পানিহাটিতে অবশেষে ঝোলার মধ্যে থেকে বের হল বিড়াল
প্রার্থী তালিকায় জ্বল জ্বল করছে পানিহাটি কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থীর নাম। তিনি রত্না দেবনাথ।
জয়ন্ত চক্রবর্তী: সেই ১৪ আগস্টের রাতটিকে নিশ্চয়ই কেউ ভুলে যাননি! ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট ‘ফ্রিডম আট মিডনাইট’ এসেছিল, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তাঁর ভাষণে ‘ট্রিস্ট অফ ডেসটিনি’-র কথা তুলে বলেছিলেন, এই মধ্যরাতে গোটা ভারত যখন ঘুমিয়ে তখন এক স্বপ্ন দেখার শুরু হল। ভারতকে অখণ্ড রেখে বিশ্বের সেরা গণতন্ত্রে পরিণত করার লড়াই। এর ঢের পরে ২০২৪-এর ১৪ আগস্ট শুধু এই কলকাতায় নয়, গোটা ভারত তো বটেই সারা বিশ্বের মানুষ দেখেছিল রাত দখলের লড়াই। আরজি কর হাসপাতালে ধর্ষিত ৩১ বছরের চিকিৎসকের খুনের প্রতিবাদে বিশ্বজুড়ে এক অভিনব প্রতিবাদ। মশাল জ্বলে উঠেছিল সেদিন কলকাতার রাজপথে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সেদিন সেই মধ্য রাতে যে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল তাকে কুর্নিশ করেছিল এই বাংলা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সেদিন গিয়েছিলেন আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারদের ক্ষোভ মেটাতে। তারপর গঙ্গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। আরজি কর ধর্ষণ দগদগে ক্ষতের মতো চেপে বসেছে এই বাংলার হৃদয়ে। স্মৃতি অনেক সময়ই বন্ধ্যা, তাই কালের নিয়মে আরজি কর আজ অনেকটাই স্মৃতির অন্তরালে। সেই দগদগে স্মৃতিটিকে আবার খুঁচিয়ে বের করল বিজেপি।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তাদের দ্বিতীয় প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হয়েছে বুধবার। এবং এই প্রার্থী তালিকায় জ্বল জ্বল করছে পানিহাটি কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থীর নাম। তিনি রত্না দেবনাথ। কে এই রত্না দেবনাথ? প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক এবং ডিজিটাল মিডিয়ার কল্যাণে কারও আর জানতে বাকি নেই যে এই রত্না দেবনাথ হলেন আরজি করের নির্যাতিতা, ধর্ষিত এবং মৃত ওই চিকিৎসক ‘অভয়া’র মা। এই স্বাধীন দেশে কে কোন দলের প্রার্থী হবেন সেটি সম্পূর্ণ ভাবে ব্যক্তি স্বাধীনতা। সেই বিষয়ে বলার কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্নটি এসে যায় যখন অভয়ার মা বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হন। অভয়া আন্দোলনের যে সর্বজনীনতা, স্বতঃস্ফূর্তটা ছিল তা কি একটু হলেও ধাক্কা খাবে না এতদ্বারা? যা ছিল মানুষের আবেগ তাকে একটি রাজনৈতিক দলের কুক্ষিগত করাটা কি উচিত হল? একবারও ভাববেন না যে পানিহাটির তৃণমূল প্রার্থী, বিধানসভায় দীর্ঘদিনের মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষের পুত্র তীর্থঙ্কর ঘোষ অথবা বাম প্রার্থী কলতান দাসগুপ্তর সমর্থনে কথা বলছি।
বাংলার বুকে আজ আওয়াজ উঠেছে, অভয়া আমাদের সবার। তাকে এই ভাবে বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টাটি কি ‘হারাকিরি’ করার মতো ঘটনা নয়? বিজেপি অভয়া আন্দোলনের পেছনে আছে— তৃণমূলের একটি অংশের এই অভিযোগটির পালে বাতাস লাগালেন কিনা তা একটু ভেবে দেখবেন শ্রীমতি রত্না দেবনাথ! অভয়াকে কেন্দ্র করে যে আবেগের সৃষ্টি হয়েছে এই বঙ্গে, তাকে যে বিজেপি কাজে লাগাতে চাইবে এই ভোটে— তা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু, আপনি রত্না দেবনাথ রাজি হলেন কী ভাবে? একবারের জন্যও কি আপনার বুক কাঁপল না যে অ্যাপলিটিক্যাল একটি বিষয় কী ভাবে হাইলি পলিটিক্যাল হয়ে যাচ্ছে। কাগজে ছবি দেখলাম আপনি এবং আপনার স্বামী মহা উৎসাহে বিজেপির পতাকা লাগাচ্ছেন বাড়িতে। এই ভাবে অভয়াকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দেগে দেওয়া কি উচিত হচ্ছে? অভয়া না তৃণমূলের, না বিজেপির, কংগ্রেস অথবা বামেদেরও নয়। অভয়া আসলে একটা অনুভূতি, একটি আন্দোলনের নাম। এই নামটির সঙ্গে রাজনীতিকে সংশ্লিষ্ট না করলেই হয়তো অভয়ার আত্মা বেশি শান্তি পেত।





