‘বৈভবের ব্যাট সুইং অসাধারণ’, বিস্ময় কিশোরকে নিয়ে মুগ্ধ সচিন
এর আগেও অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের হয়ে ১৭৫ রান করে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন বৈভব।
Truth of Bengal: ক্রিকেট ভারতে শুধুই একটি খেলা নয়, কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা এবং বিশ্বাসের নাম। এই দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সময়ের সঙ্গে বদলেছে নায়কের মুখ। নব্বইয়ের দশকে উদ্বেগে ভরা এক নতুন ভারতের আশার প্রতীক ছিলেন সচিন তেন্ডুলকর। পরে ছোট শহর থেকে উঠে এসে মহেন্দ্র সিং ধোনি ভারতকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ জিততে হয়। তারপর বিরাট কোহলি নিজের আগ্রাসন, আবেগ আর রানক্ষুধা দিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেন। আর এখন আইপিএলের মঞ্চে জন্ম নিচ্ছে আরও এক নতুন অধ্যায়— বৈভব সূর্যবংশীর অধ্যায়।
বুধবার রাতে নিউ চণ্ডীগড়ে রাজস্থান ও হায়দরাবাদের এলিমিনেটর ম্যাচে ১৫ বছরের এই কিশোর যা করলেন, তা শুধু একটি বিধ্বংসী ইনিংস নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যতের ঝলক। মাত্র ২৯ বলে ৯৭ রান করে বৈভব বুঝিয়ে দিলেন, তিনি শুধুই সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার নন, তিনি এমন এক প্রতিভা যিনি ম্যাচের রং বদলে দিতে পারেন কয়েক মিনিটের মধ্যে।
এই ইনিংসের আগে পর্যন্ত বৈভবকে নিয়ে আলোচনা ছিল সতর্কতার সুরে। কেউ তাঁকে ভবিষ্যতের তারকা বলছিলেন, কেউ আবার এত দ্রুত তাঁকে জাতীয় দলে তোলার বিরুদ্ধে মত দিচ্ছিলেন। কিন্তু প্যাট কামিন্সদের মতো বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে নকআউট ম্যাচে যেভাবে তিনি ব্যাট করলেন, তাতে সব সংশয় উড়ে গিয়েছে।
তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল না কোনও ভয়, কোনও দ্বিধা বা চাপের ছাপ। বরং মনে হচ্ছিল, গোটা মাঠটাই যেন তাঁর নিজের মঞ্চ। বল মাঠের কোথায় পড়বে, তা যেন আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন বৈভব। তাঁর স্ট্রাইক রেট ছিল ২৩০। মাত্র ২৯ বল খেলেই হাঁকিয়েছেন ১২টি ছক্কা। এক মরশুমে সর্বাধিক ছক্কার পুরনো রেকর্ড ভেঙে তিনি পৌঁছে গিয়েছেন ৬৫ ছক্কায়। এত দিন এই রেকর্ড ছিল ক্রিস গেইলের নামে, যিনি এক মরশুমে ৫৯টি ছক্কা মেরেছিলেন।
শতরান থেকে মাত্র তিন রান দূরে থামতে হয়েছে বৈভবকে। বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ দিয়ে ফিরতে হয় তাঁকে। তবে তাঁর সেই ৯৭ রানের ইনিংসই এখন ক্রিকেট বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। দ্রুততম শতরানের রেকর্ডও প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছিলেন তিনি।
এটাই প্রথম নয়। এর আগেও অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের হয়ে ১৭৫ রান করে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন বৈভব। সেই ইনিংসেই বোঝা গিয়েছিল, তিনি শুধু বড় শট মারতে জানেন না, পরিস্থিতি বুঝে ইনিংস গড়ার ক্ষমতাও রাখেন। চাপের মুহূর্তে নিজেকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, সেই পরিণতিও দেখা গিয়েছিল তাঁর মধ্যে।
বৈভবকে নিয়ে সবচেয়ে বড় আলোচনা এখন তাঁর মানসিকতা ঘিরে। টি-২০ ক্রিকেটে পাওয়ার হিটারের অভাব নেই। কিন্তু বৈভবকে আলাদা করছে তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং ম্যাচকে নিজের শর্তে খেলানোর ক্ষমতা। তিনি যখন উইকেটের গভীরে দাঁড়িয়ে ঘণ্টায় ১৪৫ কিলোমিটার গতির বলের অপেক্ষা করেন, তখন তাঁর মধ্যে যেন পুরনো কিংবদন্তিদের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈভবের মধ্যে সচিন তেন্ডুলকরের ব্যাটিংয়ের স্বচ্ছতা, মহেন্দ্র সিং ধোনির শক্তিশালী ব্যাট সুইং এবং বিরাট কোহলির আত্মবিশ্বাস— সব কিছুর মিশেল রয়েছে। যেন ভারতীয় ক্রিকেটের সেরা বৈশিষ্ট্যগুলি এক শরীরে এসে মিশেছে।
এই ইনিংস দেখে মুগ্ধ হয়েছেন স্বয়ং সচিন তেন্ডুলকরও। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘বৈভব সূর্যবংশীর ব্যাট সুইং অসাধারণ। আরও বেশি উল্লেখযোগ্য হল, পায়ের ব্যবহার করে যেভাবে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করে নেয়। সেই স্বাধীনতাই ওকে নিজের মতো খেলতে সাহায্য করে। ইনিংসটা ছিল সত্যিই দর্শনীয়।’
শুধু সচিন নন, বৈভবের প্রশংসায় ভাসছেন আরও একাধিক প্রাক্তন তারকা। যুবরাজ সিং লিখেছেন, ‘ছোট্ট বস বিশ্বরেকর্ড ভেঙে দিল। এই ছেলেকে খেলতে দেখাটা অসাধারণ।’ হরভজন সিংয়ের কথায়, ‘এক দিকে গোটা বিশ্ব, অন্য দিকে বৈভব সূর্যবংশী। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাটার।’ শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি সনৎ জয়সূর্যও বলেছেন, ‘এত কম বয়সে এমন আত্মবিশ্বাস খুব কম দেখা যায়। ক্রিকেট এক বিশেষ প্রতিভা পেতে চলেছে।’
ভারতীয় ক্রিকেট সচিন তেন্ডুলকরের পর আরও এক কিশোর বিস্ময়ের জন্য প্রায় চার দশক অপেক্ষা করেছে। এখন মনে হচ্ছে, সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বৈভব সূর্যবংশী নিজের যুগ শুরু করতে চলেছেন। তিনি এখন শুধু রান করছেন না, বোলারদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিচ্ছেন। আর ক্রিকেটপ্রেমীরা বুঝতে শুরু করেছেন, ভারতীয় ক্রিকেটের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় নাম হয়তো ইতিমধ্যেই এসে গিয়েছে।






