কৌশল বদলে ১০ বছর পর কেরলে প্রত্যাবর্তন কংগ্রেসের
কেরল বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনেই বড় জয় পায় কংগ্রেস।
Truth of Bengal: হাওয়া ছিলই। সেইমতো কেরলে ১৪০ আসনে ঝড় তুলল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই প্রত্যাবর্তনের মূল চাবিকাঠি ছিল একটাই—দলীয় ঐক্য। গতবার অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই কেরলে কংগ্রেসের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। এবার সেই ভুল আর করতে রাজি ছিল না হাইকমান্ড। তাই ভোটের আগেই সংগঠনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও একজোট করতে একাধিক কৌশল নেয় কংগ্রেস নেতৃত্ব।
কেরল বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনেই বড় জয় পায় কংগ্রেস। সেই জয়ই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, রাজ্যে ফের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা প্রবল। তবে সেই সম্ভাবনাই আবার দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে তুলতে পারে—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়। ফলে শুরু থেকেই সতর্ক হয় হাইকমান্ড।
বছরের শুরুতেই তিরুবনন্তপুরমের সাংসদ শশী থারুরকে ঘিরে নানা জল্পনা ছড়ায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে থারুরের সঙ্গে বৈঠক করেন রাহুল গান্ধি ও কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। বৈঠকের পর থারুরকে প্রচার কমিটির সহ-সমন্বয়ক করা হয়। এরপর রাজ্যজুড়ে ব্যাপক প্রচারে নামেন থারুর, যা দলের মধ্যে ঐক্যের বার্তা দেয়। টিকিট বণ্টনের দায়িত্বে কেরলে পাঠানো হয় কংগ্রেসের ভরসাযোগ্য নেতা মধুসূদন মিস্ত্রিকে। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটি ফিডব্যাক পায়—রাজ্যে সরকার বদলের ইচ্ছা থাকলেও বসা বিধায়কদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ নেই। সেই তথ্য মাথায় রেখেই কংগ্রেস এক কৌশলী সিদ্ধান্ত নেয়—তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা। একই সঙ্গে ঠিক হয়, কোনও বর্তমান সাংসদকে বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী করা হবে না। যদিও এই সিদ্ধান্তে দলের মধ্যে আপত্তি ওঠে।
নাম না করে দলীয় সূত্রের দাবি, মনোনয়ন জমার ঠিক আগে বসা সাংসদ ও প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুধাকরন প্রার্থী হওয়ার দাবি তুলে হাইকমান্ডকে চাপে ফেলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রবীণ নেতা এ কে অ্যান্টনিকে। খাড়গে সুধাকরনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং রাহুল গান্ধি তাঁর পরিবারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। এর ফলে স্পষ্ট বার্তা যায়—হাইকমান্ড তাঁর অবদানকে গুরুত্ব দিচ্ছে। মনোনয়ন পর্বের পর বিদ্রোহী নেতাদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে উদ্যোগী হন কে সি বেণুগোপাল। দলীয় ঐক্য বজায় রাখতে তিনি নিজে বিদ্রোহীদের বাড়ি গিয়ে আলোচনা করেন বলে জানা গিয়েছে।
ভোটের ঠিক আগে কংগ্রেস আচমকাই একটি শৃঙ্খলিত ও সংঘবদ্ধ দলের ছবি তুলে ধরে। এই সংগঠনগত পুনর্গঠনের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কেরল কংগ্রেসের ইনচার্জ দীপা দাসমুন্সি। এরপর শুরু হয় আক্রমণাত্মক প্রচার। সিপিএম নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকে সরাসরি নিশানা করে কংগ্রেস।
প্রচারে নেতৃত্ব দেন রাহুল গান্ধি নিজেই। তিনি মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তোলেন। পাশাপাশি কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি হিসেবে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্পকে সামনে আনা হয়, যা ভোটারদের মধ্যে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। মুসলিম লিগের সঙ্গে জোট থাকায় সংখ্যালঘু ভোট নিজেদের ঝুলিতে রাখার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিল কংগ্রেস। তবু কোনও ঝুঁকি না নিয়ে কবি ও সাংসদ ইমরান প্রতাপগড়হিকে প্রচারে নামানো হয়।
অন্যদিকে কংগ্রেসের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্ক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সমর্থন নিশ্চিত করতে দল রাজ্য সভাপতি হিসেবে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সানি জোসেফকে সামনে আনে। পাশাপাশি কেন্দ্রের প্রস্তাবিত ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) সংশোধনী বিলও খ্রিস্টান ভোটারদের মধ্যে বিজেপি-বিরোধী মনোভাব জোরদার করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। কংগ্রেসের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী কে সি বেণুগোপাল, ভি ডি সাথীশন এবং রমেশ চেন্নিথালা—তিনজনই নায়ার সম্প্রদায়ের।





