রাজ্যের খবর

নথি সরানোর অভিযোগে ভদ্রেশ্বর পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজ খান গ্রেফতার, পুরবোর্ড ভাঙার আশঙ্কায় তৃণমূল

পুরসভার এগজিকিউটিভ অফিসার বা ইও (EO)-র দায়ের করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে শুক্রবার দুপুরে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে

Truth of Bengal: রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে হুগলির ভদ্রেশ্বর পুরসভাকে কেন্দ্র করে তৈরি হল নজিরবিহীন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংকট। পুরসভার নথিপত্র সরিয়ে ফেলার গুরুতর অভিযোগে এবার গ্রেফতার হলেন ভদ্রেশ্বর পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান তথা বিশিষ্ট তৃণমূল নেতা ফিরোজ খান। পুরসভার এগজিকিউটিভ অফিসার বা ইও (EO)-র দায়ের করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে শুক্রবার দুপুরে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। এর ঠিক আগের দিনই, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার পুরসভার চেয়ারম্যান প্রলয় চক্রবর্তীসহ আটজন তৃণমূল কাউন্সিলর একসঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন। চেয়ারম্যানের ইস্তফার পর পুরসভার রাশ যখন সাময়িকভাবে ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজের হাতে আসার কথা, ঠিক তখনই তাঁর এই গ্রেফতারে ভদ্রেশ্বর পুরবোর্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে শাসকদলের অন্দরে।

পুরসভা এবং পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরেই ভদ্রেশ্বর পুরসভার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এই বিষয়ে পুরসভার এগজিকিউটিভ অফিসার সরাসরি ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজ খানের বিরুদ্ধে সরকারি নথি লোপাট বা সরিয়ে ফেলার অভিযোগ এনে ভদ্রেশ্বর থানায় এফআইআর দায়ের করেন। এছাড়াও অভিযোগ ওঠে, দিন দুয়েক আগে পুরসভায় গিয়ে চরম অশান্তি ও ঝামেলা করেছিলেন তিনি। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই শুক্রবার দুপুরে ফিরোজ খানকে থানায় ডেকে পাঠায় পুলিশ। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁর বয়ানে অসঙ্গতি মেলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। শনিবার ধৃত তৃণমূল নেতাকে চন্দননগর আদালতে হাজির করানো হবে। চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি (চন্দননগর) জানিয়েছেন, ফিরোজ খানের বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ রয়েছে, যা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

গ্রেফতার হওয়া ফিরোজ খান ভদ্রেশ্বরের তেলিনিপাড়া এলাকার দাপুটে তৃণমূল নেতা হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালের পুরসভা নির্বাচনে জিতে কাউন্সিলর হওয়ার পর দল তাঁকে ভদ্রেশ্বর পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান পদে বসায়। রাজনৈতিক মহলে তিনি চন্দননগরের প্রাক্তন বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের অত্যন্ত ‘আস্থাভাজন’ বলে পরিচিত। ইতিপূর্বেও তেলিনিপাড়া এলাকার একাধিক অশান্তির ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়েছিল। ভদ্রেশ্বর পুরসভার এই সংকটের পটভূমি তৈরি হয়েছিল বৃহস্পতিবারই। চন্দননগর বিধানসভার অন্তর্গত এই পুরসভায় মোট ২২টি ওয়ার্ড রয়েছে। গত পুর নির্বাচনে ২০টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল এবং বাকি দু’টি আসনে জেতা বিজেপি ও নির্দল প্রার্থীও পরে তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় পুরসভাটি সম্পূর্ণ বিরোধীশূন্য হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে এই বিরোধীশূন্য পুরসভার ১৪টি ওয়ার্ডেই ব্যাপক ভোটে পিছিয়ে পড়ে তৃণমূল কংগ্রেস। খোদ হেভিওয়েট প্রার্থী ইন্দ্রনীল সেন চন্দননগর বিধানসভায় মোট ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত হন।

দলের এই বিপর্যয়ের নৈতিক দায় স্বীকার করে বৃহস্পতিবার পুরসভার ইও-র কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন চেয়ারম্যান প্রলয় চক্রবর্তী। তাঁর দেখাদেখি আরও আটজন কাউন্সিলরও ইস্তফা দেন। তৃণমূলের একটি অংশের দাবি, রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর পুরসভার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুদান বা ফান্ড পেতে সমস্যা হচ্ছিল, যার কারণে কাজ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে, বিজেপির একাংশের কটাক্ষ, বিগত দিনে পুর নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে নাম জড়ানোর আশঙ্কায় আইনি খাঁড়া থেকে বাঁচতেই আগেভাগে পদ ছেড়েছেন এই কাউন্সিলরেরা। চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের গণ-ইস্তফার পর তৃণমূলের অন্দরে ধারণা ছিল, পুরবোর্ড টিকিয়ে রেখে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজ খান। কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই ফিরোজ খান গ্রেফতার হওয়ায় ভদ্রেশ্বর পুরসভা এখন সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন এবং চরম প্রশাসনিক স্তব্ধতার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই পুরবোর্ড ভেঙে দিয়ে সেখানে কোনও সরকারি প্রশাসক বসানো হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।

Related Articles