Romantic Pair: ‘রোমান্টিক জুটি’, উত্তম-সুচিত্রার পর বাঙালির মননে প্রেম জাগিয়ে ছিলেন এঁরাই
After Uttam-Suchitra, Tapas Pal and Mahua Roychoudhury became Bengali cinema’s beloved romantic pair.
বিকাশ ঘোষ: ২৪ জুলাই ১৯৮০। চলচ্চিত্র জগৎকে শূন্য করে ইহলোকে পাড়ি দিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার (Romantic Pair)। বাংলা চলচ্চিত্র অভিভাবক হীন হয়ে পড়ল। কে ধরবে টলিউডের হাল? উত্তম-সুচিত্রা জুটির সেই সোনাঝড়া দিন অতীত। বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক জুটির যবনিকা পতন। বাংলা সিনেমামোদী দর্শকেরা বিহ্বল- টলিউডের সর্বত্র শুধুই শূন্যতা। বাঙালি দর্শকের কাছে উত্তম-সুচিত্রা বাদ দিলে সন্ধ্যা-বিশ্বজিৎ জুটি কিছুটা আশা জাগিয়েছিল। তবে সেই উচ্চতায় নয়। স্বাভাবিক ভাবেই প্রযোজক, পরিচালক, সিনেমা নির্মাতাদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। ব্যবসা দেবে কে? বাংলা সিনেমা কি সেই উচ্চতা ধরে রাখতে পারবে?
[আরও পড়ুন: Donald Trump: ‘প্যাট্রিয়ট’ দেওয়ার পর এবার পুতিনকে হুমকি ট্রাম্পের: যুদ্ধ না থামালে বড় শাস্তি!]
উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর যখন টলিউডে এই শূন্যতা তৈরি হয়েছে ঠিক সেই সময় মুক্তি পেল ‘দাদার কীর্তি’। সালটা ১৯৮০। এক নবাগত নায়কের বিপরীতে টলিউডের জনপ্রিয় ব্যস্ততম অভিনেত্রী মহুয়া রায় চৌধুরী। সিনেমাটি সুপার-ডুপার হিট। এই ছবির জুটিকে বাঙালি দর্শকেরা মনের মনিকোঠায় জায়গা দিলেন। কিছুটা হলেও যেন উত্তম-সুচিত্রা জুটির ছায়া দেখতে পেলেন। পরবর্তীতে এই জুটির একের পর এক সিনেমা মুক্তি পেতে শুরু করে। আর প্রত্যেকটা ছবি নতুন মাত্রা যোগ করতে থাকে। কোথাও প্রেমিক-প্রেমিকা, কোথাও ভাই-বোন আবার কোথাও গ্রামের সাদামাটা দম্পতি। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই জীবন্ত করে তুলেছিলেন সেই চরিত্রগুলিকে।
এই নবাগত নায়ক আর কেউ নন, তিনি ছিলেন তাপস পাল। মহুয়া রায়চৌধুরী এবং তাপস পাল জুটি উত্তমহীন টলিউডকে যেন অক্সিজেন দিতে শুরু করে। উত্তম কুমার চলে যাওয়ার পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল তার কিছুটা হলেও সাপোর্ট দিতে পেরেছিলেন তাপস-মহুয়া। ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দাদার কীর্তি’ বাংলা সিনেমায় নতুন জুটির জন্ম দেয়। তাদের পরের ছবি ছিল ‘সাহেব’। এই ছবিতে অবশ্য তারা প্রেমিক-প্রেমিকা নন, ভাই-বোন। বাংলা সিনেমায় এক মাইলস্টোন এই ‘সাহেব’। এই ‘সাহেব’ ছবি তৈরীর অনেক অজানা গল্প রয়েছে। আজ ‘চেনা বাংলার অজানা কথা’য় তুলে ধরব সেই গল্প। এই ‘সাহেব’ ছবিতে উত্তম কুমারের অভিনয় করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি অভিনয় করেননি। সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত। সাহেবের বাবার চরিত্রে (Romantic Pair)।
১৯৮১ সালের ২ অক্টোবর মুক্তি পেয়েছিল সকলের ভালবাসার এই ছবি। ‘সাহেব’ এমন একটি ছবি, যা দাগ কেটে গিয়েছিল সমকালীন বাঙালি জীবনে। একেবারেই মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরের লড়াইয়ের কাহিনী। বিজয় বসু পরিচালিত, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সুরে ‘সাহেব’ ছবির প্রত্যেকটি গান মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। আর অভিনয় এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছিল যে, যেন কোন অভিনয় নয়, সাধারণ এক পরিবারের সত্যিকার জীবনযাত্রা। অভিনয়-এর দিক থেকে ছিলেন, উৎপল দত্ত, মহুয়া রায় চৌধুরী, তাপস পাল, মাধবী চ্যাটার্জি, রত্না ঘোষাল প্রমুখ।
শোনা যায় ‘দাদার কীর্তি’ সুপার হিট হওয়ার পর তাপস পালের হাতে কোন ছবি ছিল না। টানা একবছর চন্দননগর বাড়িতে বসা। পড়াশোনা আবার এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন। হঠাৎ তার কাছে আসে সাহেব ছবির অফার। আবার তাপস পাল টালিগঞ্জ মুখী হন। এই অফার পাওয়ার নেপথ্যেও রয়েছে এক গল্প। সাহেব এর প্রযোজক ছিলেন মহুয়া রায় চৌধুরীর স্বামী তিলক চক্রবর্তীর ভাই অলোক চক্রবর্তী। সাহেব এর চরিত্রের জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন। যেরকম একটা ফেস দরকার সেরকম কাউকে পাচ্ছিলেন না। তখন ওই চরিত্রে তাপস পালের নাম সাজেস্ট করেন মহুয়া। দাদার কীর্তি ছবিতে একসাথে কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই তাপসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন মহুয়া। সেই সময়ের ব্যস্ততম নায়িকা মহুয়ার সুপারিশে জীবনের দ্বিতীয় ছবিতে কাজের সুযোগ পান তাপস।
এই ছবিতে অভিনয়ের দরুন চন্দননগর-কলকাতা ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করতে হতো তাপসকে। ছবির শুটিং করতে তাপস পাল প্রতিদিন চন্দননগর থেকে কলকাতা আসতেন। ছবির প্রযোজক তাপস পালকে কলকাতার গোলপার্কের কাছে সপ্তর্ষি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। শ্যুটিং কিছুদিন চলার পর ছবির পরিচালক তাপস পালকে তার বাড়িতে নিয়ে রাখেন। এবং এইভাবে যাযাবর এর মত দিন কাটিয়ে সাহেব ছবির শুটিং শেষ করেন তাপস পাল (Romantic Pair)।
সাহেব ছবিতে অভিনয় সুবাদে সেই বছর সেরা অভিনেতা ফিল্মফেয়ার (আঞ্চলিক) পুরস্কার পান তাপস পাল। এই ছবির জন্য তাপস পাল জাতীয় পুরস্কারেও নমিনেশন পেয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র তিন ভোট হেরে যেতে হয়েছিল তাঁকে।
তাপস ও মহুয়া জুটির এই ছবি মাইলফলক ছুঁয়ে যায়। পরবর্তীতে একের পর এক ছবি হিট করতে থাকে। এই জুটির আরও একটি সুপার-ডুপার হিট ছবির নাম ‘অনুরাগের ছোঁয়া’। নিটোল প্রেমের ছবি। প্রত্যেকটা গান তখন মুখে মুখে। ‘গুন গুন করে মন’, ‘আমি যে কে তোমার’ গানে নতুন প্রজন্ম তখন নব উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। উত্তম-সুচিত্রা পরবর্তীতে তারা যেন পেয়ে গিয়েছেন আরও এক নতুন রোমান্টিক জুটিকে।
[আরও পড়ুন: Yash Dayal: ‘পাঁচ বছর ধরে বোকা বানানো যায় না’, যশের গ্রেফতারি স্থগিত আদালতে]
দাদার কীর্তি, সাহেব, অনুরাগের ছোঁয়ার পাশাপাশি আশীর্বাদ, কেনারাম বেচারাম, যোগ বিয়োগ, পারাবত প্রিয়া, সন্ধ্যা প্রদীপ একের পর এক হিট ছবি উপহার দিয়ে চলেছেন এই জুটি। বাংলা সিনেমায় রোমান্টিক জুটির যে শূন্যতা পূরণ করতে বাঙালি দর্শকদের মনে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে তাপস-মহুয়া জুটি তখনই ঘটল বিপর্যয়। সালটা ১৯৮৫। অগ্নিদগ্ধ হয়ে অস্বাভাবিক মৃত্যু হল টলিউডের সুন্দরী লাস্যময়ী নায়িকার। সেই সময়ের এক বিনোদনমূলক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহুয়া চেয়েছিলেন তাঁর অগ্নিদগ্ধ চেহারা যেন কেউ না দেখেন। তাই পরিবারের লোক ছাড়া হাসপাতালের ঘরে কারও ঢোকা নিষেধ ছিল (Romantic Pair)।
সেই সময় মহুয়া ও তাপস পালের একের পর এক ছবি সুপারহিট। ফিল্মবোদ্ধারা মনে করতেন মহুয়া-তাপস জুটি টলিউডে রেকর্ড সৃষ্টি করবে। কিন্তু মহুয়ার এমন পরিণতিতে তাল কাটল। তাপস পালও মহুয়াকে দেখতে গিয়েছিলেন। বিছানায় শুয়ে মহুয়া সেটা জানতেও পেরেছিলেন। কিন্তু প্রিয় নায়িকাকে শেষদেখা হয়নি নায়কের। জানা যায়, ক্যালকাটা হাসপাতালের সামনে অনেকক্ষণ অপেক্ষাও করছিলেন তাপস। তারপর এল সেই দিন। ২২ জুলাই। সালটা ১৯৮৫। সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন টলিউডের ‘সোনার প্রতিমা’ মহুয়া (Romantic Pair)।






