। কাফা কাপের সাফল্যের ১৩ বছর পরে ভারতীয় দলের কোচ খালিদ জামিল সম্পর্কে যে আশা জেগেছিল, তা হাতে ফস্কে কাচের বাসন পড়ার মতোই চুরচুর করে ভেঙে পড়ছে। জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচ গৌতম গম্ভীরের মতো খালিদ জামিল ভাগ্যিস বলেননি যে খেলোয়াড়দের টেম্পারামেন্ট পাল্টাতে হবে! আসলে খালিদ জামিল জানেন যে তাঁর বলার কিছুই নেই। কোনও কৈফিয়তই যথেষ্ট হতে পারে না এই ট্রপিজের তার থেকে আছাড় খাওয়ার। তিনি একথাও বলতে পারবেন না ভারতীয় ফুটবল কর্তারা আইএসএল হওয়া আর না হওয়া নিয়ে এত ব্যস্ত যে তাঁদের পক্ষে জাতীয় দলের দেখভাল করাটাও সম্ভব হয়নি।

রবিবার ১৬ নভেম্বর আইএফএ-এর চেয়ারম্যান সুব্রত দত্ত যিনি একদা ফুটবল ফেডারেশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তিনি একটি অতি অপ্রিয় সত্যি কথা আইএফএ-এর পুরস্কার বিতরণী সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলে ফেলেছেন, ভারতীয় ফুটবল আজ আর বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। দেশের সর্বোচ্চ লিগ আইএসএল-এর জন্যে স্পনসর পাওয়া যায় না। এই যে ফুটবল আজ খাবি খাচ্ছে তার দায় অস্বীকার করতে পারেন না দেশের নির্বাচিত ফুটবল কর্তারা। তাঁরা দায়বদ্ধ দেশের ফুটবল অনুরাগীদের কাছে। এই দায় তাঁরা অস্বীকার করতে পারেন না। ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি এখন বিজেপি নেতা বঙ্গসন্তান কল্যাণ চৌবে। একদা নামি এই গোলকিপার বাইচুং ভুটিয়ার সঙ্গে ঝগড়া করতে, ফুটবল ফেডারেশনের পয়সায় দেশ-বিদেশ বেড়াতে কিংবা ফেডারেশনের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার কাজে যতটা সক্রিয় ততটা ফুটবল উন্নয়নে নন। বাইচুং ভুটিয়াও যে ধোয়া তুলসিপাতা নন তা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। নিজের বাণিজ্যিক স্বার্থকেই তিনি যে সবার ওপরে রাখেন তা একটা শিশুও বলে দিতে পারবে। কাচের ঘরে বসে অন্যকে ঢিল মারার অভ্যাস বাইচুং যতদিন না ত্যাগ করবেন ভারতীয় ফুটবল এক ইঞ্চিও এগোবে না। তবে, এগুলো অন্য প্রসঙ্গ। এই লেখাতে এর অবতারণা না করাটাই শ্রেয়। আইএসএল গভীর গাড্ডায়। ফেডারেশন আইএসএল-এ স্পনসর হওয়ার যে দরপত্র বাজারে ছেড়েছিল তাতে কেউ সাড়া দেয়নি। কোনও কর্পোরেট সংস্থা এগিয়ে আসেনি দেশের সেরা লিগ স্পনসর করতে। সুব্রত দত্ত ঠিকই বলেছেন যে ভারতীয় ফুটবল আজ আর বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়! আইএসএল এতদিন পর্যন্ত করতো রিলায়েন্স গোষ্ঠীর সংস্থা এফএসডিএল বা ফুটবল স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড। ফেডারেশন এফএসডিএল-এর কাছে থেকে বিশাল অর্থের গ্যারান্টি মানি চায়। যা দিতে অস্বীকার করে এফএসডিএল। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট আইএসএল না হওয়া প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, এআইএফএফ-এর এত লোভ কেন? আইএসএল সম্পর্কে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি সুপ্রিম কোর্টও। তাদের অবশ্য তা দেওয়ার কথাও নয়। বিচারপতি টি নাগেশ্বর রাও-এর নেতৃত্বে গড়া একটি বেঞ্চে মামলা চলছে আইএফএর সংবিধানিক বৈধতা নিয়ে। সুপ্রিম কোর্ট নিজেদের এক্তিয়ার সম্পর্কে সচেতন। নাগেশ্বর রাও-এর নেতৃত্বে গড়া বেঞ্চ ‘পাসিং রিমার্ক’ ছাড়া এআইএফএফ-এর কোনও বিষয়ে নাক গলায়নি।

এই যে ক্লাবগুলির আইএসএল খেলা নিয়ে অনিচয়তায়, খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে সেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্যে এআইএফএফ-কে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল ক্লাবগুলির সঙ্গে বসে একটি আলোচনা করতে। এই মর্মে গত মঙ্গলবার এআইএফএফ একটি সভায় আহ্বান জানিয়েছিল আইএসএল খেলা ক্লাবগুলিকে। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল সহ দেশের বহু অগ্রণী ক্লাব এই বৈঠকে ছিল না। কারণ তারা মনে করে যে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলায় এই এআইএফএফ-এর কোনও এক্তিয়ার নেই আইএসএল নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। মামলা- মোকদ্দমায় জর্জরিত এআইএফএফ কী নিজেদের সব পুরোনো ইগো ভুলে এফএসডিএল-এর দ্বারস্থ হবে আইএসএল করার জন্যে? একমাত্র সময় এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে। ততদিন আমাদের বিশ্বকাপে কেপ ভারদে, কুরাসা কিংবা হাইতির খেলা দেখে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। অন্তত একটি জিনিস তো প্রমাণ হবে, আমরা এক কোটি চল্লিশ লক্ষের দেশ ফুটবলে খেলতে না পারি, কিন্তু ফুটবলের সেরা দর্শক তো হতে পারি!