কলকাতা

৪ বছরে বিমান ভাড়াতেই খরচ হয় ১৫০ কোটি! নির্বাচন কমিশনের অডিট রিপোর্টে ফাঁস চাঞ্চল্যকর তথ্য

গত চার বছরে বিমান ও কপ্টার ভাড়ার খাতেই তৃণমূল খরচ করে ফেলেছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।

Truth of Bengal: বিগত কয়েক বছরে বিমান এবং হেলিকপ্টার ভাড়ার পিছনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের খতিয়ান সামনে আসতেই জোড়াফুল শিবিরের অন্দরে তীব্র বিতর্ক ও ডামাডোল শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে (ECI) জমা দেওয়া দলের বার্ষিক অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, গত চার বছরে বিমান ও কপ্টার ভাড়ার খাতেই তৃণমূল খরচ করে ফেলেছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। দলীয় সূত্রের খবর, এই বিপুল খরচের সিংহভাগই হয়েছে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকাশপথের যাতায়াতের জন্য। কারণ, নির্বাচনী প্রচারের নির্দিষ্ট সময়টুকু বাদ দিলে বাকি সময় দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য সরকারের ভাড়া করা বিমান বা হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন, যার খরচ দলীয় তহবিল থেকে মেটানো হয় না। একটি আঞ্চলিক দল হিসেবে তৃণমূলের এই আকাশছোঁয়া খরচ সমপর্যায়ের অন্য সব রাজনৈতিক দলকে বহুদূরে টেক্কা দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া অডিট রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে বিমান ভাড়া বাবদ তৃণমূলের খরচ হয়েছিল ৩৫ কোটি টাকারও বেশি। ২০২৩ সালে এই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৩ কোটিতে। তবে ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের মেগা বছরে এই খরচ এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬ কোটি টাকার গণ্ডিতে। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৫ সালে রাজ্যে বা দেশে কোনও বড় নির্বাচন না থাকা সত্ত্বেও বিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের পিছনে দল খরচ করেছে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা। একটি রাজ্যের আঞ্চলিক দল হিসেবে আকাশপথে খরচের এই বহর জাতীয় স্তরে বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

তৃণমূলের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন বাবদ দল সর্বমোট প্রায় ৮২ কোটি টাকা খরচ করেছিল। যার মধ্যে শুধু বিমান ভাড়ার পিছনেই চলে গিয়েছে ৪৬ কোটি টাকা, যা মোট নির্বাচনী ব্যয়ের প্রায় ৫৬ শতাংশ। ওই একই আর্থিক বছরে দেশজুড়ে সমস্ত রাজ্যের নির্বাচন মিলিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) বিমান ভাড়া বাবদ খরচ করেছিল প্রায় ১৭৪ কোটি টাকা। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান এবং একটিমাত্র রাজ্যের নিরিখে হিসাব কষলে দেখা যাচ্ছে, আকাশপথের খরচের গতিতে তৃণমূল কার্যত বিজেপিকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য দলের তহবিল থেকে এই আকাশ-বিলাস নিয়ে দলের অন্দরে দীর্ঘদিন ধরে চাপা ক্ষোভ থাকলেও, নির্বাচনী ফলাফলের আগে কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি। তবে লোকসভা ভোটে দলের বিপর্যয় এবং সাম্প্রতিক সাংগঠনিক ভাঙনের পর এবার অভিষেকের এই রাজকীয় বিলাসিতা নিয়ে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিতে শুরু করেছেন। দলের বর্ষীয়ান নেতা তথা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ শুক্রবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, সাধারণ কর্মীদের রক্ত জল করা টাকায় দলীয় তহবিল থেকে চার্টার্ড বিমান বা প্রাইভেট জেট চড়ার এই সংস্কৃতিকে তিনি কোনওভাবেই সমর্থন করেন না। অন্যদিকে, দলের বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও তীব্র আক্রমণ শাণিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যে, যেখানে নিচুতলার আক্রান্ত কর্মীরা আইনি লড়াইয়ের জন্য দলের থেকে ন্যূনতম আর্থিক সাহায্য পাচ্ছেন না, সেখানে শীর্ষ নেতৃত্বের এমন কোটি কোটি টাকার বিলাসিতা কি আদৌ মেনে নেওয়া যায়?

বিদ্রোহী শিবিরের নেতাদের যুক্তি, একজন লোকসভার সাংসদ হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এমনিতেই যাত্রীবাহী বিমানে বিজনেস ক্লাসের সরকারি ভাড়া পেয়ে থাকেন। তার পরেও কেন বারবার বিপুল খরচ করে প্রাইভেট জেট বা চপার ব্যবহার করতে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই চরম ডামাডোলের মাঝেই শুক্রবার রাতে পুলিশি তৎপরতায় তৃণমূলের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট লেনদেনের জন্য ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সূত্রের খবর, ওই অ্যাকাউন্টগুলিতে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা গচ্ছিত রয়েছে। ফলে ওই তহবিলের আইনি অধিকার ফিরে পেতে দলকে এখন আদালতের দরজায় লম্বা লড়াই লড়তে হবে। এই পরিবর্তিত আর্থিক সংকট এবং তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মুখে পড়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এই ‘আকাশ-বিলাস’ ত্যাগ করতে বাধ্য হন কি না, এখন সেদিকেই গভীর নজর রাখছেন জোড়াফুল শিবিরের সাধারণ কর্মী ও রাজনৈতিক মহল।

Related Articles