Bolpur Kali: বোলপুরে ৫০০ বছরের পুরনো কালীপুজো! আজও অমাবস্যার রাতে মন্ত্রসাধকের ডাক শোনেন দেবী
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পুজো আয়োজন করে আসছেন গ্রামের ভট্টাচার্য পরিবার। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, এই কালীপুজো শুধুমাত্র পূজো নয়, এটি হল এক অমর সাধনার প্রতিফলন, যা শুরু করেছিলেন প্রায় পাঁচশো বছর আগে এক তান্ত্রিক — বলভদ্র গোস্বামী
সৌতিক চক্রবর্তী: বোলপুরের শান্ত, লালমাটির প্রান্তরে এক রাতে যেন জেগে ওঠে ভয় আর ভক্তির মিশেল। বাতাসে ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খের ধ্বনি আর চন্দনের গন্ধে মিশে থাকে এক রহস্যময় অনুভূতি। এ যেন সাধারণ কোনো কালীপুজো নয় — এটি হল প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো বলভদ্র কালীপুজো, যেখানে দেবী কালীকে পূজা করা হয় তান্ত্রিক আচার অনুযায়ী, এবং যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অলৌকিক ইতিহাস, এক তান্ত্রিকের আত্মার কাহিনি। এই ঐতিহ্যবাহী পুজোটি অনুষ্ঠিত হয় বীরভূম জেলার বোলপুরের গোয়ালপাড়া গ্রামে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পুজো আয়োজন করে আসছেন গ্রামের ভট্টাচার্য পরিবার। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, এই কালীপুজো শুধুমাত্র পূজো নয়, এটি হল এক অমর সাধনার প্রতিফলন, যা শুরু করেছিলেন প্রায় পাঁচশো বছর আগে এক তান্ত্রিক — বলভদ্র গোস্বামী (Bolpur Kali)।
গ্রামের প্রবীণদের মুখে মুখে এখনো ঘোরে গল্পটি। বহু বছর আগে, যখন কোপাই নদী ছিল গ্রামের প্রাণ, তখন তার তীরে এক বিশাল শেওড়া গাছের তলায় দিনরাত সাধনা করতেন বলভদ্র গোস্বামী। বলা হয়, তিনি তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে দেবী কালীকে আহ্বান করার চেষ্টা করতেন। এক অমাবস্যার রাতে, তাঁর কঠোর তপস্যায় নাকি দেবী স্বয়ং আবির্ভূত হন। সেদিন থেকেই শুরু হয় এই পুজোর যাত্রা — নাম রাখা হয় “বলভদ্র কালীপুজো।” তান্ত্রিকের এই পুজোকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কালীমন্ত্র, ভয় ও শ্রদ্ধার মিশ্র বিশ্বাস। কিন্তু বলভদ্রের জীবনের শেষপ্রান্তে ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা — অসুস্থ অবস্থায় তিনি ঘোষণা করেন, “আমার শরীর যেন দেবীর পাদপীঠেই সমাধিস্ত হয়, ১০৮ মড়ার খুলির নিচে।”
বলভদ্র গোস্বামীর মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর শিষ্য ও গ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষ কাশীনাথ ভট্টাচার্যের হাতে পুজোর দায়িত্ব তুলে দেন। কাশীনাথবাবু তখন আর্থিকভাবে দুর্বল ছিলেন। তাই তিনি এই বিশাল তান্ত্রিক পুজো চালিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন। কিন্তু কথিত আছে, মৃত্যুর আগে বলভদ্র তাঁকে আশীর্বাদ দিয়ে যান — “মা নিজেই পথ দেখাবেন।” সেই আশীর্বাদ যেন সত্যি হয়। গ্রামের এক মহিলা, থাকুমনি বন্দ্যোপাধ্যায়, নিজের ৯ বিঘা জমি দান করেন পুজোর জন্য। সেই জমিতেই শুরু হয় বলভদ্র কালীপুজোর মহোৎসব। ধীরে ধীরে পুজো ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের গ্রামেও। প্রথমদিকে এই পুজো হত কোপাই নদীর ধারে, সেই শেওড়া গাছের নিচে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নদী বদলে যায়, গাছটি হারিয়ে যায় ঝড়ে, আর পুজো স্থানান্তরিত হয় গোয়ালপাড়া গ্রামের বটতলায়। বর্তমানে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয় গ্রামের কালিদাস সরকারের দেওয়া জমিতে (Bolpur Kali)।
এখনও ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যরা সেই প্রাচীন তান্ত্রিক রীতিনীতি মেনেই পুজো পরিচালনা করেন। পূজোর আগে শুদ্ধাচার, গোপনে মন্ত্রপাঠ, আর গভীর রাতে হোমযজ্ঞ—সবকিছুতেই যেন সেই ৫০০ বছরের ঐতিহ্যের ছাপ। প্রতিবছর কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় এই ঐতিহাসিক পুজো। ওই রাতে গোয়ালপাড়ার আকাশে যেন অন্য এক আবহ তৈরি হয়। ভক্তরা বলেন, মন্দিরের আশপাশে তখন হালকা কুয়াশার মধ্যে কেউ একজন নাকি ঘোরে—মন্ত্রসাধকের পোশাক পরা এক ছায়ামূর্তি। কেউ বলেন, তিনি আর কেউ নন, তান্ত্রিক বলভদ্র গোস্বামী। বৃদ্ধ তারকনাথ ভট্টাচার্য , যিনি এই পুজোর পুরোনো পুরোহিত পরিবারভুক্ত, বলেন— “আমরা ছোটোবেলা থেকেই শুনে আসছি, অমাবস্যার রাতে যখন দেবী আরাধনা হয়, তখন মন্দিরের পেছনে কেউ নাকি ধীরে ধীরে মন্ত্র পড়ে যায়। ঢাক বাজলে সেই আওয়াজ থেমে যায়, আবার ফিরে আসে। এটা নাকি বলভদ্র গোস্বামীর আত্মা—যিনি আজও মন্ত্রসাধকের ডাক শুনতে পান (Bolpur Kali)।”
আজও পুজোর সময় গ্রামের মানুষ ভয়ে যেমন কাঁপে, তেমনি ভক্তিতেও ভরে ওঠে তাদের হৃদয়। কেউ মন্ত্রজপ করেন, কেউ নৈবেদ্য দেন, কেউ দূর থেকে চুপচাপ প্রণাম করে ফিরে যান। গ্রামের মেয়েরা বলেন, “এই পুজোর রাতে কেউ বাইরে বেরোয় না। কিন্তু সকলে জানে, মা আমাদের রক্ষা করেন।” বলভদ্র কালীপুজো তাই আজও বীরভূমের এক অনন্য ঐতিহ্য। এখানে ভক্তি আর ভয়ের মাঝেই যেন মিশে আছে ইতিহাস, তন্ত্রসাধনা, আর লোকবিশ্বাসের গভীর রহস্য। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে প্রজন্ম, বদলেছে গ্রাম, কিন্তু বদলায়নি এই পুজোর মাহাত্ম্য। ৫০০ বছর আগের সেই তান্ত্রিক বলভদ্র গোস্বামীর সাধনা আজও যেন প্রতিটি ঢাকের আওয়াজে, প্রতিটি প্রদীপের আলোয় ফিরে আসে। ভয় আর ভক্তির এই অনন্য মেলবন্ধনেই আজও টিকে আছে গোয়ালপাড়ার “বলভদ্র কালীপুজো”, যেখানে স্থানীয়দের বিশ্বাস—দেবী আজও শোনেন মন্ত্রসাধকের ডাক (Bolpur Kali)।






