নিজ কন্যাকেই লক্ষ্মী রূপে আরাধনা, পরিযায়ী শ্রমিক দম্পতির লক্ষী পুজোয় নজিরবিহীন উদ্যোগ
কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে যখন সারা বিশ্ব ধন-সম্পদ লাভের আশায় লক্ষ্মী মাতার আরাধনায় ব্রতী, ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের আট বছর বয়সী একরত্তি শিশু কন্যাকে লক্ষী মাতার আদলে সজ্জিত করে ধর্মীয় রীতি মেনে তাঁকে পুরোহিত ডেকে পূজা করেন পরিযায়ী শ্রমিক দম্পতি।
মাধব দেবনাথ,নদিয়া: শিশু নির্যাতন ও নারী ধর্ষণ, খুনের মতো অমানবিক ঘটনা যেভাবে সমাজের চারিদিকে বেড়ে চলেছে, তাতে প্রতিটি পরিবার আতঙ্কিত। একদিকে আর জি করের অভয়ার নৃশংস খুন, অন্যদিকে কুলতলীর উমাকে ধর্ষণ করে খুন, গত দুবছর আগে লক্ষ্মীপুজোর দিন নদিয়ার কৃষ্ণনগরে তরুণীকে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে খুন ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা সমাজের প্রতিটি মানুষকে ব্যথিত করেছে। এই ঘটনা রোধ করতে নিজেই অভিনব উদ্যোগ নেন নদিয়ার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কৃষ্ণগঞ্জ থানার শিবনিবাস হালদার পাড়ার বিশ্বাস দম্পতি ।
কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে যখন সারা বিশ্ব ধন-সম্পদ লাভের আশায় লক্ষ্মী মাতার আরাধনায় ব্রতী, ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের আট বছর বয়সী একরত্তি শিশু কন্যাকে লক্ষী মাতার আদলে সজ্জিত করে ধর্মীয় রীতি মেনে তাঁকে পুরোহিত ডেকে পূজা করেন পরিযায়ী শ্রমিক দম্পতি। পৃথিবী থেকে শিশু নির্যাতন ও নারী ধর্ষণের মতো অসামাজিক ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেই কামনায় মা লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা জানানো হয়। একরত্তি কন্যাকে চেয়ারে বসিয়ে লক্ষী আরাধনায় মাতেন বিশ্বাস পরিবার।আট বছরের শ্রুতিকে লক্ষ্মীর আদলে সজ্জিত করে পুরোহিত ডেকে মাতৃরূপে পূজা করেন বিশ্বাস পরিবারের সদস্যরা। কন্যা শিশুর মা লক্ষ্মী বিশ্বাস বলেন, মেয়ে সন্তানকে প্রতিটি পরিবারেই লক্ষ্মী হিসাবে গণ্য করা হয়। এছাড়াও নারীকে মাতৃ শক্তির আধার রূপে মানা হয়। মূলত সেই কারণেই মা লক্ষ্মীর মৃন্ময়ী মূর্তির বদলে ঘরের মেয়েকেও লক্ষ্মী মাতার রূপে
আরাধনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, নিজেদের মেয়েকে ভগবান রূপে আরাধনা করার মাধ্যমে সমাজ থেকে শিশু নির্যাতন ও নারী নির্যাতনের মতো অমানবিক ঘটনা চিরতরের জন্য বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। মেয়ের জন্মের পর থেকে পরিবারের অনেক উন্নতি হয়েছে। পাশাপাশি এখনও পর্যন্ত গ্রাম বাংলার বহু জায়গায় বাস্তব জীবনে মেয়েদের পিছনে ফেলে রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় কিছু সংখ্যক মানুষজনের মধ্যে। কন্যা সন্তানদের প্রতি তাদের এই ভ্রান্ত ধারণা ও অসামাজিক মনোভাব দূর করার জন্যই নিজের একরত্তি কন্যাকে মাতৃরূপে আরাধনা করে নারীদের প্রতি সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি। বলেন, শিশু কন্যা সমাজে অবহেলিত নয়। ছেলে-মেয়ের মধ্যে বিভেদ ঠিক নয়। আর পাঁচটা মতোই এই দিন নিজের মেয়েকে মা লক্ষী রূপে সাজিয়ে পুরোহিত ডেকে আরাধনা করতে দেখা গেল কৃষ্ণগঞ্জের শিবনিবাসের বিশ্বাস দম্পতিকে। পরিবারের কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার এলাকার বিশিষ্ট পুরোহিত তরুণ ব্যানার্জি বলেন, মেয়েরা মায়ের সমান। মেয়েকে লক্ষী রূপে পূজা করাটা বিধিসম্মত। সমাজ থেকে শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে প্রত্যেক পরিবারের উচিত মেয়েকে লক্ষী
রূপে পূজা করা। কারণ এই মেয়ে একদিন বড় হয়ে অন্য ঘরে যাবে। পুরোহিতের দৃঢ় বিশ্বাস, মেয়েকে যদি লক্ষী রূপে রাখা যায়, পরের ঘরেও সে সংসারকে আলোকিত করবে। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে কুমারী পূজার প্রচলন থাকলেও কোন শিশু কন্যাকে লক্ষী রূপে আরাধনা করার ঘটনা নজিরবিহীন। দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, আজ নিজের কন্যাকে লক্ষী রূপে পূজা করে তার মাধ্যমে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলাম যেন সমাজের যে সমস্ত মানুষেরা নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আন্দোলন করছেন, ধর্নায় বসেছেন, অন্যদিকে যারা যোগ্য হওয়া সত্বেও অযোগ্য শিক্ষকদের জন্য চাকরি হারিয়েছেন, তারা যেন চাকরি ফিরে পান। মা লক্ষ্মীর কৃপায় তারা ফিরে পেয়ে তাদের ঘরের মেয়েকে, সন্তানদের নিয়ে পুজোর আনন্দে মেতে উঠুক। যোগ্যদের জন্য সেই প্রার্থনা করলাম। শ্রুতির মা লক্ষী বিশ্বাস বলেন আমাদের মেয়ে সত্যিই লক্ষী তাকে এই পুরনো দিনে লক্ষ্মী রূপে পুজো করতে পেরে আমরা গর্বিত।’ পরিযায়ী শ্রমিক দম্পতির বাড়িতে একরতি লক্ষ্মীর পুজো ও তাদের কর্মকাণ্ড দেখতে বড় সংখ্যায় আশেপাশের প্রতিবেশী ভিড় জমিয়েছেন। সবাই এই কাজের প্রশংসা করেছেন এবং সমাজে এ ধরণের সচেতনতা ছড়ানোর প্রতি আশাবাদী হয়েছেন।






