কলকাতা

দীপান্বিতা অমাবস্যায় খড়দহে শ্যামা সাজে শ্যামসুন্দর

দুপুরের মধ্যে সাজ সম্পূর্ণ হলে সন্ধ্যায় ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হবে মন্দিরের দ্বার।

সৃজিতা মল্লিক: দীপান্বিতা অমাবস্যার পবিত্র রাতে রাজ্যজুড়ে দেবী কালী পুজোর আরাধনা হয়। আর ঠিক তখনই খড়দহের শ্রীপাদে পালিত হয়—শ্যামা সাজে শ্যামসুন্দর। চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও অব্যাহত। কালীপুজোর সকাল থেকেই শুরু হবে শ্যামসুন্দরের সজ্জা পর্ব। দুপুরের মধ্যে সাজ সম্পূর্ণ হলে সন্ধ্যায় ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হবে মন্দিরের দ্বার।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—কেন এই ব্যতিক্রম? দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালী পুজোর মধ্যেই কেন শ্যামসুন্দরকে সাজানো হয় শ্যামা রূপে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বহু পুরোনো পুরাণকথায়, যা আমাদের নিয়ে যায় ত্রেতা যুগে।পুরাণ অনুযায়ী, ঋষি আয়ান নারায়ণ দর্শনের উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা করেন। তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে নারায়ণ তাঁকে বর চাওয়ার সুযোগ দেন। আয়ান তখন লক্ষ্মীদেবীকে স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। নারায়ণ প্রতিশ্রুতি দেন, দ্বাপর যুগে লক্ষ্মী রাধিকা রূপে জন্মাবেন এবং আয়ানও ক্লীবরূপে জন্ম নিয়ে রাধিকাকে স্ত্রী হিসেবে পাবেন। দ্বাপর যুগে সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়।

নারায়ণের আশীর্বাদে এক সময় কালী ভক্ত আয়ানের সঙ্গে বিয়ে হয় রাধিকার। একদিন বনে কৃষ্ণের সঙ্গে রাধিকাকে দেখে আয়ান ক্ষিপ্ত হয়ে সেখানে ছুটে যান। পরিস্থিতি বুঝে কৃষ্ণ তখন কালী রূপ ধারণ করেন। সেই রূপ দেখে রাধিকা দেবী কালীর পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দেন। মুহূর্তেই আয়ানের ক্রোধ গলে যায়। পরে তিনি বোন কুটিলাকে ভুল বোঝানোর জন্য ধমকও দেন। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই আয়ানের মৃত্যু হয়। এরপর এই ঘটনাকে স্মরণে রেখেই খড়দহের শ্রীপাদে প্রতি দীপান্বিতা অমাবস্যায় শ্যামা সাজেন শ্যামসুন্দর—যেন কৃষ্ণের সেই কালী রূপকে পুনরুজ্জীবিত করা। এই অভিনব দৃশ্য দেখার জন্য দূর- দুরান্ত থেকে ছুটে আসেন ভক্তেরা।

খড়দহের এই শ্যামসুন্দরের মন্দিরও নিজেই ইতিহাস বহন করে। ১৫২২ খ্রিস্টাব্দে শ্রী চৈতন্য দেবের পার্ষদ নিত্যানন্দ মহাপ্রভু নবদ্বীপ ত্যাগ করে খড়দহে আসেন ও সেখানেই স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। পুরন্দর পণ্ডিতের দান করা ২৬ বিঘা জমিতে তাঁর পুত্র বীরভদ্র মহাপ্রভু প্রতিষ্ঠা করেন শ্যামসুন্দরের মন্দির। এই মন্দির প্রাঙ্গণে পদধুলি পড়েছে শ্রী রামকৃষ্ণ, মা সারদার মত বহু মনীষীদের। প্রতিদিন নিত্য পূজা, রীতি ও এই শ্যামা সজ্জার প্রথা আজও অবিচলভাবে চলেছে খড়দহের শ্রীপাদে—ভক্তির, ঐতিহ্যের আর এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে।

Related Articles