কলকাতা

রেশন তালিকায় বড়সড় ছাঁটাই! ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ গেলেই কি এবার কাটা যাবে খাদ্যসাথীর নামও?

চলতি বছর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া বা এসআইআর-কে হাতিয়ার করে রাজ্যজুড়ে একটি বিশেষ স্ক্রুটিনি অভিযান চালানো হচ্ছে

Truth of Bengal: রাজ্যের অর্থভাণ্ডারের অপচয় রুখতে এবং ভুয়ো উপভোক্তাদের ছেঁটে ফেলতে এবার এক বড়সড় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চলেছে নতুন সরকার। মূলত খাদ্যসাথী প্রকল্পকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও বেনোজলমুক্ত করাই এখন খাদ্য ও সরবরাহ দফতরের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উদ্দেশ্যে চলতি বছর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া বা এসআইআর-কে হাতিয়ার করে রাজ্যজুড়ে একটি বিশেষ স্ক্রুটিনি অভিযান চালানো হচ্ছে। এই অভিযানের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬৩ লক্ষ ভুয়ো রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নবান্ন সূত্রে জারি করা সরকারি নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, সম্প্রতি শেষ হওয়া নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় যে ৬৩ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ গিয়েছে, তাঁদের ডিজিটাল রেশন কার্ডগুলি দ্রুত ব্লক বা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হবে। তবে এই নিয়মের ক্ষেত্রে কিছু মানবিক ছাড়ও রাখা হচ্ছে। যে সমস্ত নাগরিক ইতিপূর্বে সিএএ-র অধীনে ভারতের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জানিয়েছেন কিংবা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পর এসআইআর ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন, তাঁদের রেশন কার্ড এখনই বাতিল হবে না। চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা পূর্বের মতোই বিনামূল্যে রেশন পাবেন।

এই সম্পূর্ণ শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়াটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক স্তরে সম্পন্ন করার রূপরেখা তৈরি হয়েছে। প্রথম ধাপে সংশ্লিষ্ট এলাকার এসডিও এবং বিডিও-রা তাঁদের এক্তিয়ারভুক্ত অঞ্চলের বাদ পড়া ভোটারদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে তা খাদ্য ও সরবরাহ বিভাগে পাঠাবেন। এরপর ওই দফতরের আধিকারিক ও পরিদর্শকেরা সরাসরি উপভোক্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের বর্তমান পারিবারিক ও নাগরিক অবস্থা সরেজমিনে যাচাই করবেন। এই মাঠপর্যায়ের তদন্ত শেষ হওয়ার পর প্রকৃত অযোগ্যদের রেশন কার্ডগুলি পাকাপাকিভাবে নিষ্ক্রিয় করা হবে। আগামী ১৫ জুনের মধ্যে এই স্ক্রুটিনির কাজ শেষ করার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে রাজ্য।

প্রশাসনিক কর্তাদের মতে, বর্তমানে রাজ্যে প্রায় দুই কোটি মানুষ খাদ্যসাথী প্রকল্পের মাধ্যমে বিনামূল্যে রেশন পান এবং এই বিশাল চাহিদা মেটাতে সরাসরি কৃষকদের থেকে ধান সংগ্রহ করতে প্রতি বছর কোষাগার থেকে প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা খরচ করতে হয়। অথচ এই মুহূর্তে রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের হার আশানুরূপ নয় এবং তা একলাফে বাড়ানোও সম্ভব নয়। খাদ্য দফতরের এক পদস্থ আধিকারিক এই প্রসঙ্গে জানান যে, পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে এই গণবণ্টন ব্যবস্থা ও সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির অধীনে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপব্যবহার হয়েছিল বলে প্রবল সন্দেহ করা হচ্ছে। সেই কারণেই রাজকোষের অপচয় রুখতে প্রতিটি রেশন কার্ডের পুনর্যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, সরকারের নতুন মেগা প্রকল্প অন্নপূর্ণা যোজনার বিপুল খরচের ভারসাম্য বজায় রাখতেই এই কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি নেওয়া হয়েছে। নতুন এই অন্নপূর্ণা যোজনার অধীনে রাজ্যের আনুমানিক দুই কোটি মহিলার প্রত্যেককে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার জন্য প্রতি বছর রাজকোষ থেকে প্রায় ৭২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হবে। যেখানে পূর্ববর্তী সরকার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প চালানোর জন্য বছরে প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় করত, সেখানে নতুন সরকারের এই সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প ও অন্যান্য জনমুখী কর্মসূচি চালাতে আরও বিপুল অর্থের প্রয়োজন। তাই অন্য কোনও জনকল্যাণমুখী কাজের বাজেট না কমিয়ে, রেশন ও ভাতার ক্ষেত্রে বেনোজল বা ভুয়ো সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে চাইছে প্রশাসন। একই কারণে অন্নপূর্ণা যোজনাতেও যাতে কোনও কারচুপি না হয়, তার জন্য নতুন করে আবেদন ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাজ্য সরকার।