দেশ

অসমে মেরুকরণের মহাযুদ্ধ, ফুরিয়ে গেল এআইইউডিএফ, সংখ্যালঘু ভোটে একাধিপত্য কংগ্রেসের!

আগে সংখ্যালঘু ভোট কংগ্রেস ও এআইইউডিএফ-এর মধ্যে ভাগ হয়ে যেত, যা অনেক ক্ষেত্রে বিজেপি ও অগপ জোটকে বাড়তি সুবিধা দিত

Truth of Bengal: ২০২৬ সালের অসম বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল রাজ্যে এক স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেস মূলত মুসলিম প্রধান কেন্দ্রগুলিতে জয়লাভ করেছে। অন্য দিকে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট হিন্দু ভোট ব্যাংক সংহত করার পাশাপাশি আদিবাসী এবং চা-শ্রমিকদের সমর্থন আদায় করে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে। উল্লেখ্য যে, এই শ্রমিক শ্রেণি ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেসের ভোটার হিসেবে পরিচিত ছিল।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মেরুকরণের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা এআইইউডিএফ-এর বিপর্যয়। দীর্ঘ সময় ধরে অসমের প্রায় ৩৫ শতাংশ বাংলাভাষী মুসলিম বা ‘মিঞা’ সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব করে আসা এই দলটি এবার সাংগঠনিক শক্তি এবং জনসমর্থন হারিয়েছে। আগে সংখ্যালঘু ভোট কংগ্রেস ও এআইইউডিএফ-এর মধ্যে ভাগ হয়ে যেত, যা অনেক ক্ষেত্রে বিজেপি ও অগপ জোটকে বাড়তি সুবিধা দিত। কিন্তু এবার সেই ভোট বিভাজন বন্ধ হয়ে সংখ্যালঘু ভোটাররা কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকেছেন।

মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এবার এক ধরণের কৌশলগত ভোটদানের প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। অনেকের মধ্যেই এই ধারণা কাজ করেছে যে, বিজেপিকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ দেওয়ার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসেরই রয়েছে। ফলে অনেক দুর্বল কংগ্রেস প্রার্থীর কেন্দ্রেও সংখ্যালঘু ভোটের ব্যাপক সংহতকরণ দেখা গিয়েছে। পালটা কৌশল হিসেবে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে বিজেপিও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু ভোট এককাট্টা করতে সফল হয়েছে। বিশেষ করে আপার অসম, উত্তর পাড় এবং মধ্য অসমের একাংশে লড়াইটি সরাসরি আদর্শগত দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছিল, যেখানে কংগ্রেস কার্যত প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনী মেরুকরণের ক্ষেত্রে দারাং এবং নগাঁও জেলায় পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানগুলো বড় প্রভাব ফেলেছে। এক দিকে সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে এই অভিযান নিয়ে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, অন্য দিকে আদিবাসী অসমীয়া বা ভূমিপুত্রদের বড় অংশ একে জমি রক্ষা এবং প্রশাসনিক দৃঢ়তা হিসেবে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন লোয়ার অসমের বাংলাভাষী মুসলিমরা কংগ্রেসের পেছনে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তেমনই সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় বিজেপির প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছে।

এআইইউডিএফ-এর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারানোর পেছনে দলটির বিরুদ্ধ ওঠা ‘বিজেপি ঘনিষ্ঠতা’-র অভিযোগ বড় ভূমিকা নিয়েছে। রাজ্যসভার নির্বাচনে বিজেপিকে সমর্থন করার ঘটনাটি জনমানসে এমন এক ধারণার জন্ম দেয় যে, দলটি পরোক্ষভাবে বিজেপিকেই সুবিধা করে দিচ্ছে। এই অবিশ্বাসের কারণেই সংখ্যালঘু ভোটাররা এআইইউডিএফ ত্যাগ করে কংগ্রেসের ছাতার নিচে আশ্রয় নেন। সবশেষে, ২০২৩ সালের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন অসমের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে। নতুন সীমানা বিন্যাসের ফলে মিশ্র জনসংখ্যার কেন্দ্রগুলো কমে গিয়ে জনতাত্ত্বিকভাবে মেরুকরণ স্পষ্ট হয়েছে এমন কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়েছে। আগে কংগ্রেস সংখ্যালঘু এবং হিন্দু ভোটের সমন্বয়ে জয়লাভ করত, কিন্তু নতুন বিন্যাসে অধিকাংশ আসন হয় হিন্দু প্রধান নয়তো মুসলিম প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে অন্তত ৩৫টি আসনে মুসলিম ভোট নির্ণায়ক ভূমিকা নিত, সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর তা কমে ২২টি আসনে ঠেকেছে। ২০২৬ সালের এই রায় অসমের রাজনীতিতে জোট রাজনীতির বদলে গোষ্ঠীভিত্তিক নির্বাচনি মেরুকরণের এক নতুন অধ্যায় শুরু করল।

Related Articles