মানিক রায়: কার্তিক অমাবস্যার অন্ধকারে যখন বাংলার ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠে প্রদীপ, মণ্ডপে মণ্ডপে পূজিতা হন মা কালী, তখন অনেক ভক্তের মনেই জেগে ওঠে এক প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনি। সেই কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছেন দেবাদিদেব মহাদেব, তাঁর প্রিয়তমা সতী এবং ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র। সেই কাহিনির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের নানান প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা শক্তিপীঠগুলোর বিশ্বাস।
কিন্তু কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল এই পীঠগুলো? কেনই বা সতী কোথাও পূজিতা হন কালী, কোথাও তারা, কোথাও কামাখ্যা, আবার কোথাও বিশালাক্ষী নামে? কোন পীঠে সতীর চোখ, কোথায় কর্ণ, কোথায় পদাঙ্গুলি, কোথায় কোথায় তাঁর দেহের অন্য কোন অংশ পড়েছিল বলে প্রচলিত বিশ্বাস? আর প্রতিটা শক্তিপীঠে দেবীর সঙ্গে ভৈরবের উপস্থিতির তাৎপর্যই বা কী? এসবের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে পুরাণের সেই হৃদয়বিদারক অধ্যায়ে, যেখানে প্রেম, অপমান, আত্মত্যাগ, শোক ও মহাশক্তির কাহিনি একসূত্রে গাঁথা হয়ে আছে।
সতী ছিলেন প্রজাপতি দক্ষের কন্যা এবং দেবাদিদেব মহাদেবের পত্নী। দক্ষ ছিলেন যজ্ঞকর্মে পারদর্শী ও প্রভাবশালী প্রজাপতি। কিন্তু জামাতা শিবের প্রতি তাঁর মনোভাব ছিল বিরূপ। শিবের অনাড়ম্বর জীবন, পরনে তাঁর বাঘছাল, শ্মশানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, ভস্ম মাখা শরীর আর প্রচলিত সামাজিক আচার থেকে তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থান, দক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এক সময় দক্ষ এক বিরাট যজ্ঞের আয়োজন করলেন। দেবতা ও ঋষিদের আমন্ত্রণ জানানো হল সেই সভায়। কিন্তু মহাদেব আর সতী আমন্ত্রণ পেলেন না। যজ্ঞের সংবাদ সতীর কানে পৌঁছতেই তিনি পিতৃগৃহে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। মহাদেব তাঁকে বোঝালেন, আমন্ত্রণহীন স্থানে গেলে অসম্মানিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু পিতার বাড়িতে যাওয়ার জন্য কন্যার যে স্বাভাবিক আকুলতা, তা উপেক্ষা করতে পারলেন না সতী। তিনি দক্ষের যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন। কিন্তু সেখানে পিতার কাছ থেকে পেলেন না প্রত্যাশিত স্নেহ। বরং মহাদেবকে ঘিরে অপমানজনক মন্তব্য ও অবজ্ঞার পরিবেশ তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করল। যে স্বামীকে তিনি নিজের জীবনের সর্বস্ব বলে মনে করেন, তাঁর অসম্মান সহ্য করা সতীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।
পুরাণের প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, স্বামীর এই অপমানের প্রতিবাদে সতী যজ্ঞকুণ্ডের আগুনে আত্মাহুতি দিলেন। বিভিন্ন গ্রন্থে এই ঘটনার বিবরণের পার্থক্য রয়েছে, কোথাও তাঁর যোগাগ্নিতে দেহত্যাগের কথাও বলা হয়েছে। সতীর মৃত্যু সংবাদ মহাদেবের কাছে পৌঁছতেই সমস্ত জগৎ যেন নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল।
দক্ষযজ্ঞের অপমান ও সতীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে শিবের জটা থেকে বীরভদ্রের আবির্ভাব ঘটল। বীরভদ্র ও তাঁর অনুচরেরা যজ্ঞস্থলে তাণ্ডব চালালেন। দক্ষের যজ্ঞ ধ্বংস হল। পরবর্তী কাহিনিতে দক্ষের পুনরুজ্জীবন ও তাঁর সঙ্গে শিবের সম্পর্কের পরিবর্তনের বিবরণও পাওয়া যায়। কিন্তু সতী তো আর ফিরে এলেন না!
শোকাহত মহাদেব সতীর নিথর দেহ তুলে নিলেন নিজের কাঁধে। তারপর শুরু হল তাঁর উন্মত্ত পরিভ্রমণ। প্রিয়তমার বিচ্ছেদের যন্ত্রণা তাঁকে যেন সমস্ত জাগতিক বোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। তাঁর নৃত্য আর নিছক নৃত্য থাকল না, তা হয়ে উঠল শোক, ক্রোধ আর বিরহের এক মহাপ্রলয়ংকর প্রকাশ। পুরাণের ভাষায়, শিবের সেই তাণ্ডবে ত্রিভুবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠল। এদিকে দেবতারা উদ্বিগ্ন, সৃষ্টির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মহাদেবের শোককেও অস্বীকার করা যায় না, আবার ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে সমস্ত সৃষ্টিকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া যায় না। এ যেন এক অসহায় পরিস্থিতি। একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর অসীম বেদনা, অন্যদিকে বিশ্বজগতের অস্তিত্ব রক্ষার অনিবার্য দায়িত্ব।
মহাদেবের তাণ্ডব থামানো প্রয়োজন হয়ে উঠল। বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সতীর দেহকে খণ্ডিত করেন বলে বহুল প্রচলিত বিশ্বাস। শিবের কাঁধ থেকে সতীর দেহের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর নানান স্থানে পতিত হয়। যে যে স্থানে সতীর দেহাংশ বা অলংকার পড়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়, সেই স্থানগুলোই পরবর্তীকালে শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করল।
আদি শক্তিপীঠের সংখ্যা ৪টে বলে মনে করা হয়।কালিকাপুরাণে শক্তিপীঠের সংখ্যা ২৬। শিবচরিত্র অনুসারে শক্তিপীঠের সংখ্যা ৫১। তন্ত্র চুড়ামণি, মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে ৫২টা শক্তিপীঠ রয়েছে। ভাগবতে শক্তিপীঠের সংখ্যা ১০৮টা। ৫১টা সতীপীঠ তথা শক্তিপীঠ রয়েছে যেখানে মাতা সতীর দেহের অঙ্গগুলো পড়েছিল যা এখন শক্তিপীঠ হিসাবে বিবেচিত হয়। সমস্ত শক্তিপীঠ ভারত এবং শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং নেপালের মতো আশেপাশের দেশগুলোতে অবস্থিত। কামাখ্যা শক্তিপীঠকে অন্যতম শক্তিশালী শক্তিপীঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চারটে প্রধান শক্তিপীঠ হল আসামের কামাখ্যা, গুজরাটের আম্বাজি, কলকাতার কালীঘাট আর জম্মুর বৈষ্ণোদেবী। বৈষ্ণোদেবীকে ১০৮টা শক্তিপীঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেবীভাগবত, শিব ধর্মগ্রন্থ এবং ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ অনুসারে ৫১টা শক্তিপীঠ রয়েছে। তবে এটাও বলা হয় যে শক্তিপীঠের অলংকার এবং শরীরের অঙ্গসহ ১০৮টা শক্তিপীঠ রয়েছে। পাকিস্তানে ২টি শক্তিপীঠ অবস্থিত, অর্থাৎ মহিষমর্দিনী শক্তিপীঠ এবং হিংলাজ শক্তিপীঠ রয়েছে।
একনজরে ৫১ পীঠের বিবরণ
হিঙ্গুলা-হিংলাজ (বেলুচিস্তান)
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের লাসবেলা জেলার হিঙ্গোল জাতীয় উদ্যানের মধ্যে হিঙ্গোল নদীর তীরে অবস্থিত। করাচি থেকে ১২৫ কিলোমিটার দূরে। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এই স্থান ‘নানি মন্দির’ নামেও পরিচিত। পুরাণ অনুযায়ী এখানে সতীর মন বা মস্তিষ্ক পড়েছিল। এখানে দেবী দুর্গার নাম কোটারি। ভয়ঙ্কর তৃতীয় নয়নের জন্য শিব এখানে ভীমলোচন।
করবীর-সর্করারে ( করাচি)
এই হিন্দুতীর্থও পাকিস্তানে। এখানে গেলে বলতে হয় ‘জয় কালী করাচিওয়ালি’। করাচির করবীপুর সিন্ধ প্রদেশে পড়ে। এখানে সতীর তিনটে নয়ন পড়েছে। দেবী এখানে মহিষমর্দিনী রূপে পূজিতা হন। শিবের অধিষ্ঠান ক্রোধীশ নামে।
সুগন্ধা (বরিশাল)
সতীর নাসিকা পতিত হওয়ায় এই পীঠের নাম সুগন্ধা। বাংলাদেশের বরিশাল থেকে ১০ মাইল উত্তরে শিকারপুর গ্রামে সুগন্ধা অবস্থিত। শক্তিধামে দেবী দুর্গার নাম সুনন্দা। মহাদেব এখানে ত্র্যম্বক।
অমরনাথ (জম্মু ও কাশ্মীর)
শিবক্ষেত্র অমরনাথ শক্তিপীঠ রূপেও প্রসিদ্ধ। ভারতের ভূস্বর্গ কাশ্মীরের অমরনাথে দেবীর কন্ঠ পতিত হয়। এখানে দেবীর নাম মহামায়া। মহাদেব এখানে ত্রিসন্ধ্যেশ্বর রূপে বিরাজ করছেন। শ্রীনগর থেকে পহেলগাঁও হয়ে বাসে ৯৪ কিমি পথ। আরও সোজা ভাষায় বললে, তীর্থের নাম অমরনাথ। এই শৈব তীর্থ একটা শক্তিপীঠও বটে।
জ্বালামুখী (হিমাচলপ্রদেশ)
হিমাচলপ্রদেশের কাঙরা অঞ্চলে অবস্থিত এই সতীপীঠ একটা জাগ্রত পীঠ। এখানে দেবীর জিভ পতিত হয়। দেবী এখানে সিদ্ধিদা বা অম্বিকা নামে পূজিতা। ভৈরবের নাম উন্মট ভৈরব। আশ্চর্যের কথা হল এখানে কোনও দেবী মূর্তি নেই। এখানে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকে দেবী রূপে পুজো করা হয়। এই আগুন কবে থেকে জ্বলছে তা জানা যায় না। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী কাঙরার রাজা ভূমিচাঁদ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই স্থানে মন্দির নির্মাণ করেন। সম্রাট আকবর এখানে এসে নাকি ওই অগ্নি জল দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করেন। তাতে অকৃতকার্য হয়ে তাঁর দেবী শক্তি সম্বন্ধে শ্রদ্ধা হয় ও তিনি মন্দিরের চূড়ায় স্বর্ণছত্র প্রদান করেন। ১৮১৫ সালে এখানে মহারাজ রণজিৎ সিং আসেন ও মন্দিরের গম্বুজ সোনার পাতে মুড়িয়ে দেন। মন্দিরের ভিতরে একটা যন্ত্রকে বস্ত্র, অলঙ্কার সহযোগে পুজো করা হয়। শিব আছেন উন্মত্ত রূপে।
ভৈরব পাহাড়-অবন্তী (মধ্যপ্রদেশ)
সতীর উর্ধ ওষ্ঠ পড়েছিল এই পাহাড়ে। মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী শহরের কাছে পবিত্র শিপ্রা নদীর তীরে ভৈরব পাহাড়ে অবস্থিত। এই তীর্থে দেবী দুর্গা পরিচিত অবন্তী নামেই। স্থানীয় অনেকে এই মন্দিরকে গদকালিকা মন্দির নামেও অভিহিত করেন। আর শিব এখানে লম্বকর্ণ। বিশ্বাস করা হয় যে এখানেই মহর্ষি সন্দীপনির আশ্রমে ভগবান কৃষ্ণ, বলরাম এবং সুদামা শিক্ষালাভ করেছিলেন।
ফুল্লরা (বীরভূম)
ফুল্লরা হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার লাভপুর শহরের কাছে একটা মন্দির কেন্দ্রিক জনপদ। এটা বোলপুর শান্তিনিকেতন থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটা হিন্দু তীর্থস্থান ও পর্যটন কেন্দ্র। লোকবিশ্বাস অনুসারে, ফুল্লরায় সতীর নিচের ঠোঁট পড়েছিল। এই মন্দিরে কোনও বিগ্রহ নেই। সিন্দুরচর্চিত কচ্ছপাকৃতি শিলাখণ্ডই দেবীর প্রতিভূ। এই মন্দিরের পাশে একটা বিরাট পুকুর আছে। কিংবদন্তি অনুসারে, রামের দুর্গাপুজোর সময় হনুমান এই পুকুর থেকেই ১০৮টা পদ্ম সংগ্রহ করেছিলেন। ফুল্লরা ভারতের ৫১টা শক্তিপীঠের অন্যতম বলে কথিত আছে।
প্রভাস-চন্দ্রভাগা (গুজরাট)
গুজরাট রাজ্যের গির সোমনাথ (পূর্বতন জুনাগড়) জেলার প্রভাস পাটন বা ভেরাভাল অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে সতীর পাকস্থলি পড়েছিল। এখানে দেবীকে মা চন্দ্রভাগা বা চাঁদের দেবী রূপে পূজা করা হয়। ভৈরব বা প্রধান শিবকে এখানে বক্রতুন্ড (বাঁকা দেহের অধিকারী) রূপে পুজো করা হয়। এই প্রভাস অঞ্চলেই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নশ্বর দেহত্যাগ করেছিলেন এবং এখানেই বিখ্যাত ভাটকুণ্ড ও দেহোৎসর্গ তীর্থ অবস্থিত।
ইয়ানাস্থানা-জনস্থান (মহারাষ্ট্র)
এই শক্তিপীঠে সতীর চিবুক পড়েছিল। মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার বাণী গ্রামে অবস্থিত (কিছু পৌরাণিক মতে এটি নাসিকের পঞ্চবটী অঞ্চলের সাথেও যুক্ত)। এই পবিত্র স্থানটি মহারাষ্ট্রের সাড়ে তিন শক্তিপীঠের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র সপ্তশৃঙ্গী দেবী মন্দিরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই শক্তিপীঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন ভ্ৰামরী (সপ্তশৃঙ্গী মাতা) এবং তাঁর রক্ষক ভৈরব হলেন বিকৃতাক্ষ।
গোদাবরী (অন্ধ্রপ্রদেশ)
রাজামুন্দ্রি (রাজমহেন্দ্রমরম) শহরে গোদাবরী নদীর তীরে কোটিলিঙ্গেশ্বর (শ্রী উমাকোটিলিঙ্গেশ্বর স্বামী) মন্দির চত্বরে এই শক্তিপীঠ অবস্থিত। এখানে সতীর বাম গাল বা কপোল পড়েছিল বলে পৌরাণিক বিশ্বাস। দেবীর নাম এখানে বিশ্বেশ্বরী বা বিশ্বমাতৃকা। মহাদেব পূজ্য বৎসনাভ এবং দণ্ডপানি রূপে।
গণ্ডকী (নেপাল)
নেপালের মুস্তাং জেলার গণ্ডকী নদীর অববাহিকায় বা উৎসস্থলে অবস্থিত বিখ্যাত মুক্তিনাথ মন্দির প্রাঙ্গণকেই গণ্ডকী শক্তিপীঠ হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে সতীর ডান গাল বা কপোল পড়েছিল এই স্থানে। বিখ্যাত এই তীর্থক্ষেত্রে সতীর নাম গণ্ডকীচণ্ডী। আর শিবের পরিচয় চক্রপাণি।
সূচিদেশ (ছত্তিশগড়)
বহুল পরিচিত দন্তেওয়াড়া নামে। ছত্তিশগড়ের জগদলপুরে এই জায়গা আসলে শক্তিপীঠ। পুরাণ মতে, এখানে ছিটকে এসে পড়েছিল দেবীর উপরের পাটির দাঁত। দেবী এখানে নারায়ণী। মহাদেব পূজিত হন সংহার রূপে। পঞ্চসাগরে পড়েছিল সতীর নীচের পাটির দাঁত। সতী এখানে বরাহী এবং শিব মহারুদ্র। দু’জায়গাতেই দেবীর আর এক নাম দন্তেশ্বরী। তবে পঞ্চসাগরের অবস্থান নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কোনও কোনও মত বলে, হরিদ্বারের কোনও এক জায়গায় রয়েছে এই পুণ্যভূমি।
ভবানীপুর (রাজশাহী)
এই সতীপীঠ এখন বাংলাদেশে। রাজশাহীর করতোয়া নদীর তীরে। এই স্থানে দেবীর বাঁ নিতম্ব এবং পোশাক পড়েছিল। দুর্গা এখানে পূজ্য অপর্ণা নামে। শিবের পরিচয় ভৈরব। কথিত, নাটোরের রাজা এই মন্দিরে ধ্যান করতেন।
শ্রী পর্বত (অন্ধ্রপ্রদেশ)
শ্রীপর্বত হল, সতী পীঠের আরেকটা নাম। তন্ত্র অনুযায়ী শ্রীপর্বতে দেবীর গুলফ পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম শ্রীসুন্দরী, ভৈরবের নাম সুন্দরানন্দ। মূলত তিরুমালয়কে শ্রীপর্বত বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
কর্ণাট (কর্ণাটক)
পুরাণ বলে, নারায়ণের সুদর্শন চক্রের ঘায়ে সতীর দুই কান এসে পড়ে এখানে। সেখান থেকেই নাম কর্ণাট। শিব পূজিত হন অভিরুক নামে। মনে করা হয় কর্ণাট নাম থেকেই কর্ণাটক নামের উৎপত্তি। বর্তমানে এই তীর্থক্ষেত্রটা মাইসোরে চামুণ্ডি পাহাড়ের উপরে অবস্থিত।
বৃন্দাবন (উত্তরপ্রদেশ)
উত্তরপ্রদেশের মথুরা জেলার বৃন্দাবনে, রাধাবাগের কাছে গোদা বিহারে অবস্থিত। বৈষ্ণব তীর্থক্ষেত্র হলেও এর আর এক পরিচয় শক্তিপীঠ বলে। সতীর কেশরাশি পড়েছিল এখানে। দেবী এখানে উমা আর কাত্যায়নী। শিব পূজ্য ভূতেশ আর ভূতেশ্বর নামে।
কিরীটেশ্বরী (মুর্শিদাবাদ)
মুকুট-সহ দেবীর শিরোভূষণ পড়েছিল এখানে। বর্তমান অবস্থান মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে। মূল মন্দির ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে লালগোলার রাজা দর্পনারায়ণ নতুন করে মন্দির নির্মাণ করেন। দেবীর পরিচয় এখানে কিরীটেশ্বরী বা মুকুটেশ্বরী নামে। শিব পূজিত হন সংবর্ত রূপে।
শ্রীহট্ট (সিলেট)
এই নামই এখন সিলেট। সুরমা নদীর তীরে বাংলাদেশের অন্যতম জেলা। এখানেই পড়েছিল সতীর ঘাড়ের একাংশ। দুর্গার নাম এখানে মহালক্ষ্মী। শিব সর্বানন্দ।
নলহাটি নলহাটেশ্বরী (বীরভূম)
পীঠনির্ণয় তন্ত্রের মতে চতুশ্চত্বারিশৎ পীঠ হল বীরভূমের নলহাটি। এখানে দেবী সতীর কণ্ঠনালী বা ‘নলি’ পতিত হয়েছিল। সতীর ‘নলি’ থেকে নলহাটি এবং দেবীর নাম হয়েছে নলহাটেশ্বরী বা নলাটেশ্বরী। দেবীকে কালিকা বা শেফালিকা রূপে পূজা করা হয় এবং এখানকার ভৈরব হলেন যোগীশ।
বর্গভীমা-বিভাষা বা ভীমকালী মন্দির (তমলুক)
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুকে রূপনারায়ণ নদীর তীরে অবস্থিত। এখানে সতীর বাম পায়ের গোড়ালি পতিত হয়েছিল বলে বিশ্বাস। দেবী ভীমরূপা এবং ভৈরব সর্বানন্দ। তমলুকের প্রাচীন নাম তাম্রলিপ্ত।
রত্নাবলী (খানাকুল)
এই শক্তিপীঠের অবস্থান নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কোনও কোনও মতে, এই তীর্থক্ষেত্র তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ে বলা হয়। এই তীর্থক্ষেত্র হুগলি জেলার খানাকুল-কৃষ্ণনগর অঞ্চলে (উবিদপুর, রাধানগর) রত্নাকর নদীর তীরে অবস্থিত। এই পীঠস্থান স্থানীয়ভাবে আনন্দময়ী শক্তিপীঠ নামেও পরিচিত। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, এখানে দেবী সতীর দক্ষিণ স্কন্ধ বা ডান কাঁধ পতিত হয়েছিল। দেবী দুর্গা এখানে কুমারী এবং শিব হলেন ঘণ্টেশ্বর।
মিথিলা-উমা শক্তিপীঠ (বিহার)
ভারত ও নেপালের সীমান্ত অঞ্চলে, বিহারের দারভাঙ্গা ও জনকপুর অঞ্চলের কাছাকাছি। সতীর বাঁ কাঁধ ছিটকে এসে পড়ে এখানে। দেবী এখানে মহাদেবী এবং শিব পূজিত হন মহোদর রূপে।
চট্টল ভবানী চন্দ্রনাথ মন্দির (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩১০ মিটার (প্রায় ১,০২০ ফুট) উঁচু চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। এখানে দেবীকে ভবানী রূপে এবং ভৈরবকে চন্দ্রশেখর রূপে পুজো করা হয়। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে একই সঙ্গে চন্দ্রনাথ মন্দির ও বিরূপাক্ষ মন্দির রয়েছে। কথিত, সতীর ডান হাত পড়েছিল এখানে।
মানবক্ষেত্র (বর্ধমান)
বলা হয়, সতীর ডান হাত বা হাতের তালু পড়েছিল এখানে। বর্ধমানের গুসকরা স্টেশনের কাছে কোগ্রামের এই পুণ্যভূমিতে সতীর পরিচয় দাক্ষ্যায়ণী। শিব পরিচিত সিদ্ধিদায়ক রূপে।
উজ্জয়িনী (মধ্যপ্রদেশ)
মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী (অবন্তী) শহরে ক্ষিপ্রা নদীর তীরে অবস্থিত। এই স্থানে পড়েছিল দেবীর ডান কনুই। এখানে তিনি পূজিত হন মঙ্গলচণ্ডী বা মঙ্গল চণ্ডীকা এবং শিব পূজিত হন কপিলাম্বর রূপে।
পুষ্কর (রাজস্থান)
রাজস্থানের আজমির থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং বিখ্যাত পুষ্কর ব্রহ্ম মন্দির থেকে প্রায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে গায়ত্রী পাহাড়ে (গায়ত্রী পর্বত বা পুরুহুত হিল) অবস্থিত। এই মন্দির মণিবন্দ, মণিবেদিকা শক্তিপীঠ বা গায়ত্রী মন্দির নামেও পরিচিত। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, এখানে দেবী সতীর কব্জি পতিত হয়েছিল। সতী এখানে পূজিত হন গায়ত্রী নামে। শিবের নাম সর্বানন্দ।
প্রয়াগ (উত্তরপ্রদেশ)
ভারতের উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে (সাবেক এলাহাবাদ) ত্রিবেণী সঙ্গমের কাছে অবস্থিত হিন্দু ধর্মের অন্যতম পবিত্র সতীপীঠ। এখানে পড়েছিল সতীর ডান হাতের দশ আঙুল। দেবীর নাম এখানে ললিতা এবং শিব হলেন ভব বা ভবা।
বহুলা (পূর্ব বর্ধমান )
পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রামে অজয় নদীর তীরে অবস্থিত। কাটোয়া থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার। বহুলায় দেবীর বাঁ হাত পড়েছিল বলে বিশ্বাস। চার হাত বিশিষ্ট, ত্রিনয়নী ও কিরীটধারী দুর্গা রূপে দেবী এখানে বহুলা বা বহুলাক্ষী এবং শিব এখানে ভীরুক।
জলন্ধর (পাঞ্জাব)
ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের জলন্ধর শহরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত পবিত্র ও প্রাচীন হিন্দু তীর্থস্থান। এই অঞ্চলে পড়েছিল সতীর ডান স্তন, তাই এই পীঠকে স্তনপীঠও বলা হয়। এখানে দেবীকে ত্রিপুরমালিনী এবং শিবকে ভীষণ (বা সংহার) ভৈরব রূপে পুজো করা হয়।
রামগিরি (ছত্তিশগড়)
ছত্তিশগড়ে বিলাসপুর স্টেশনের কাছেই এই তীর্থক্ষেত্র। ডান স্তন (মতান্তরে পেটের হাড় বা বাম স্তন) পতিত হয়েছিল। এখানে দেবী মহাশক্তি ‘শিবানী’ এবং ভৈরব ‘চাঁদ’ বা ‘চান্দা’ নামে পূজিত হন। রামায়ণ অনুসারে, ত্রেতাযুগে লঙ্কা জয়ের উদ্দেশ্যে লঙ্কাযাত্রার পূর্বে এবং বনবাসকালে প্রভু শ্রীরামচন্দ্র, লক্ষ্মণ ও সীতা এই রামগিরি পর্বত অঞ্চলে দীর্ঘ সময় (সাড়ে এগারো বছর) অতিবাহিত ও আরাধনা করেছিলেন। শ্রীরামের নামানুসারেই এই পাহাড় বা অঞ্চলের নাম হয় ‘রামগিরি’।
বৈদ্যনাথ (ঝাড়খণ্ড)
ঝাড়খণ্ডের দেওঘর শহরে অবস্থিত বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির, দেওঘর ঝড়খণ্ড হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রধান ১২টা জ্যোতির্লিঙ্গ এবং ৫১টা শক্তিপীঠের একটা। বিশ্বাস, এখানেই পড়েছিল সতীর হৃদয়। দেবীর নাম এখানে ‘জয়দুর্গা’। শিব হলেন বৈদ্যনাথ।
উৎকল শ্রীক্ষেত্র (ওড়িশা)
পবিত্র ৫১টা শক্তিপীঠের অন্যতম একটা প্রধান পীঠস্থান। ওড়িশার (প্রাচীন নাম উৎকল) পবিত্র তীর্থক্ষেত্র পুরীর জগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গণে এই শক্তিপীঠ অবস্থিত। কথিত, এখানে পড়েছিল সতীর নাভিদেশ। দেবীর নাম এখানে বিমলা এবং শিব পূজিত হন জগন্নাথ রূপে।
কঙ্কালীতলা (বীরভূম)
বীরভূমের বোলপুর স্টেশন থেকে ১০ কিমি উত্তর-পূর্বে কোপাই নদীর তীরে এই সিদ্ধস্থান অবস্থিত। দেবী স্থানীয় মানুষদের কাছে কঙ্কালেশ্বরী নামে পরিচিত। এখানে দেবীর শ্রোণি পতিত হয়। দেবীর নাম এখানে দেবগর্ভা ও ভৈরব রূরূ নামে প্রসিদ্ধ। পাশেই একটা কুন্ড আছে যার জল নাকি কখনও শুকায় না।
কালমাধব (মধ্যপ্রদেশ)
মধ্যপ্রদেশের অমরকণ্টক অঞ্চলে (বিন্ধ্য ও সাতপুরা পর্বতশ্রেণীর মিলনস্থলে এবং নর্মদা ও শোণ নদীর উৎপত্তিস্থলের কাছে) এই শক্তিপীঠ অবস্থিত। এখানে পড়েছিল সতীর বাম বা ডান নিতম্ব। দুর্গা এখানে কালী। শিব পূজিত হন অসিতানন্দ রূপে।
শোণ (মধ্যপ্রদেশ)
মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের অনুপপুর জেলার অন্তর্গত অমরকণ্টক অঞ্চলে শোণ নদীর তীরে পড়েছিল সতীর ডান বা বাম নিতম্ব পড়েছিল বলে মনে করা হয়। আবার কারো মতে সতীর ডান চোখ পড়েছিল। দেবী এখানে পূজিত হন কালী, শোণাক্ষী এবং নর্মদা নামে। শিব পূজিত হন কালমাধব, অসিতাঙ্গ আর ভদ্রসেন পরিচয়ে।
কামাখ্যা (আসাম)
অসমের গুয়াহাটিতে ব্রহ্ম পুত্র নদীর তীরে নীলাচল পাহাড়ের উপরে দেবী কামাখ্যার মন্দির। পুরাণ বলে, এখানে দেবীর যোনি পড়েছিল। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, এখানে দেবী সতীর যোনি ও গর্ভ পতিত হয়েছিল, তাই এই মন্দিরকে নারীত্ব ও সৃষ্টির শক্তির প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। দেবীর নামও এখানে কামাখ্যা। জাগ্রত এই মন্দিরের কাছেই ব্রহ্ম পুত্রের চরে আছে উমানন্দ মন্দির। শিবের নাম এখানে উমানন্দ ও কামেশ্বর।
গুহ্যেশ্বরী (নেপাল)
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে, পবিত্র বাগমতী নদীর তীরে বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দিরের কাছে অবস্থিত। দেবীর দুই হাঁটু পড়ে এখানে। দেবী এখানে মহশিরা, মহাশিরা, গুহ্যেশ্বরী। শিব হলেন কাপালি বা কপালি।
শ্রীহট্ট জয়ন্তী জয়ন্তীয়া (সিলেট)
বাংলাদেশের সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার বাউরভাগ গ্রামে (বা ফালজুর পরগনা) এই পীঠ। এখানে দেবীর বাম উরু বা বাম জঙ্ঘা পতিত হয়। দেবী এখানে দেবী জয়ন্তী দেবী, মহালক্ষ্মী ভৈরবী এবং ভৈরব কর্মধীশ্বর বা ক্রমদীশ্বর রূপে পূজিত হন।
পাটনা (বিহার)
এই পবিত্র শক্তিপীঠ বিহারের পাটনাসিটি (পুরনো পাটনা) এলাকায় গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। বিশ্বাস করা হয় যে, ‘পাটন দেবী’র নাম থেকেই প্রাচীন ‘পাটলিপুত্র’ বা বর্তমান ‘পাটনা’ নামের উৎপত্তি হয়েছে। এখানে পড়েছিল সতীর ডানদিকের থাই বা জঙ্ঘা। দেবী এখানে সর্বনন্দোদরী বা পাটেশ্বরী দেবী বা বড় পতন দেবী ও ছোট পতন দেবী নামে পরিচিত। শিব হলেন ব্যোমকেশ।
ত্রিপুরেশ্বরী ( ত্রিপুরা)
ত্রিপুরা রাজ্যের উদয়পুর শহরের কাছে রাধাকিশোরপুর গ্রামে একটি ছোট পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। সতীর নাম এখানে ত্রিপুরা সুন্দরী। শিব হলেন ত্রিপুরেশ্বর। প্রচলিত বিশ্বাস, দেবীর ডান দিকের পায়ের পাতা পড়েছিল এখানে।
ক্ষীরগ্রাম যোগাদ্যা (পূর্ব বর্ধমান)
পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট ব্লকের ক্ষীরগ্রাম, কাটোয়া থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার এবং বর্ধমান থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বর্ধমানের এই গ্রামে পড়েছিল সতীর ডান পায়ের বুড়ো আঙুল। সতী এখানে যোগদায়া বা ভূতধাত্রী। শিবের নাম ক্ষীরকান্ত বা ক্ষীরকণ্ঠক। কথিত আছে, ত্রেতাযুগে মহিরাবণ (অহিরাবণ) শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে পাতালে বন্দি করলে হনুমান তাঁদের উদ্ধার করেন। মহিরাবণ যে দেবীর আরাধনা করতেন, সেই দেবী যোগাদ্যাকে হনুমান ক্ষীরগ্রামে এনে স্থাপন করেছিলেন।
কালীঘাট (কলকাতা)
কলকাতার আদি গঙ্গার তীরে অবস্থিত, ভারতের অন্যতম প্রধান ‘আদি শক্তিপীঠ’ বা সতীপীঠ হিসেবে বিবেচিত। ‘কালীঘাট’ এবং ‘কলকাতা’ নামদুটোই দেবীর নাম ও এই ঘাটের সঙ্গে যুক্ত। প্রচলিত বিশ্বাস, এখানে ছিটকে পড়েছিল সতীর ডান পায়ের পাতা বা আঙুল পতিত হয়েছিল। এখানকার পীঠদেবী হলেন দক্ষিণাকালী এবং পীঠরক্ষক ভৈরব হলেন নকুলিশ বা নকুলেশ্বর।
মিথিলা ( বিহার)
মিথিলা শক্তিপীঠের সঠিক অবস্থান নিয়ে প্রধানত তিনটি স্থানের কথা প্রচলিত আছে : ১. জনকপুর (নেপাল ও বিহার সীমান্ত)- সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় মতানুযায়ী, এটা নেপাল-ভারত সীমান্তের জনকপুর রেলস্টেশনের কাছাকাছি বা মধুবনীর উচ্ছাইথ স্থানে (বনদুর্গা মন্দির) অবস্থিত। ২. সমষ্টিপুর (বিহার)- বিহারের সমষ্টিপুরের কাছে সালুনা স্টেশন সংলগ্ন জয়মঙ্গলা দেবী মন্দির। ৩. সহরসা (বিহার)- বিহারের সহরসা রেলস্টেশনের কাছে অবস্থিত উগ্রতারা মন্দির। এই অঞ্চলটা রামায়ণের বিখ্যাত মিথিলা রাজ্য তথা মাতা সীতার জন্মস্থান জনকপুর সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। দেবীর বাম স্কন্ধ পতিত হয় এখানে। অধিষ্ঠিত দেবী হলেন উমা বা মহাদেবী এবং ভৈরব হলেন মহোদর।
কুরুক্ষেত্র শ্রী দেবীকূপ ভদ্রকালী (হরিয়ানা)
হরিয়ানা রাজ্যের কুরুক্ষেত্র জেলার থানেশ্বরে অবস্থিত। হরিয়ানার একমাত্র শক্তিপীঠ। কুরু পাণ্ডবদের রণাঙ্গন আবার শক্তিপীঠও বটে। এখানে পড়েছিল সতীর ডান পায়ের গোড়ালি বা গুল্ফ। দেবীর নাম এখানে ভদ্রকালী, সাবিত্রী, কালিকা। শিব এখানে স্থানু বা অশ্বনাথ। বিশ্বাস, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে পান্ডবরা ভগবান কৃষ্ণের সঙ্গে এখানে দেবী ভদ্রকালীর আরাধনা এবং জয়ের প্রার্থনা করেছিলেন, আর জয়ের পর তাদের ঘোড়া উৎসর্গ করেছিলেন। লোকাচার ও শাস্ত্র অনুযায়ী, ভগবান কৃষ্ণ ও বলরামের চুল কমানো বা মুণ্ডন অনুষ্ঠান এই মন্দিরেই সম্পন্ন হয়েছিল।
বক্রেশ্বর (বীরভূম)
বীরভূম জেলার পাপহরা নদীর তীরে অবস্থিত। দেবীর ভ্রুযুগলের মাঝের অংশ পতিত হয় এখানে। দেবীর নাম মহিষমর্দিনী। ভৈরব হলেন বক্রনাথ। পুরান মতে, এখানেই অষ্টবক্র মুণি কঠিন তপস্যা করে মহাদেবের আশীর্বাদ লাভ করেছিলেন। তাঁর নামানুসারে এই স্থানের নাম ‘বক্রেশ্বর’।
যশোরেশ্বরী (সাতক্ষীরা)
বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে অবস্থিত। এখানে দেবীর ডান হাতের তালু পতিত হয়। এখানে দেবীকে প্রধানত কালী রূপে বা যোগেশ্বরী শক্তি রূপে পুজো করা হয়। ‘যশোরেশ্বরী’ শব্দের অর্থ হলো যশোরের দেবী। এই পীঠের রক্ষাকারী বা ভৈরব হলেন ‘চন্দ ভৈরব’।
নন্দীকেশ্বর (সাঁইথিয়া)
কোনও এক সময়ের নন্দীপুর গ্রাম মিলিয়ে গেছে কালের গর্ভে। এখন দেবী নন্দিনী অধিষ্ঠিতা বীরভূমের সাঁইথিয়া শহরে। বিশ্বাস করা হয়, সতীর কণ্ঠহার পড়েছিল এখানে। দেবী এখানে নন্দিনী এবং শিব পূজিত হন নন্দীকিশোর রূপে। ভগবান শিবের পরম ভক্ত ও বাহন ‘নন্দী’র নামানুসারে এই স্থানের নামকরণ বলে মনে করা হয়।
বারাণসী বিশালাক্ষী ( উত্তরপ্রদেশ)
বারাণসীর (কাশী) বিখ্যাত মণিকর্ণিকা ঘাট এবং পবিত্র গঙ্গা নদীর তীরবর্তী মীর ঘাটের কাছে একটা সরু গলিতে অবস্থিত। পুরাণে কথিত, মহাপ্রলয়ের পরেও অস্তিত্ব টিকে থাকবে এই প্রাচীন শহরের। বাবা বিশ্বনাথের জন্য বিখ্যাত হলেও কাশীধাম একটা শক্তিপীঠ। সতীর কর্ণ কুণ্ডল বা কানের দুল পড়েছিল এখানে। দেবী এখানে বিশ্বলক্ষ্মী, ‘মাণিকর্ণী দেবী’ নামেও ডাকা হয়। মহাদেব এখানে কাল।
কন্যাকুমারী কুমারী আম্মান (তামিলনাড়ু)
তামিলনাড়ু রাজ্যের দক্ষিণতম প্রান্তে তিন সমুদ্র- বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত একটা অত্যন্ত পবিত্র শক্তিপীঠ। পুরাণ অনুসারে, এখানে সতীর ডান কাঁধ অথবা পিঠের মেরুদণ্ডের অংশ পতিত হয়েছিল। এই কারণে অঞ্চলটি কুণ্ডলিনী শক্তির এক বিশেষ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে দেবী সার্বাণী বা কুমারী। ভগবতী বা ভদ্রকালী হিসেবেও পূজিতা। শিব এখানে নিমিষ।
জাফনা ইন্দ্রাক্ষী (শ্রীলঙ্কা)
শ্রীলঙ্কার উত্তর প্রদেশের জাফনা জেলার অন্তর্গত ‘নাইনাতীভু’ দ্বীপে এই পীঠস্থান অবস্থিত। পৌরাণিক মত অনুযায়ী, প্রাচীন সিংহলের এই অঞ্চলে পড়েছিল সতীর পায়ের মল। সতী এখানে ‘ইন্দ্রাক্ষী’ বা নাগাপুশানি বা ভুবনেশ্বরী রূপে এবং তাঁর ভৈরব বা সঙ্গী শিব নয়িনার বা রাক্ষসেশ্বর বা রক্ষশেশ্বর রূপে পূজিত হন।
বৈরাট (রাজস্থান)
রাজস্থান রাজ্যের জয়পুর জেলার বিরাটনগর (প্রাচীন নাম বৈরাট) শহরে অবস্থিত। মহাভারতে উল্লিখিত মৎস্য দেশের রাজা বিরাটের নামানুসারে এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছিল বিরাটনগর, যেখানে পাণ্ডবেরা তাঁদের অজ্ঞাতবাসের শেষ বছরটি কাটিয়েছিলেন। সতী এখানে অম্বিকা। শিব হলেন অমৃতেশ্বর। পৌরাণিক বিশ্বাস মতে ডান পায়ের আঙুল (মতান্তরে বাম পায়ের আঙুল) পতিত হয়েছিল।




