সম্পাদকীয়

মানবাধিকার: কাগজে অধিকার, বাস্তবে বঞ্চনা

বিশ্বের যে কোনও অঞ্চল— সোমালিয়া, বসনিয়া, চেচনিয়া, মায়ানমার, সুদান, লিবিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত-বিধ্বস্ত দেশগুলি— সব জায়গাতেই মানবাধিকার লঙ্ঘন নতুন কোনও ঘটনা নয়।

মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: অধিকার ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। এই সহজ সত্যটিই আজ বহু দেশে, এমনকি বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলেও পরিচিত আমাদের দেশেও, নির্মমভাবে উপেক্ষিত। মানুষের জন্মগত কিছু অধিকার— বাতাস, খাদ্য, আশ্রয়, মতপ্রকাশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আর সর্বোপরি স্বাধীনতা— এসব কোনও রাষ্ট্র বা প্রশাসনের দান নয়; মানুষের জন্মসত্তা। অথচ সভ্যতার দম্ভে আমরা যত অগ্রসর হচ্ছি, ততই এই মৌলিক অধিকারের ভিত্তি কাঁপছে। যে সমাজে মানুষের ন্যূনতম বেঁচে থাকার শর্তও সুরক্ষিত নয়, সেই সমাজে আইন, গণতন্ত্র, উন্নয়ন— সবই এক ধরনের প্রহসনে পরিণত হয়। আজ মানবাধিকার প্রশ্নে আমাদের দেশ যে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, তা স্বীকার করতে লজ্জা লাগে ঠিকই, তবে চোখ বন্ধ করে থাকার কোনও সুযোগও নেই; কারণ অধিকারবঞ্চিত মানুষের আর্তনাদ এখন প্রতিটি রাষ্ট্রের মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি।

বিশ্বের যে কোনও অঞ্চল— সোমালিয়া, বসনিয়া, চেচনিয়া, মায়ানমার, সুদান, লিবিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত-বিধ্বস্ত দেশগুলি— সব জায়গাতেই মানবাধিকার লঙ্ঘন নতুন কোনও ঘটনা নয়। যুদ্ধ, দমন-পীড়ন, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, রাষ্ট্রীয় নিস্পৃহতা— সব মিলিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকারের ভিত্তিই ক্রমশ ভেঙে পড়েছে। ভারতও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। স্বাধীনতার আট দশক পরে আজও দেশজুড়ে নারী অত্যাচার, কন্যাভ্রূণ হত্যা, পণপ্রথা, শিশুশ্রম, আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, বিচারব্যবস্থার জটিলতা ও পক্ষপাত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, ভুয়ো মামলায় মানুষকে হয়রান করা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নামে দমন— সবই কার্যত প্রতিদিনের খবর। যে দেশে খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান বা শিক্ষার মতো মৌলিক মানবাধিকারকে হাজার হাজার মানুষ স্বপ্ন বলে মনে করে, সেই দেশ মানবাধিকার রক্ষার মুখ্য আলোচনার জায়গায় পৌঁছে গেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে উন্নতির গ্রাফ আজও ভয়াবহভাবে নিম্নমুখী।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণগুলি যে বহুমাত্রিক তা অস্বীকার করা যায় না। রাজনৈতিক দলাদলি, ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীর প্রতিহিংসাপরায়ণতা, প্রশাসনিক দুর্নীতি, গোষ্ঠীস্বার্থ, সামাজিক কুসংস্কার, শিক্ষার অভাব, দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য— সবই মিলিতভাবে একটি দেশের মানবাধিকার কাঠামোকে দুর্বল করে। যে সমাজে মানুষ পিছিয়ে থাকে দারিদ্র্য, অশিক্ষা বা সামাজিক অনিরাপত্তার কারণে, সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন যেন এক নীরব মহামারী। লাখ লাখ শিশু আজও হোটেল-রেস্তোরাঁ, ইটভাটা বা কারখানায় কাজ করছে। হাজারো নারী পণপ্রথা, যৌন নিপীড়ন, সহিংসতার শিকার। বহু অঞ্চল এখনও সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও প্রশাসনিক উপেক্ষায় জর্জরিত। যাদের রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, তাদেরই কখনও কখনও অমানবিক আচরণের শিকার হতে হয় সরকারি ব্যবস্থার মধ্যেই। ফলে মানুষের আইনগত অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা আজ প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ।

এমন প্রেক্ষাপটেই ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রসংঘ ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলন আয়োজন করে। অন্তর্দেশীয় ও বহির্দেশীয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের উৎস, কারণ ও সমাধান নিয়ে দুই সপ্তাহ আলোচনা চলেছিল। বহু দেশের প্রতিনিধি, মানবাধিকার সংস্থা ও নাগরিক সংগঠন এতে অংশগ্রহণ করেছিল। অথচ বহু বিতর্ক, রাজনৈতিক অবস্থান, মতভেদ ও জাতিগত-ধর্মীয় টানাপোড়েনের কারণে সেই সম্মেলন থেকে প্রত্যাশিত ফল মিলেনি। যদিও সিদ্ধান্ত হয়েছিল— কোনও শক্তিশালী দেশ দুর্বল দেশের ওপর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চাপ সৃষ্টি করবে না, কোনও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় সংখ্যালঘুদের ওপর জাতিগত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নিপীড়ন চালাবে না, এবং রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার সনদ সবার জন্য বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, সেই সনদ কাগজে আছে, বাস্তবে তার প্রয়োগের সদিচ্ছা বহু রাষ্ট্রেই নেই।

ভিয়েনা সম্মেলনের পরই ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। ফলত ১৯৯৩ সালের অক্টোবর মাসে গঠিত হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন— জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন)। এর কাজ ছিল দেশের যে কোনও ব্যক্তির মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। শিশু, নারী, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, বন্দি, প্রতিবন্ধী— সব শ্রেণির মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল এই কমিশনের ওপর। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— এই কমিশন কতটা কার্যকর? কারণ গত তিন দশকে বহু ঘটনার পরেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। ভুয়ো এনকাউন্টার, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক হয়রানি, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীর ওপর আক্রমণ, সংখ্যালঘু বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন— এই সব ক্ষেত্রেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-এর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা কম নেই। সত্যিই কি মানবাধিকারের রক্ষকরা ক্ষমতার সামনে স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে পারছেন? মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র নিয়ে থাকলেও বাস্তবতা হল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের ব্যবহারই অভিযোগের কেন্দ্রে।

মানবাধিকার রক্ষার মূল নির্ভর করে মানবউন্নয়ন সূচকের ওপর। কারণ কোনও দেশের মানব উন্নয়ন সূচকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয়, পুষ্টি, আয়ু, নিরাপত্তা— সবই মানুষের মৌলিক অধিকার কতটা রক্ষিত হয়েছে তার প্রতিফলন। যে দেশে মানব উন্নয়ন সূচক ভাল, সেখানকার মানুষের মানবাধিকারও তুলনামূলক সুরক্ষিত। জাপান, কানাডা, নরওয়ে বা সুইডেন এই তালিকার শীর্ষে থাকা কেবল অর্থনৈতিক শক্তির প্রমাণ নয়; বরং নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার পরিচয়।

অথচ এই পরিমাপে ভারত বিশ্বের ১৩৪ তম স্থানে। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরও দেশ যদি শেষের দিক থেকে ‘চতুর্থ’ হয়, তা হলে স্পষ্ট যে কোটি কোটি মানুষ এখনও বঞ্চিত তাদের প্রাথমিক অধিকার থেকে। যে দেশে দারিদ্র্য, অপুষ্টি, শিক্ষাবঞ্চনা, বেকারত্ব, নারী-নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অভাব, গোষ্ঠীগত সহিংসতা— এসব এখনও নিত্যদিনের ঘটনা, সেই দেশে মানবাধিকার একধরনের বিলাসিতার মতো শোনায়। এই লজ্জাজনক অবস্থাকে শুধু ‘শত্রুপক্ষের অপপ্রচার’ বলে এড়ানোর কোনও সুযোগ নেই। বরং বুঝতে হবে, মানবাধিকার প্রশ্নে যেই সমাজ ব্যর্থ, সেই সমাজের গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। উন্নয়ন, অর্থনীতি, আইনব্যবস্থা— সবই কেবল পরিকাঠামো; মূল ভিত্তি হল মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা।

এসব সমস্যার সমাধান কী? প্রথমত, মানবাধিকার রক্ষার প্রয়াসকে কোনওভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা চলবে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটা আন্দোলন মানবতার পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে পরিণত হয়। রাজনীতি মানবাধিকারকে যদি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তবে অধিকার রক্ষার লড়াই কখনই সঠিক পথে এগোতে পারে না। দ্বিতীয়ত, মানুষের সার্বিক সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই সমস্যার সমাধান নেই। মানুষ যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অনভিজ্ঞ থাকে, তা হলে যে কোনও সরকার তাদের অধিকার কেড়ে নিতে পারে খুব সহজেই। যে রাষ্ট্রনায়ক বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী চায় মানুষ চিরকাল অজ্ঞ থাকুক, তাদের উদ্দেশ্য একটাই— অধিকারহীন জনতাকে দিয়ে ক্ষমতা রক্ষা করা। তাই গণতন্ত্রের প্রথম শর্তই হল— মানুষকে সচেতন, শিক্ষিত ও স্বনির্ভর করে তোলা।

তৃতীয়ত, বিচারব্যবস্থাকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে হবে। বিচারহীনতা, বিলম্বিত বিচার বা ভুয়া মামলার মাধ্যমে হয়রানি— এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম উৎস। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, শ্রমিক, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী— এই দুর্বল গোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন শুধু কাগজে থাকলে চলে না; তার বাস্তব প্রয়োগের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রয়োজন।

চতুর্থত, উন্নয়নকে মানুষের জীবনের মানোন্নয়নের দিকে কেন্দ্রিত করতে হবে। উন্নয়নের নাম করে যদি মানুষ স্থানচ্যুত, বঞ্চিত বা নিঃস্ব হয়ে যায়, তবে তা প্রকৃত উন্নয়ন নয়। খাদ্য, পানীয়জল, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, বাসস্থান— এই মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ হলেই কেবল মানবাধিকার প্রশ্নে একটি দেশ মাথা উঁচু করতে পারে।

১০ ডিসেম্বর ‘মানবাধিকার দিবস’ পালিত হয় ঠিকই, কিন্তু দিনপঞ্জিতে একটি দিন চিহ্নিত করলেই যে অধিকার রক্ষিত হবে, তা নয়। অধিকার রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন মানুষের সমষ্টিগত প্রতিজ্ঞা, সমাজের নৈতিক সাহস ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। কারণ অধিকার রক্ষার লড়াই কোনও এক দিনের নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।

মোটা দাগে সত্যিটা হল— মানুষ যদি সুস্থ, নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বাধীনভাবে বাঁচতে না পারে, তবে মানবাধিকার শব্দটি কেবল এক শূন্য প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকে। স্বাধীনতার দাবি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক স্বাধীনতার সমষ্টি। তাই এখনও অনেক কিছু করার আছে— রাষ্ট্রের, সমাজের, নাগরিকের। মানবাধিকারের শিকড়কে শক্ত করতে হলে মানুষকে সচেতন, সংঘবদ্ধ ও মানবিক হতে হবে। মানুষের অধিকার রক্ষা কোনও দয়ার দান নয়; এটি মানবসভ্যতার চিরন্তন দায়িত্ব।