অবশেষে বাংলা পেতে চলেছে নিজস্ব অ্যান্টি-ভেনম সিরাম
১০ নভেম্বরের মধ্যে চুক্তিপত্র চূড়ান্ত করে জমা দিতে বলা হয়েছে সংস্থা দু’টিকে।
Truth Of Bengal: দীর্ঘ অবেক্ষার অবসান, বাংলা পেতে চলেছে নিজস্ব অ্যান্টি-ভেনম সিরাম। বিষ সংগ্রহের জন্য আগেই একটি সংস্থাকে বরাত দেওয়া হয়েছে এবং এবার সেই বিষ থেকে এভিএস তৈরির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হলো দু’টি সংস্থাকে। ১০ নভেম্বরের মধ্যে চুক্তিপত্র চূড়ান্ত করে জমা দিতে বলা হয়েছে সংস্থা দু’টিকে। এরপরই শুরু হবে এভিএস তৈরির কাজ।
বিষ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হবে ঘোড়ার শরীরে সাপের বিষ প্রবেশ করিয়ে। ঘোড়ার রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি হলে তা থেকে নিয়ম অনুযায়ী এভিএস তৈরি করা হবে। তবে শুধু তরল নয়, পাউডার ফরম্যাটেও এভিএস তৈরি হবে, যা দীর্ঘদিন ফ্রিজ ছাড়াও সংরক্ষণ করা যাবে। ফলে প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক মানুষ উপকৃত হবেন বলে স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে।
বাংলায় ব্যবহৃত পলিভ্যালেন্ট এভিএস চার প্রজাতির সাপের বিষ থেকে তৈরি হয়। চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার, স্কেলড ভাইপার, স্পেকটাকল কোবরা বা গোখরো এবং কমন ক্রেট বা কালাচ এই চারটি সাপের বিষ মিশিয়ে তৈরি করা হয় এ ভেনম সিরাম। অর্থাৎ এই একটাই ওষুধ চার প্রজাতির সাপের দংশনে কার্যকর হবে। তবে একটি সমস্যা হল, এই ফরমুলায় রয়েছে ‘স্কেলড ভাইপার’, যেটি বাংলায় নেই। তাই সাপটির বিষ বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
প্রাথমিকভাবে ‘স্কেলড ভাইপার’ বাদ দিয়ে মনোক্লেড কোবরা বা কেউটের বিষ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব উঠেছিল। কিন্তু এতে ফরমুলেশন পরিবর্তন হওয়ায় নতুন করে দীর্ঘ সময়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন হবে। এতে সাত থেকে আট বছর সময় লাগার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি, যাতে দ্রুত বাংলায় নিজস্ব এভিএস পাওয়া যায়।
রাজ্যে দীর্ঘদিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নিয়ে কাজ করছে ‘অ্যাভয়েডেবল ডেথ নেটওয়ার্ক’। সংগঠনের আঞ্চলিক সঞ্চালক স্নেহেন্দু কোনার জানান, বিষ সংগ্রহ থেকে এভিএস তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় কমপক্ষে ১৮ মাস সময় লাগবে। অর্থাৎ সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলা পাবে নিজস্ব এভিএস।
দেশে মোট চারটি সংস্থা অ্যান্টি-ভেনম সিরাম তৈরি করে। রাজ্যের দেওয়া অনুমোদন পেয়েছে তাদের মধ্যে দুটি বেসরকারি সংস্থা। পাউডার এভিএসের দাম নির্ধারিত হয়েছে প্রতি ১০ মিলি ৬৫০ টাকা এবং ইঞ্জেকশনের দাম ৩৯৯.৬০ টাকা। দশ ভায়ালের প্যাক করে রাজ্যের ‘সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোর’-কে সরবরাহ করা হবে।
অ্যান্টি-ভেনম সিরাম তৈরির ক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর মহাবলীপুরম ও আশপাশের জেলা থেকে সাপের বিষ সংগ্রহ করা হয়। এখানকার ল্যাবগুলি থেকে প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলো অ্যান্টিবডি নিয়ে সিরাম তৈরি করে। কিন্তু বাংলার সাপের বিষের প্রোটিন গঠন দক্ষিণ ভারতের থেকে ভিন্ন হওয়ায় পূর্বের এভিএস বাংলার রোগীদের পুরোপুরি কার্যকর ছিল না।
বিষ বিশেষজ্ঞ ও বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যালের অধ্যাপক ডা. সোমনাথ দাস বলেন, এবার তৈরি হবে এমন এভিএস যা বাংলার রোগীদের শরীরে ভালো কাজ করবে। একই কথা জানিয়েছেন স্নেকবাইট ট্রেনিং কর্মসূচির প্রধান চিকিৎসক ডা. দয়ালবন্ধু মজুমদার। তিনি জানান, আগে তামিলনাড়ুর বিষ থেকে তৈরি এভিএস বাংলার চন্দ্রবোড়ার দংশনে কার্যকর ছিল না, অনেক সময় অনেক ভায়াল দিয়েও রোগীর উন্নতি হত না।
পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের ‘সীতাপুর নবীন মানুয়া সৃষ্টি ফাউন্ডেশন’ ও গোমকপোতা গুণধর বিদ্যামন্দির উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন, বাংলার নিজস্ব এভিএসের অভাবে বহু প্রাণহানি হচ্ছে এবং নিজস্ব এভিএস পেলে অনেক রোগী বাঁচানো সম্ভব হবে।
আগে কলকাতার বেঙ্গল কেমিক্যালে এভিএস তৈরি হতো। সেখানকার সম্পূর্ণ পরিকাঠামো ছিল এবং বিষ সংগ্রহেও সহায়তা করতেন সর্পবিশারদ দীপক মিত্র। কিন্তু ২০০৬-২০০৭ অর্থবর্ষে বেঙ্গল কেমিক্যালে এভিএস উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই দশক পর ফের বাংলায় এভিএস তৈরির কাজ শুরু হল।
বাংলার মানুষের জন্য এটি এক বড় স্বস্তির খবর, যার ফলে ভবিষ্যতে সাপের বিষক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় উন্নতি হবে এবং প্রাণহানি কমবে।



