ইরান, ইসরায়েল, আমেরিকা, যুদ্ধ-ইতিহাসকে ফিরে দেখা
একদিন ইরান এই মার্কিনিদের সহযোগিতায় ইরাকের সঙ্গে ১০ বছর যুদ্ধ করেছে।
প্রবীর মজুমদার: সমর্থকের অভাব ছিল না যেমন, সমালোচকের সংখ্যাও কম ছিল না নেহাত। আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুতেও বিভাজন চোখে পড়ছে ইরানে। একদিকে দলে দলে রাস্তায় নেমে এসেছেন হাজার হাজার মানুষ। অন্য দিকে, আবার উদযাপনের ছবিও চোখে পড়েছে। যেদিন তেহরানে মার্কিন দূতাবাসের ৫৪ জনকে আটক করেছিলেন খামেনেই, সেদিনই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে খামেনেই আর টিকে থাকতে পারবেন না। অথচ, একদিন ইরান এই মার্কিনিদের সহযোগিতায় ইরাকের সঙ্গে ১০ বছর যুদ্ধ করেছে।
ইতিহাসের পাতা অনুযায়ী, ইসলামের প্রথম বিভেদ সৃষ্টি করেছিল এই পারস্যের লোকজন। কাজু বাদাম ও কার্পেট সভ্যতার অহমিকায় ইসলাম নিয়ে তারাই প্রথম ছিনিমিনি খেলেছে। শিয়া-সুন্নি বিভেদ তারাই সৃষ্টি করেছে পশ্চিমী দুনিয়ার চক্রান্তে। শিয়া-সুন্নির বিবাদে ইসলামের কর্তৃত্বের প্রশ্নে মুসলিম বিশ্ব দু’ভাগে ভাগ হয়েছে। একদিকে রয়েছে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান, অন্যদিকে সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠতার আরব দেশগুলি। আর আরব দেশগুলো মার্কিনিদের খুশি করেই তারা টিকে আছে। অন্যদিকে মিশরের পর ইরান ছিল দ্বিতীয় মুসলিম দেশ যে এই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। শত্রুর শত্রু বন্ধু। একটা সময় কি মধুর সম্পর্ক ছিল ইরানের। রাজনীতি করে কিন্তু কেউ ইতিহাস পড়তে চায় না। ইতিহাস কথা বলে মনে রাখবেন। সূর্য ও ইতিহাস ঘুরে ফিরে চলে। তবে ইতিহাস দ্রুত এগিয়ে যায়।
আজ পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে সত্যিই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছি! কেউ ‘বিশ্বযুদ্ধ’ শব্দটা উচ্চারণ করছে না, কিন্তু তার ছায়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম এশিয়ার আকাশে আগুন, দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্তে গোলাগুলি, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগের ঢেউ… সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা! মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইজরায়েলের সংঘাত নতুন মাত্রা নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বহুদিনের চাপা উত্তেজনার ফল। ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের নাম এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে। প্রায় ৩৭ বছর ধরে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় ছিলেন। রাষ্ট্রপতি বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ছিল তাঁর হাতেই। সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার, নিরাপত্তা সংস্থা সব।
অনেকে এখন আবেগে তাঁকে প্রতিরোধের প্রতীক বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি তাঁর শাসনের পুরো ছবিটা জানি? খামেনেইয়ের আমলে ইরানে রাজনৈতিক বিরোধিতা কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে, এ কথা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির রিপোর্টে বারবার উঠে এসেছে। ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ‘ওম্যান লাইফ ফ্রিডম’ আন্দোলন পর্যন্ত বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীরগুলিতে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট দাবি করেছে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া আন্দোলনে শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত এবং হাজার হাজার গ্রেফতার হয়েছেন, এই তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
আর নারীদের ক্ষেত্রে? ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন বহু বছর ধরে কার্যকর। ‘মোরালিটি পুলিশ’ নামে পরিচিত বাহিনী রাস্তায় পোশাক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, প্রকাশ্য জীবন, সব জায়গায় নারীদের ওপর নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ ছিল। ইরানি নারীরা শিক্ষিত, কর্মক্ষম, বহু ক্ষেত্রে এগিয়েও গেছেন, কিন্তু আইনি কাঠামোয় তারা এখনও পুরুষের সমান নন, এই সমালোচনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির বহু প্রতিবেদনে রয়েছে। এদিকে আমেরিকা তেলের লোভে উস্কানি দিচ্ছে। এগুলি বলা মানে যুদ্ধ সমর্থন করা নয়। বরং পুরো বাস্তবটা বোঝা। কোনও রাষ্ট্রনেতাকে সমর্থন বা বিরোধিতা করার আগে তাঁর শাসনের মানবিক মূল্য কত ছিল, সেটাও জানা জরুরি। একই সময়ে আমাদের খুব কাছেই পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ছে। জঙ্গি আশ্রয়ের অভিযোগ, পাল্টা বিমান হামলা, সীমান্ত সংঘর্ষ, দক্ষিণ এশিয়াও অস্থির! অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের ভেতরে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, বাজার, স্কুল সব কাঁপছে।
এদিকে দুবাইয়ে হামলা চালাচ্ছে ইরান। দুবাইয়ের অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে পড়ছি। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে পৃথিবী যেন এক অদৃশ্য দাবার ছকে সাজানো। বড় শক্তিগুলো গুটি চালছে, কিন্তু বোর্ডের উপর যে মানুষগুলো আছে, তারা তো গুটি নয়, তারা আমাদের মতোই পরিবার, সন্তান, স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে চাওয়া মানুষ। এই সমস্ত ঘটনার ভেতর দাঁড়িয়ে আমরা, ভারতের নাগরিকরা, কী ভাবব? আমাদের দেশ এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে, যেখানে পশ্চিম এশিয়ার আগুনের প্রভাব সরাসরি অর্থনীতি, তেলের দাম, বাণিজ্য ও কূটনীতিতে এসে লাগে। আমরা যুদ্ধ চাই না। কারণ ইতিহাস জানায়, যুদ্ধ কখনও কেবল মানচিত্র বদলায় না, মানুষের জীবনও বদলে দেয়। আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখছি অনেকেই খামেনেইকে এক প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। কিন্তু তাঁরা কি জানেন তাঁর আমলে কত রাজনৈতিক বন্দি ছিলেন? কত পরিবার প্রিয়জন হারিয়েছে? কত তরুণী পোশাকের কারণে অপমানিত হয়েছে? কত সাংবাদিক কারাবন্দি হয়েছেন? আবার এটাও সত্যি, যুদ্ধ শুরু হলে সাধারণ মানুষই প্রথম শিকার হয়। তেহরানের মা, তেল আভিভের শিশু, কাবুলের শ্রমিক, তারা কেউই আন্তর্জাতিক কূটনীতির খেলোয়াড় নয়।
আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আবেগ খুব সহজে জেগে ওঠে, কিন্তু তথ্য জানা কঠিন হয়ে যায়। তাই আবেগের আগে তথ্য, স্লোগানের আগে ইতিহাস, আর পক্ষ নেওয়ার আগে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, এই তিনটেই জরুরি। নাম না করা এক যুদ্ধের ছায়া যেন পৃথিবী জুড়ে ঘনিয়ে উঠছে। প্রার্থনা একটাই, এই ছায়া যেন পূর্ণ অন্ধকারে না পৌঁছয়। শান্তি যেন কেবল বক্তৃতার শব্দ না হয়ে বাস্তবের সিদ্ধান্ত হয়। না হলে আইনস্টাইনের সেই আশঙ্কায় সত্যি হবে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্ত্র যাই হোক, চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ লড়া হবে কিন্তু লাঠি-পাথর দিয়ে। কারণ তার আগেই সব ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষ আবার শুরু করবে সেই আদিম যুগ থেকে!






