কলকাতা

খুনের মামলার নথি আদালতে পৌঁছল না, জামিন পেলেন অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মন

মাত্র ১ হাজার টাকার বেল বন্ডের বিনিময়ে তাঁর এই নাটকীয় জামিন মঞ্জুর হয়েছে

Truth of Bengal: সল্টলেকের স্বর্ণব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যার বহুল চর্চিত খুন সংক্রান্ত কোনও নথি বা কেস ডায়েরি শেষ পর্যন্ত আদালতে পৌঁছাল না। এমনকি নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে হাজির হলেন না এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তকারী আধিকারিকও (আইও)। ফলত, দীর্ঘ সাত মাস ‘পলাতক’ থাকার পর মত্ত অবস্থায় নিউ টাউনে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েও মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বারাসত আদালত থেকে জামিন পেয়ে গেলেন রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মন। মাত্র ১ হাজার টাকার বেল বন্ডের বিনিময়ে তাঁর এই নাটকীয় জামিন মঞ্জুর হয়েছে, যার পর রাতে তিনি আদালত চত্বর ছেড়ে বেরিয়েও যান। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মূল অভিযুক্ত হাতের নাগালে এলেও পুলিশের এমন চরম উদাসীনতায় রাজ্য জুড়ে এবং ওয়াকিবহাল মহলে তীব্র শোরগোল ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সোমবার রাতে মত্ত অবস্থায় নিউ টাউনের রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে মমতাজুল সেখ নামে এক পথচারীকে সজোরে ধাক্কা মেরেছিলেন অভিযুক্ত বিডিও। গাড়ির অভিঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় ওই পথচারী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই ঘটনার পর সেখানে উপস্থিত এক যুবক প্রতিবাদ জানালে মত্ত বিডিও তাঁর সঙ্গে চরম ‘দাদাগিরি’ শুরু করেন, যার একটি ভিডিও ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যম জুড়ে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, প্রতিবাদী যুবককে তিনি গালিগালাজ করছেন, চড়-থাপ্পড় মারার হুমকি দিচ্ছেন এবং মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও করছেন। এই গুরুতর অপরাধে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে মঙ্গলবার বারাসত জেলা আদালতে তুললেও, স্বর্ণব্যবসায়ী খুনের মামলার মতো বড় অপরাধের কোনও নথি আদালতে পেশ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ট্রাফিক আইনের মামুলি মামলায় রক্ষা পেয়ে যান প্রশান্ত বর্মন।

উল্লেখ্য, পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনের বাসিন্দা তথা সল্টলেক দত্তাবাদের স্বর্ণব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যাকে গত বছরের ২৮ অক্টোবর অপহরণ করে খুন করা হয়েছিল বলে মৃতের পরিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করে। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, ওই ব্যবসায়ীকে নিউ টাউনের একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে খুন করার পর, ২৯ অক্টোবর ফ্ল্যাটের অদূরে যাত্রাগাছি খালপাড় থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এই খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মনের নাম জড়িয়ে পড়ে। বিধাননগর দক্ষিণ থানা থেকে পরবর্তীতে এই মামলার তদন্তভার যায় কমিশনারেটের গোয়েন্দা শাখার হাতে। তদন্তের অগ্রগতির সাথে সাথে পুলিশ ধাপে ধাপে বিডিও ঘনিষ্ঠ মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছিল।

খুনের ঘটনার পর নিজের রাজনৈতিক ‘প্রভাব’ খাটিয়ে তদন্ত চলাকালীনই বারাসত আদালত থেকে আগাম জামিন করিয়ে নিয়েছিলেন প্রশান্ত বর্মন। পরবর্তীতে সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় বিধাননগর কমিশনারেট পুলিশ। হাইকোর্ট তাঁর আগাম জামিন বাতিল করে তাঁকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও তিনি আত্মসমর্পণ না করায় বিধাননগর আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এরপর সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেও দেশের সর্বোচ্চ আদালতও তাঁকে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের কড়া নির্দেশ দিয়েছিল, যা তিনি পাত্তাই দেননি। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিধাননগর মহকুমা আদালতে পেশ করা পুলিশের মূল চার্জশিটে প্রশান্ত বর্মনকে ‘পলাতক’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছিল। অবশেষে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে নিজেই পুলিশের জালে ধরা দিলেও, তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত গাফিলতি ও সমন্বয়ের অভাবে আইনের ফাঁক গলে আবারও মুক্ত বাতাসে ডানা মেললেন এই অপসারিত বিডিও।