সম্পাদকীয়

গঙ্গার শুশুক: হারিয়ে যাচ্ছে এই জলজ রত্ন, সংরক্ষণে জরুরি আহ্বান

এই নিরীহ, উপকারী প্রাণীরা এবং তাদের নিয়ে লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা অনেক গল্প- কাহিনী আজ অতীতের পাতায়।

রাজু পারাল: আমাদের জাতীয় জলচর প্রাণী বলতে গঙ্গা নদীর শুশুককে-ই বোঝানো হয়। সামুদ্রিক ডলফিন-ই হল ‘শুশুক’। এই জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীটিকে নিয়ে কাব্য ও সাহিত্যে অনেক গল্প গাঁথা ছড়িয়ে আছে। গ্রিক কাব্যে ডলফিনরা ‘সমুদ্রের দেবতা’ হিসেবে পরিচিত। হিন্দু পুরাণে, গঙ্গাদেবীর বাহন মকরকে অনেকেই শুশুক বলে মনে করেন। এই নিরীহ, উপকারী প্রাণীরা এবং তাদের নিয়ে লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা অনেক গল্প- কাহিনী আজ অতীতের পাতায়।

আবেগ, বিচারক্ষমতা ও বুদ্ধি মত্তায় ডলফিন মানুষের সঙ্গে তুলনীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় দূষণ, চোরাশিকার, বাঁধ নির্মাণ, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও মৎস্য শিকারের কারণে এই দেশীয় প্রজাতিটি আজ ভয়ানকভাবে বিপদগ্রস্ত। কয়েক দশক আগেও গঙ্গার বুকে চোখে পড়ত শুশুকের ঝাঁকের ডুব সাঁতার দেওয়ার দৃশ্য অথচ আজ তা বিরলতম ঘটনা। মানুষের অপরিসীম লোভ, অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, স্বার্থপরতা ক্রমে নষ্ট করে দিচ্ছে আমাদের পরিবেশের কত অমূল্য সম্পদ।

১৮০১ সালে ছবি ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সহ গঙ্গার শাখানদী হুগলিতে প্রথম শুশুকের উপস্থিতি লিপিবদ্ধ করেন তৎ কালীন বোটানিক্যাল গার্ডেনের সুপারিন্টেন ডেন্ট উইলিয়াম রক্সবার্ঘ। এর অনেক বছর পরে বিজ্ঞানী অ্যান্ডারসন প্রথম এই গাঙ্গে য় ডলফিনের দেহবৈশিষ্ট্য, গঠন ও ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে আলোকপাত করেন। দুঃখের বিষয়, সারা পৃথিবীতে এই জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীটির সংখ্যা ক্রমহাস মান। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ I U C N ‘ এর ২০২২ সালের লাল তালিকা অনুযায়ী গাঙ্গে য় ডলফিন ভীষণভাবে বিপদগ্রস্ত। WWF এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী গাঙ্গেয় ডলফিনের সংখ্যা বর্তমানে ৩৫০০ – ৫০০০।

বনের সর্বোচ্চ খাদক যেমন বাঘ, নদীর ক্ষেত্রে তেমন ডলফিন বা শুশুক । তাই বাঘ ছাড়া সুন্দরবন আর শুশুক বিহীন গঙ্গানদী একই অর্থ বোঝায়। নদীর বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষায় এদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরা অবলুপ্তির পথে এগিয়ে গেলে নদীর বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য যেমন বিঘ্নিত হবে তেমনি প্রভাব পড়বে সামগ্রিক জীব বৈচিত্রের উপর। ২০১০ সালে গঙ্গার শুশুক তথা ডলফিন জাতীয় জলজ প্রাণীর মর্যাদা পেলেও গত দশ-বারো বছরে এদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর শোনা গেছে বিভিন্ন গনমাধ্যমে। সাম্প্রতিক কালে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানা গেছে, সুন্দরবনের ডেল্টা থেকে শুশুকের সংখ্যা দ্রুত কমে যাবার অন্যতম প্রধান কারণ নদীতে লবণের পরিমান বৃদ্ধি। এছাড়া গঙ্গা নদীর দূষণের কারণে অন্য জলজ প্রাণীর মতো শুশুকও ভয়ানকভাবে আক্রান্ত, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীবাঁধের বিপদ।

বিগত চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরে গঙ্গার গতিপথে প্রায় পঞ্চাশেরও অধিক বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মিত হয়েছে যা ধ্বংস করেছে শুশুকের বাসস্থানকে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ ফারাক্কা ব্যারেজ। এছাড়াও নদী গর্ভে পলি জমে ক্রমশ নদীর নাব্যতা কমে গিয়ে ডলফিনের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। গঙ্গা নদীর দু’পাড় থেকে এসে মিশছে নানারকমের মারাত্মক রাসায়নিক পদার্থ যা ডলফিনের বসবাসের অযোগ্য। তাছাড়া গঙ্গায় ফেলা প্রাণীর মৃতদেহ ও প্লাস্টিকের মত বর্জ্য শুশুকদের ওপর মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন সময়ে মৎসজীবীদের অনিয়ন্ত্রিত মাছ শিকারের কারণে খাদ্য সংকটে পড়ছে শুশুকেরা, যা শুশুকের সংখ্যা কমার অন্যতম কারণ। আবার মাছ ধরার জালে আটকে পড়েও অকালে প্রাণ দিচ্ছে বহু শুশুক। মাংস, চর্বি এবং তেলের লোভে চোরা শিকারীরা নির্বিচারে শুশুক হত্যা করে চলেছে । এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মানুষ শুশুকের তেল বাতের রোগের চিকিৎসায় ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং কিছু কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ সেটা কিনছে। অবধারিতভাবে এই তেলের চাহিদা মেটাতেই তারা শুশুক হত্যা করে চলেছে। গঙ্গা, ভাগীরথী, হুগলী নদীতে মোটরচালিত জলযানের ব্লেডে কাটা পরেও বেশ কিছু শুশুকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।

গঙ্গার শুশুক বা ডলফিন কেবল গঙ্গার সম্পদ নয়, ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশ ব্যাপী ছড়িয়ে থাকা গঙ্গা – ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও কর্নফুলি নদীতেও দেখতে পাওয়া যায়।চম্বল অববাহিকায়ও গাঙ্গেয় শুশুকের দেখা মেলে। মোটামুটিভাবে, ভারতের উত্তরপরদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড, আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গ এই ছয়টি রাজ্যে এদের দেখা যায়। গঙ্গার শুশুক মিষ্টি জলের প্রাণী হলেও মাঝে মধ্যে এরা মোহনার কাছে চলে আসে। তবে সমুদ্রে এদের দেখা যায় না। কারণ যে জলে লবণ তার মাত্রা বেশি থাকে সেই জল শুশুক সহ্য করতে পারে না। গঙ্গার শুশুক একা থাকতে পছন্দ করে। তবে কখনো সখনো বাচ্চাদের সঙ্গে ঘুরতে দেখা যায়। যে স্থানে মাছের সংখ্যা বেশি খাবারের লোভে এরা সেখানে ছুটে যায়। সাধারণত ২৫ থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত বাঁচে গাঙ্গেয় শুশুকেরা। বিভিন্ন কারণে সম্প্রতি আশংকাজনক ভাবে শুশুকের সংখ্যা কমে আসছে। শান্ত, নিরীহ এই প্রাণীটিকে বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বই-এর পাতাতেই কেবল এরা ছবি হয়ে থাকবে।

ডলফিন এলাকা পর্যটনশিল্পের ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের জীবন জীবিকা প্রভাবিত হতে পারে। ২০২২ সালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডলফিন সংরক্ষণের জন্য ‘প্রোজেক্ট ডলফিন’ নামে একটি বহুমুখী প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছিলেন যাতে শুধু গাঙ্গেয় শুশুক ও সামুদ্রিক শুশুকের সংরক্ষণ নয় নদীর বাসতুতন্ত্রের উপরেও জোর দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, জনমানসে শুশুক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল ‘জাতীয় ডলফিন দিবস’ পালিত হয়।

Related Articles